ঘুমানোর আগে আমাদের শিশুরা হঠাৎ অনেক কথা বলতে শুরু করে। সারাদিনের ব্যস্ততার পরে সামযয়িকভাবে মা–বাবার এতে বিরক্তিবোধ হলেও বুঝতে হবে ব্যাপারটা কিন্তু বিরক্তিকর নয়। স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটা স্বাভাবিক এবং এটা হলো শিশুর শেখার প্রবণতার প্রকাশ। শব্দ আর ব্যস্ততা কমে গেলে শিশুর মস্তিষ্কের alert system শান্ত হয়। তখন stress hormone কমে এবং emotional process সক্রিয় হয়। এই সময়েই সারাদিনের জমে থাকা অনুভূতি, ভয়, আনন্দ, প্রশ্ন আর কৌতূহলগুলো কথা হয়ে বেরিয়ে আসে। এই সময় শিশুরা নিজেদেরকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করে, তারা মা বাবাকে খুব কাছে অনুভব করে। তাদের ধারনা মা–বাবাকে এখন যাই বলি তারা তা শুনবে, এখন তাদের কোনো ব্যস্ততা নেই! আমরা মা–বাবারা যদি তখন ‘চুপ করো, কথা না বলে ঘুমাও’ এমন কথা বলি, শিশুর মস্তিষ্ক তখন নেগেটিভিটি ধারণ করবে। তার মনে হবে, ‘আমার অনুভূতি গুরুত্বপূর্ণ নয়, মা–বাবার কখনো আমার জন্যে সময় থাকে না। তারা আমার কথা শোনে না, তারা আমার কথার বা আবেগের গুরুত্ব দেয়না’। আর মা–বাবা যদি মন দিয়ে শিশুর কথা শোনেন, তখন শিশুর মস্তিষ্ক বুঝতে শিখবে– ‘আমি নিরাপদ, মা–বাবা আমার কথা শোনেন এবং আমার কথার মূল্য দেন। আমি যা ভাবি বা করি তার নিশ্চয়ই গুরুত্ব আছে‘। ঘুমের আগের এই সময়টুকুন হলো সংযোগ। এটাই বসড়ঃরড়হধষ নড়হফরহম। এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। আবেগ নিয়ন্ত্রণ হয়। মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। মানুষকে মূল্যায়ন করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। নিজে নিজে কোনো বিষয় নতুন করে ভাবার আবেগ তৈরি হয়। কল্পনা করার শক্তি বাড়ে। আনন্দ ভাগ করা বা নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে মা–বাবার সাথে সকল কথা শেয়ার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। ঘুমের পূর্বের কিছুটা সময়, শিশুর কাছে ২৪ ঘণ্টা সময় দেওয়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের জন্য সারাদিন ব্যস্ত থাকা মা–বাবার বুঝতে হবে, শিশুতো আর বুঝেনা যে, ‘মা–বাবার সারাদিনের ব্যস্ততা আর কষ্টগুলো সন্তানদের জন্যেই’। তাই শত ক্লান্তি ও কষ্টের মাঝেও আমাদের উচিত সন্তানদের কথাগুলো শোনা এবং তাদেরকে ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া। ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে শুধরে দেওয়া! নতুবা সে বুঝতেই পারবে না কোনটা ভালো আর কোনটা তার ভুল! তাছাড়া ঘুমের পূর্বে শিশু যা ভাবে বা শোনে ও শিখে ঘুমের মধ্যে ব্রেন তা মেমোরিতে সেট করে দেয়। একনাগারে ৩–৪ দিন ধরে ঘুমের আগে শিশুকে কোনো সূরা, দোয়া, কবিতা কিংবা রাইমস শোনালে দেখা যায় কয়েকদিনের মধ্যেই শিশুরা তা শিখে গেছে। তাই আমাদের উচিত ঘুমের আগে শিশুদেরকে সময় দেওয়া এবং জানতে চাওয়া, সারাদিনে কী কী ভালো কাজ করেছে? কাউকে সাহায্য করেছে কিনা? কোনো সমস্যায় পড়েছে কিনা? নতুন কিছু তৈরী করেছে কিনা? নতুন কিছু শিখেছে কিনা? তার কাছ থেকে গল্প শুনতে চাওয়া। তাকে বলা, ‘একটি গল্প বলোতো যা থেকে আমরা কিছু শিখতে পারি’। এ ধরনের কথাগুলো শিশুর চিন্তা ভাবনাকে আরো প্রসারিত করবে এবং শিশুর মানসিক বিকাশ গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।












