ঘাটতি নয়, আতঙ্কে বাড়তি তেল কেনাতেই সংকট

সংসদে মন্ত্রীর বিবৃতি

| মঙ্গলবার , ৩১ মার্চ, ২০২৬ at ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ

দেশে জ্বালানি তেলের ‘কোনো ঘাটতি নেই’, বরং গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বেড়েছে বলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন ‘সরবরাহ সংকটের চিত্র নয়’; বরং অতিরিক্ত কেনা ও মজুদ করার প্রবণতাই এখন বড় সমস্যা। খবর বিডিনিউজের।

সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ বিধি অনুযায়ী, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে মন্ত্রী বিবৃতি দিতে পারেন। সেই বিবৃতিতে টুকু বলেন, বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও এসেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে সরকার আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে।

মন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানির কোনো ঘাটতি নাই। বরং আমরা গত বছরের তুলনায় সরবরাহ আরো বৃদ্ধি করেছি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার দিন দেশে ডিজেলের মজুদ ছিল ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন। ৩০ মার্চ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টনে। ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৪১ দিনে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে। টুকু বলেন, এত বিপুল বিক্রির পরও মজুদ বেড়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে আগাম প্রস্তুতি, ধারাবাহিক আমদানি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা হয়েছে। ঈদুল ফিতরের আগে যাতায়াত, পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসাবাণিজ্য সচল রাখতে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মজুদ বাড়ানোর অগ্রিম ব্যবস্থা নেওয়ার কথা সংসদকে বলেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের মার্চের চাহিদাকে ভিত্তি ধরে ২০২৬ সালের মার্চে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রকৃত চাহিদা সেই অনুপাতে না বাড়লেও মানুষের মধ্যে ‘প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কেনার প্রবণতা’ তৈরি হয়েছে। তার ভাষ্য, গত বছরের মার্চে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা ছিল ১২ হাজার মেট্রিক টন। অকটেন ও পেট্রোলের চাহিদা ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ২০০ ও ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। আর চলতি বছরের ১ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত অকটেন বিক্রি হয়েছে ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২৫৮ মেট্রিক টন। ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনের কথা তুলে ধরে টুকু বলেন, দেশের মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৩ শতাংশই ডিজেল। মোট ব্যবহৃত জ্বালানির মাত্র ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ অকটেন এবং ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ পেট্রোল। তাই কিছু স্টেশনে লাইন দেখা যাওয়াকে সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হল, মানুষের প্রকৃত ব্যবহার কি এক বছরে হঠাৎ করে দ্বিগুণ হয়ে গেছে? নিশ্চয় তা নয়।

মন্ত্রীর মতে, জ্বালানি মজুদের মানসিকতাই এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই মোটরসাইকেল একাধিকবার এসে তিন থেকে পাঁচ লিটার করে অকটেন নেওয়ার কথাও সংসদে তুলে ধরেন টুকু। অবৈধ মজুদ ঠেকাতে সরকারের অভিযানের তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী সংসদকে বলেন, এ পর্যন্ত ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৫৩টি মামলা করা হয়েছে। ৭৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের পাশাপাশি ১৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযানে ১ লাখ ৪০ হাজার লিটার ডিজেল, ২২ হাজার লিটার অকটেন ও ৪৬ হাজার লিটার পেট্রোলসহ মোট ২ লাখ ৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করার কথা সংসদকে জানান টুকু।

অকটেন সরবরাহ নিয়ে তিনি বলেন, এপ্রিল মাসে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে আরও ৩০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন পাওয়া যাবে। তার হিসাবে, মাসে অকটেনের চাহিদা ৩৫ হাজার মেট্রিক টন হলেও সরকারের বর্তমান পরিকল্পনায় প্রায় দুই মাসের চাহিদা পূরণ করা যাবে।

বিবৃতিতে তিনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি না কেনা, মজুদ প্রবণতা বন্ধ করা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ এবং অবৈধ সংযোগ ও মজুদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

সীমান্তবর্তী এলাকায় কিছু ‘অসাধু’ ব্যবসায়ীর জ্বালানি তেল পাচারে জড়িত থাকার খবর পাওয়ার কথা সংসদে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, তেলের অবৈধ মজুদ ও সীমান্ত এলাকায় পাচারের তথ্যদাতাদের পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। টুকু বলেন, আমি নই, আমরা। ব্যক্তি নয়, দেশ। অপচয় নয়, সাশ্রয়। বিভক্তি নয়, ঐক্য। সবার আগে বাংলাদেশ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধস্বাধীনতা বইমেলা শুরু হচ্ছে আজ
পরবর্তী নিবন্ধসংহতি জানিয়ে কাতারের আমিরকে প্রধানমন্ত্রীর চিঠি