কক্সবাজারের চকরিয়ায় বিশালায়তনের একটি পাহাড় সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। এক্সেভেটর দিয়ে রাতের আঁধারে এই পাহাড় সাবাড় করে অপসারিত মাটি ডাম্পার যোগে বিক্রি করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট। শুধু তাই নয়, আসমানের সিঁড়িখ্যাত এই পাহাড়টি সাবাড় করার পর কিছুদিন বিরতি দিয়ে এবার সমতল করা ওই জায়গায় বসতবাড়ি নির্মাণের তোড়জোড় চালাচ্ছে সিন্ডিকেটটি।
অভিযোগ ওঠেছে, পাহাড় সাবাড়ের পর সমতলে পরিণত হওয়া সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত এই জায়গাটির দখলও বিক্রি করা হয়েছে মোটা অংকের টাকায়। পরিবেশবিধ্বংসী এই কর্মকাণ্ডে জড়িতরা স্থানীয়ভাবে বেশ প্রভাবশালী এবং সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলারও সাহস করেন না।
উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের উত্তর হারবাংয়ের কোরবানিয়া ঘোনাস্থ সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় পাহাড় সাবাড় এবং অবৈধভাবে বসতবাড়ি তৈরিসহ পরিবেশবিধ্বংসী এই কর্মকাণ্ড চলমান রয়েছে। সাবাড়কৃত পাহাড়টিসহ ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পটি হারবাং মৌজায় অবস্থিত। যার বিএস দাগ নম্বর হচ্ছে ১৬৫১৩।
সরজমিন দেখা গেছে, সরকারি এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড় শ্রেণির এই জায়গার পাদদেশে অতীতে আশ্রয়ণ প্রকল্প গড়ে তোলার পর সেখানে ভূমিহীন অন্তত ১০টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। আর বিশালায়তনের পাহাড়ের ওপর আরও একাধিক পরিবার অবৈধভাবে বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে বসবাস করে আসছিল। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয়ভাবে বেশ দাপটশালী বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বালুদস্যু নাজেম উদ্দিন, যুবদল নেতা আবদুল খালেক পুতু, জসীম উদ্দিনের নেতৃত্বে বালু–মাটিখেকো সিন্ডিকেটটি বিশালায়তনের পাহাড়টির ওপর লোলুপ দৃষ্টি দেয়। তারা এক্সেভেটর দিয়ে প্রতি রাতে কেটে মাটি লুটের মাধ্যমে পুরো পাহাড়টি সাবাড় করে ফেলে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আশ্রয়ণ প্রকল্পের উপকারভোগী পরিবারগুলোর একাধিক সদস্য দাবি করেছেন, তারা অন্য এলাকা থেকে উপকারভোগী নির্বাচিত হয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরসহ জায়গা বরাদ্দ পেয়ে বসবাস করছেন সেখানে। তাই আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাঝখানে বিদ্যমান থাকা বিশালায়তনের পাহাড়টি বিষয়ে তাদের তেমন ধারণাও নেই। তবে গত দেড় মাস ধরে বিশাল এই পাহাড়টি এক্সেভেটর দিয়ে কেটে রাতভর ডাম্পারযোগে মাটি অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়।
স্থানীয় সচেতন একাধিক ব্যক্তি দৈনিক আজাদীকে বলেন, ক্ষমতাসীন দল বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছেন বালুদস্যু নাজেম উদ্দিন, যুবদল নেতা আবদুল খালেক পুতু, জসীম উদ্দিনেরা। তাদের নেতৃত্বেই দেড় মাস ধরে সরকারি এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত আশ্রয়ণ প্রকল্পের জায়গায় বিদ্যমান বিশালায়তনের পাহাড়টি সাবাড় করা হয়। মূলত মধ্যরাত থেকে ভোররাত পর্যন্ত চলমান ছিল পরিবেশবিধ্বংসী পাহাড় নিধনের এই কর্মযজ্ঞ।
পাহাড় সাবাড়ের বিষয়ে সরজমিন অকুস্থলে গেলে কথা হয় স্থানীয় বেশ কয়েকজনের সাথে। এ সময় তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, পরিবেশবিধ্বংসী এই কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের কেউ বাধা দিতে এসেছিলেন কী–না। তারা জানান, ইতোমধ্যে কয়েকদফা পরিদর্শন এবং চিত্র ধারণ করে নিয়ে গেছেন হারবাং ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা (তহসিলদার) মো. আবুল মনছুর। পুরো পাহাড় সাবাড় করার পর যখন সমতল ভূমিতে স্থায়ী বসতবাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করা হয় তখনও এসে দেখে যান তহসিলদার আবুল মনছুর। পরবর্তীতে পাহাড় নিধনকারী এবং অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কী–না তা তাদের জানা নেই।
চকরিয়া পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ বলেন, উত্তর হারবাং এলাকায় হারবাং ছড়া এবং মানুষের ফসলি জমির অবৈধ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শক্তিশালী শ্যালোমেশিনে ভূ–গর্ভের বালু তুলে ফেলা, পাহাড় সাবাড় করে সমতল ভূমিতে রূপান্তরের পর দখলে নিয়ে অবৈধ বসতি স্থাপনসহ পরিবেশবিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ড চলমান থাকলেও প্রশাসনের অভিযান একেবারে নামকাওয়াস্তে। এক্ষেত্রে জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের অধীনস্থ নিজস্ব কোনো স্বতন্ত্র বাহিনী না থাকায় পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডসহ অবৈধ কর্মযজ্ঞ তাৎক্ষণিক বন্ধ করতে গেলে থানা পুলিশের সহায়তা নিতে হয়। এই কারণে অনেক সময় অভিযানের খবর ফাঁস হয়ে গেলে প্রশাসনের অভিযানও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে যায়। তাৎক্ষণিক আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের সুবিধার্থে উপজেলা প্রশাসনের যদি স্বতন্ত্র বাহিনী থাকত তাহলে এসব পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হত। বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় নেওয়া উচিৎ।
জানতে চাইলে হারবাং ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহসিলদার মো. আবুল মনছুর দৈনিক আজাদীকে বলেন, কোরবানিয়া ঘোনা এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের জায়গায় বিদ্যমান বিশালায়তনের পাহাড় সাবাড় করে ফেলার খবর পেয়ে বেশ কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। পাহাড় কাটা রোধ করতে নিয়মিতভাবে বিকেল থেকে রাত আটটা–নয়টা পর্যন্তও সেখানে অবস্থান করা হয়েছিল আমাদের পক্ষ থেকে। কিন্তু পাহাড় সাবাড়ে জড়িতরা মধ্যরাত থেকে ভোররাত পর্যন্ত তৎপর থাকায় পাহাড়টি রক্ষা করা যায়নি। তবে যারা আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাহাড় সাবাড়সহ মাটি বিক্রি এবং রূপান্তরিত সমতল ভূমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করছেন তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। তন্মধ্যে বালুদস্যু নাজেম উদ্দিন, আবদুল খালেক পুতু, জসীম উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা রুজু করাসহ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে জায়গাটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পদক্ষেপ শুরু করা হয়েছে। অচিরেই সেখানে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এ ব্যাপারে চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ন দেব দৈনিক আজাদীকে বলেন, উত্তর হারবায়ের সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে থাকা বিশালায়তনের পাহাড় সাবাড়ের খবর পেয়ে হারবাং ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। যত প্রভাবশালীই জড়িত থাকুক পরিবেশবিধ্বংসী এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সবার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসাথে পাহাড় সাবাড়ের পর দখলে নেওয়া সরকারি জায়গা থেকে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করা হবে।
তবে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত নাজেম উদ্দিন, আবদুল খালেক পুতু ও জসীম উদ্দিন দাবি করেছেন, পাহাড় সাবাড়, মাটি বিক্রি, রূপান্তরিত সমতল জায়গায় অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত নন।














