চব্বিশের পট–পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দিবসের কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ কাগজে ফুলের দাপটের কারণে ফুল চাষে ধস নেমেছে ‘গোলাপ নগর খ্যাত’ কক্সবাজারের চকরিয়ার বরইতলী ও হারবাংয়ে। এরই মধ্যে চলে এসেছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস (আজ আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি)। অতীতে এই দিবস ঘিরে প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকে ফুল চাষি ও শ্রমিকদের যে কর্মব্যস্ততা দেখা যেত এবারের ভালবাসা দিবসে সেই জৌলুস আর নেই। এখন ফুলচাষি ও শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। তবে স্বল্পমাত্রার চাহিদা থাকায় এখনো অল্পসংখ্যক চাষি ফুল চাষের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। যা সরজমিন বরইতলী ও হারবাংয়ের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে প্রত্যক্ষ করা গেছে।
সরজমিন দেখা গেছে, গতবছরও যেখানে দিগন্তজোড়া জমিতে গোলাপ, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধাসহ রকমারি ফুলের চাষ হতো সেখানে বর্তমানে দখলদারত্ব চলছে তামাকের। ফুলচাষিরা জানান, বরইতলী ও হারবাং ইউনিয়ন দুই দশক আগে থেকে ফুলের গ্রাম তথা গোলাপ নগর হিসেবে বেশ পরিচিতি পেয়েছিল। একসময় চট্টগ্রাম–কঙবাজার মহাসড়ক লাগোয়া এই ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের ২০০ একর জমিতে গোলাপসহ রকমারি ফুলের চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন দুই শতাধিক কৃষক পরিবার।
বরইতলীর আলমনগরের ফুল চাষি দিদারুল করিম দৈনিক আজাদীকে বলেন, বরইতলী ও হারবাং ইউনিয়নে বিশালায়তনের বাগান ছিল অন্তত তিন শতাধিক। বর্তমানে অর্ধ শতাধিক বাগানের চাষিরা এই ফুলের চাষ ধরে রেখেছেন। হঠাৎ করে আশঙ্কাজনকভাবে ফুলের চাষ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে এই ফুলচাষি বলেন, এখন প্লাস্টিক আর কাগজের ফুলের দাপট ছাড়াও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দিবস কার্যত বন্ধ রয়েছে। এতে চকরিয়ার গোলাপ নগরখ্যাত বরইতলীতে ফুল চাষে ব্যাপক ধস নেমেছে। এই অবস্থায় বাগানের সংখ্যা একেবারে কমে যাওয়ায় ফুল চাষের জমির পরিধিও কমে গিয়ে সেখানে তামাকের দখলদারত্ব শুরু হয়ে গেছে।
ফুল চাষিদের আক্ষেপ, মাত্র দুইবছর আগেও জাতীয় দিবস বিশেষ করে ইংরেজি নববর্ষের থার্টি ফার্স্ট নাইট, ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখ ও বসন্তোৎসব, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে বরইতলী ও হারবাং ইউনিয়নের বাগানের কাঁচা গোলাপসহ রকমারি ফুলের বিশেষ চাহিদা ছিল। এখানকার বাগানের গোলাপসহ রকমারি ফুল সরবরাহ হতো চট্টগ্রামের চেরাগী পাহাড় ছাড়াও কঙবাজারের বিভিন্ন মোকামে। কিন্তু দুইবছর ধরে আর জাতীয় দিবসগুলোতে আগের মতো এখানে উৎপাদিত কাঁচা গোলাপসহ রকমারি ফুলের ব্যবহার হচ্ছে না।
ফুল চাষিরা আরো জানান, কালেভাদ্রে যা ব্যবহার হচ্ছে, সবই প্লাস্টিক আর কাগজের ফুল। এমন পরিস্থিতিতে চাষ করেও ফুল বিক্রি করা যাচ্ছে না। এতে প্রস্ফুটিত ফুল গাছের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে প্রতিটি বাগানের মালিকই লোকসান গুণতে গিয়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে।
বাগান মালিকেরা জানান, গোলাপ ফুলের বাজার কয়েক বছর ধরে দখলে রেখেছে কাগজের ফুল ও চীনা গোলাপ। গোলাপ একবার ব্যবহারের পর নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু কাগজের ফুল বা চীনা গোলাপ চার থেকে পাঁচবার ব্যবহার করা যায়। বিয়ে–শাদি, সামাজিক অনুষ্ঠান, প্রশাসনিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক দলের মঞ্চ সাজানো থেকে ঘর–বাড়িজুড়ে এখন কাগজের ফুলের ব্যবহার বেড়েছে। তাছাড়া গাছে গোলাপ ফুটলে কেটে ফেলতে হয়। পরিপক্ক গোলাপ এক দিনের বেশি রাখা যায় না।
বাগান মালিকরা বলছেন, বিশেষ কিছু দিবসে ন্যায্যমূল্যে গোলাপ বিক্রি হলেও অধিকাংশ চাষি সারা বছর লোকসান দিয়ে ফুল বিক্রি করেন। ক্রেতার অভাবে শতাধিক বাগান থেকে নষ্ট হয় ৩০ লাখের বেশি গোলাপ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বরইতলী ইউনিয়নের একতা বাজারের দক্ষিণে দুই বছর আগে যেসব জমিতে গোলাপসহ রকমারি ফুলের চাষ হতো, সেখানকার বেশিরভাগ জমিতে সবজি ও ধান চাষ করা হয়েছে। একইভাবে উপরপাড়া, নামারপাড়া, খয়রাতিপাড়া, বরইতলী নতুন রাস্তার মাথা, মাইজপাড়াসহ বেশকিছু এলাকায় তামাক চাষের বিস্তার ঘটেছে। অথচ আগে এসব জমিতে গোলাপের চাষ হতো।
বরইতলী গোলাপ বাগান মালিক সমিতির আহ্বায়ক মঈনুল ইসলাম বলেন, দুই বছর আগেও প্রায় ২০০ একর জমিতে গোলাপের চাষ হতো। এখন সেখানে স্বল্প পরিসরে গোলাপের বাগান করা হয়েছে। বিকিকিনি না থাকায় প্রতিদিন এসব বাগান থেকে ফুটন্ত গোলাপ কেটে ফেলে দিতে হচ্ছে। এভাবে বছরে ৩০–৩৫ লাখ গোলাপ ফুল বাগান থেকে ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা।
মঈনুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, যেখানে কাঁচা গোলাপ ফুলের বাজার দখল করেছে কাগজের ফুল ও চায়না প্লাস্টিকের ফুল সেখানে উৎপাদিত কাঁচা ফুলের কদর একেবারে কমে গেছে। তাছাড়া কাঁচা গোলাপ একবার ব্যবহারের পর আর ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু কাগজের ফুল অন্তত চার থেকে পাঁচবার ব্যবহার করতে পারে। বিয়ে–শাদী সামাজিক অনুষ্ঠানে এখন কাগজের ফুল ব্যবহার হচ্ছে বেশি। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে গোলাপ বাগানের মালিকরা লোকসান দিতে দিতে একদিন বরইতলী ও হারবাংয়ে তামাক চাষ ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এতে একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে ফুলের চাষ।












