ঘরের অন্দরে দূষণ : নীরবে বড় বিপদ প্রতিদিন

ফজলুর রহমান | মঙ্গলবার , ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

ঘরের অন্দরের বায়ু দূষণ দৈনন্দিন জীবনে লুকিয়ে থাকা একটি বিপদ, একটি নীরব হুমকি। আমরা এখন ঘরের ভেতরেও নিরাপদ নই। আমরা যে আসবাবপত্রের উপর বসি সেখান থেকে শুরু করে যে স্প্রে ব্যবহার করি, তারমধ্যে অনেক কিছুই অজান্তেই ঘরের অন্দরের বাতাসকে দূষিত করতে পারে। এই দূষণ ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে, শ্বাসকষ্টের সমস্যা তৈরি করতে পারে। এমনকি জীবনযাত্রার মানও হ্রাস করতে পারে।

অভ্যন্তরীণ বায়ু দূষণ বলতে ভবন এবং আবদ্ধ স্থানের ভিতরের বাতাসে উপস্থিত ক্ষতিকারক দূষণকারীদের বোঝায়। এই দূষণ ধোঁয়া বা রাসায়নিক স্প্রে এর মতো স্পষ্ট উৎস থেকে আসতে পারে, অথবা আসবাবপত্র, রঙ এবং প্লাস্টিক দ্বারা নির্গত উদ্বায়ী জৈব যৌগ (Volatile Organic Compounds-VOC) এর মতো অদৃশ্য উৎস থেকেও আসতে পারে। অনেক বাড়ি এবং অফিসে, তাজা বাতাসের প্রবাহ সীমিত, এয়ার কন্ডিশনার বা কুলারগুলি কেবল একই পুরানো বাতাস সঞ্চালন করতে থাকে। অফিসআদালতেও অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণ বা ‘ইনডোর এয়ার পলিউশনে’র ঝুঁকি অনেক বেশি, যা দিন দিন মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে আনছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সামপ্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩০ লাখ মানুষ প্রতিবছর এই অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণের কারণে অকাল মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ মানুষ প্রতিবছর অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যুবরণ করেন।

সমপ্রতি বায়ুদূষণ ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক একটি গবেষণা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে একদল গবেষক। গবেষণায় ঢাকায় ৪৩টি ঘরের ভেতরে দূষণের মাত্রা নির্ণয় করা হয়েছে। ঘরের গড় দূষণ মাত্রা ছিল ৭৫.৬৯ মাইক্রোগ্রাম/মিটার, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা থেকে প্রায় পাঁচগুণ বেশি। দূষণের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ঘরের ভেতরে বাইরের দূষিত বায়ুর প্রবেশ। ঘরের জানালা বা অন্যান্য ছিদ্র দিয়ে বাইরের দূষিত বায়ু প্রবেশ করে এবং অভ্যন্তরীণ বায়ুকে প্রভাবিত করে। বেশিরভাগ ভবন পরিবেশ উপযোগী নয়। বাসাবাড়িগুলোতে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা কম।

অভ্যন্তরীণ দূষণের কিছু উৎস তুলে ধরা হল:

ধুলো এবং মাইট: আসবাবপত্র, মেঝে এবং ভেন্টে দ্রুত ধুলো জমে। এতে মাইট, ব্যাকটেরিয়া, অ্যালার্জেন থাকে যা ফুসফুসে জ্বালাপোড়া করে।

রান্না ও চুলা: তেল দিয়ে রান্না, ভাজা করার সময় সূক্ষ্ম কণা বাতাসে ছেড়ে দেয়। এগুলি ঝুলে থাকতে পারে এবং শ্বাস নেওয়ার সময় ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে। গ্যাসের চুলা থেকে যে কার্বনুমনোক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়, সেগুলোও ঘরের বায়ুদূষণের কারণ।

ধূমপান: যদি শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি ঘরের ভিতরে ধূমপান করে, তবুও এটি বাতাসকে ক্ষতিকারক কণা এবং রাসায়নিক পদার্থে ভরে দেয়।

আসবাবপত্র এবং রঙ: নতুন আসবাবপত্র, পলিশ, বার্নিশ এবং রঙগুলি প্রায়শই সময়ের সাথে সাথে ফর্মালডিহাইড এবং অন্যান্য VOC (উদ্বায়ী জৈব যোগ) নির্গত করে।

অতিরিক্ত গাছপালা: যদিও গাছপালা বাতাসকে বিশুদ্ধ করতে পারে, তবুও বন্ধ স্থানে অনেক গাছপালা অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং ছত্রাকের কারণ হতে পারে।

পোষা প্রাণী: পোষা প্রাণীর চুল এবং ত্বকের খসখসে ভাব শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়িয়ে তুলতে পারে।

পোকামাকড় নিরোধক এবং এয়ার ফ্রেশনার: এগুলো কীট তাড়াতে পারে, মারতে পারে, এগুলোর গন্ধ মনোরম হতে পারে, কিন্তু বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে ঘরের বাতাস দূষিতও করতে পারে।

দুর্বল বায়ু চলাচল: ক্রসভেন্টিলেশনের অভাব ঘরের ভেতরে দূষণকারী পদার্থ আটকে রাখে।

নির্মাণ সামগ্রী: প্লাইউড, আঠালো এবং সিন্থেটিক মেঝে নির্মাণ শেষ হওয়ার অনেক পরে দূষণকারী পদার্থ নির্গত করে।

বাহ্যিক প্রবেশ: গাড়ির ধোঁয়া ও রাস্তার ধুলাবালি অন্দরে প্রবেশ করে বায়ুকে দূষিত করে।

অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণের কারণে যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিচ্ছে

১।শিশুদের ফুসফুসের বিকাশে সমস্যা

২। দীর্ঘ মেয়াদে ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাস

৩। অ্যালার্জি, চোখের জ্বালাপোড়া, মাথাব্যথা ও ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা

৪। ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি

কয়েকটি সহজ পদক্ষেপ বড় পরিবর্তন আনতে পারে:

. নিয়মিত বায়ুচলাচল: দিনে অন্তত দুবার জানালা খুলুন। এমনকি কয়েক মিনিটের ক্রসভেন্টিলেশন ঘরের ভিতরের দূষণকারী পদার্থ কমাতে সাহায্য করে। সূর্যের আলো রোগজীবাণু ধ্বংসে অনেক বেশি কার্যকর। ভেন্টিলেশন ভালো থাকলে বাতাস চলাচল স্বাভাবিক হয়, যা দূষণ কমাতে সাহায্য করে।

. এক্সজস্ট ফ্যান ব্যবহার: রান্নাঘর এবং বাথরুমে ধোঁয়া এবং আর্দ্রতা দূর করার জন্য কার্যকরী এক্সজস্ট ফ্যান।

. ঘরের ভেতরে ধূমপান নয়: এটিই সবচেয়ে বড় বিপদের মধ্যে একটি। আপনার বাড়িকে ধূমপানমুক্ত অঞ্চল করুন।

. রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহার সীমিত: প্রাকৃতিক বা সুগন্ধিমুক্ত পরিষ্কারক পণ্য বেছে নিন। অতিরিক্ত এয়ার ফ্রেশনার বা মশা স্প্রে ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। ঘর পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখতে ব্যবহার করুন বেশ কিছু সহজলভ্য উপাদান, যেমন লেবু, বেকিং সোডা, নিমপাতা ইত্যাদি।

. ধুলো নিয়ন্ত্রণে রাখুন: ঘন ঘন ধুলো এবং ভ্যাকুয়াম করুন। কণা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে আটকে রাখার জন্য একটি ভেজা কাপড় ব্যবহার করুন।

. আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত আর্দ্রতা ছত্রাকের সৃষ্টি করে। ভাল বায়ুচলাচলযুক্ত বাথরুম এটি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। বাথরুমে বায়ু চলাচল (ভেন্টিলেশন) নিশ্চিত করুন।

. এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার: অ্যাক্টিভেটেড কার্বনযুক্ত এয়ার পিউরিফায়ার খুঁজুন। এগুলো সূক্ষ্ম কণা, অ্যালার্জেন এবং ঠঙঈ আটকে রাখে। কমঠঙঈ বা নোVOC লেবেলযুক্ত রঙ এবং আসবাবপত্র বেছে নিন।

. কার্পেট এবং পর্দা সীমিত: এগুলো ধুলো এবং অ্যালার্জেন আটকে রাখে। এগুলোর ব্যবহার সীমিত করুন, পরিষ্কার রাখুন অথবা সহজে পরিষ্কার করা যায় এমন বিকল্প ব্যবহার করুন।

. নিয়মিত পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতা: জানালা ও দরজার পর্দা, বিছানার চাদর, কার্পেট ইত্যাদি দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করলে এগুলোতে জমতে থাকে ধুলা, ময়লা ও ছত্রাক, যা ঘরের পরিবেশকে করে তোলে অস্বাস্থ্যকর। এগুলোকে নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। ধুলো জমা এবং ছত্রাক রোধ করতে আপনার এয়ার কন্ডিশনার ফিল্টারগুলি নিয়মিত পরিষ্কার করুন। বাইরের দরজার সামনে পাপোশ রাখুন

১০. ঘরেই ‘ইনডোর প্ল্যান্ট’: কিছু ইনডোর প্ল্যান্ট রয়েছে, যেগুলো বাতাস পরিশোধন করতে সাহায্য করে। স্নেক প্ল্যান্ট, পিস লিলি, অ্যালোভেরাসহ বেশ কিছু গাছ ঘরের বাতাস থেকে ক্ষতিকর গ্যাস যেমন কার্বন ডাইুঅক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেনের সরবরাহ বৃদ্ধি করে, যা ঘরের পরিবেশকে রাখে স্বাস্থ্যকর।

১১. ইকোফ্রেন্ডলি পেইন্ট: বাজারে প্রচলিত পেইন্ট বা রঙে এর নিরাপদ বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন লোভিওসি, ননটক্সিক ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ইকোফ্রেন্ডলি পেইন্ট। এগুলো বাতাসে ক্ষতিকর রাসায়নিক নির্গমন হ্রাস করে এবং অন্দরকে করে তোলে আরও স্বাস্থ্যকর।

স্থাপনা তৈরির সময়

পরিবেশবান্ধব ডিজাইনের মাধ্যমে ইনডোর এয়ার কোয়ালিটি উন্নত করতে সঠিক বায়ু চলাচল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়। প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল বাড়াতে বড় জানালা, ক্রসভেন্টিলেশন ডিজাইন এবং বায়ুপ্রবাহের দিক বিবেচনা করা আবশ্যক। বাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের জন্য উইন্ডো শেড, ভেন্টিলেটর এবং আঙিনা ব্যবহারের মাধ্যমে বাতাসের প্রবাহ বৃদ্ধি করা যেতে পারে। পরিবেশবান্ধব উপাদান ব্যবহার, সবুজায়ন এবং প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে ইনডোর এয়ার কোয়ালিটি উন্নত করা সম্ভব। পরিবেশসংবেদনশীল নকশা ও ব্যবহারিক সমাধান অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।

অনেকেই মনে করেন, বায়ুদূষণ কেবল বাইরের সমস্যা। কারণ, বাইরে ধোঁয়া বা কুয়াশা দেখা যায়, কিন্তু ঘরের ভেতরের বাতাসে দূষণ চোখে পড়ে না। উপরন্তু প্রায় সব মনিটরই বাইরে স্থাপন করা হয়, তাই মিডিয়াগুলোও বায়ুদূষণকে বাইরের সমস্যা হিসেবেই উপস্থাপন করে। তবে, এটি এমন একটি সমস্যা, যা সবাইকে প্রভাবিত করে। ধনী বা গরিব, গ্রামীণ বা শহুরে, তরুণ বা বৃদ্ধসবাই শ্বাস নেন, আর সবাই এর ক্ষতি ভোগ করেন।

লেখক: উপপরিচালক (জনসংযোগ), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)

পূর্ববর্তী নিবন্ধজাহাজ ভাঙা শিল্প রক্ষায় স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি
পরবর্তী নিবন্ধআওয়ামী লীগ অনুপস্থিত, নির্বাচনে বিএনপি একা হয়ে পড়েছে : ডা. তাহের