ঘটনাস্থলে তদন্ত দল, ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি

ইনানীতে ১০ পর্যটকের মৃত্যু । ডিএনএ নমুনা গেল ঢাকায় রিসোর্ট মালিককে প্রধান আসামি করে মামলা

কক্সবাজার প্রতিনিধি | সোমবার , ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ at ৬:০২ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের উখিয়ার টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে পুড়ে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় রিসোর্ট মালিক চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার মো. তানভীরকে প্রধান আসামি করে উখিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। শনিবার রাতেই মামলা করা হয়। অন্যদিকে এই ঘটনায় গঠিত জেলা প্রশাসনের তদন্ত দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। গতকাল রোববার সকাল ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে যান তদন্ত কমিটির সদস্যরা। এছাড়া ১০ মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছে সিআইডি।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, ঘটনার দিন শনিবার দিবাগত রাতে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে ২৩ জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রিসোর্টের মালিক মো. তানভীর ও নেওয়াজ মোর্শেদের নাম রয়েছে। অন্যরা অজ্ঞাত আসামি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম সুমনকে আটক করা হয়েছিল। মামলাটিতে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এদিকে নিখোঁজদের সন্ধ্যানে গতকাল ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তবে কাউকে পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহানের নেতৃত্বে কমিটির পাঁচ সদস্য গতকাল সকাল ১০টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত কমিটির সদস্যরা একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়। কীভাবে আগুন লেগেছে সেটি খতিয়ে দেখতে পুড়ে যাওয়া রিসোর্টটি ঘুরে দেখেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। ঘটনার দিন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহানকে প্রধান কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন করে প্রতিনিধিকে সদস্য করা হয়। আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আমরা আগুন লাগার কারণ, পর্যটকদের মৃত্যুর ঘটনায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও নথিপত্র ছিল কি না এবং অবকাঠামোগত কী কী সমস্যা ছিল তা খতিয়ে দেখেছি। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন। যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

পুলিশ, হাসপাতাল ও জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য মতে, আগুনের ঘটনায় নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন ইসরাত জাহান (৩০), মিলিতা মেহজাবিন (২৩), লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিস তেহামী (২৭), ফারিহা কবির (৩৩) ও ফায়িজান আহম্মেদ। বাকি চারজনের পরিচয় জানা যায়নি।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হলেও কোনটি কার লাশ সেটি শনাক্ত করা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। কারণ আগুনে পুড়ে তাদের লাশ বিকৃত হয়ে গেছে। ডিএনএ পরীক্ষার পর কোনটি কার লাশ সেটি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

তিনি জানান, রোববার সন্ধ্যার দিকে সিআইডির বিশেষজ্ঞদল ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য সদর হাসপাতালে যান। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সিআইডি দলের সমন্বয়ে ১০ মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরপর পুলিশ বিশেষ ব্যবস্থায় নমুনাগুলো ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। নমুনার পরীক্ষার ফল পেতে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ লাগতে পারে। ততদিন পর্যন্ত মরদেহগুলো হাসপাতালের মর্গে থাকবে।

ডিএনএ পরীক্ষা প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, সদর হাসপাতালের মর্গ রাখা ১০ মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকায় সিআইডির হেডকোয়ার্টারে গিয়ে নমুনা দিয়েছেন নিহতের পিতা ও অন্য স্বজনরা। এর মাধ্যমে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

একজনের খোঁজ মিলছে না : বিডিনিউজ জানায়, টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০টি দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। আগুন লাগার সময় দুজন রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছে প্রশাসন। তবে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি।

এ অবস্থায় নিখোঁজদের সন্ধানে গতকাল সকালে রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালায় ফায়ার সার্ভিস। পরে বেলা ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে তল্লাশি শেষ হলেও নতুন করে কোনো দেহাবশেষ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার। বিকাল ৫টার দিকে তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর প্রথমে ১৩ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। পরে দুজন বেরিয়ে যেতে পারেন বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ায় নিখোঁজের সংখ্যা কমে ১১ জনে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে জেনেছিলাম, ঘটনার পর জিহাদ ও আবেদুল নিখোঁজ রয়েছেন। তবে আজ (রোববার) ঘটনাস্থলে তদন্ত করতে গিয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে জেনেছি, তারা হয়তো বেরিয়ে যেতে পেরেছেন। তবে তাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আর কোনো মরদেহ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রয়েছে কি না, তা জানতে চাইলে পান্না আক্তার বলেন, ধারণা করে বলতে হচ্ছে সব। ফরেনসিক ছাড়া আসলে বলা অসম্ভব যে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, সেখানেও আর কারও দেহাবশেষ আছে কি না। থাকতেও পারে। কারণ সেখানে একটি বাচ্চা নিখোঁজ আছে। দরকার হলে আরও অধিকতর তদন্ত হবে। সকলের ফোন নম্বর ট্রেস করা হচ্ছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে আবারও ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালানো হতে পারে।

নিখোঁজের ১০ জনই ২ পরিবারের : প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও স্বজনদের দেওয়া তথ্যে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে একটি বর্ধিত পরিবারের ছয়জন রয়েছেন। তারা হলেন ঢাকার রামপুরা–বনশ্রী এলাকার আশিকুল ইসলামের স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা, মালিহার বোন লায়লা জাহান নাবিলা, খালাতো বোন মিথিলা মেহজাবিন আলভি, আরেক খালাতো বোন ফারিহা কবির, ফারিহার ছেলে ফায়জান নূর এবং ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাফিস তেহামি জেরিফ।

নিহত ফারিহার স্বামী নূর আলম শনিবার বিকালে মোবাইলে বলেছিলেন, বুধবার স্ত্রী ফারিহা, সাত বছরের ছেলে ফায়জান, তিন শ্যালিকার পরিবার ও এক শ্যালককে নিয়ে তিনি কক্সবাজারে বেড়াতে যান। অফিসের কাজ থাকায় শুক্রবার পরিবারের সদস্যদের সেখানে রেখে তিনি চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন। শনিবার অগ্নিকাণ্ডের পর তাদের মধ্যে স্ত্রী, ছেলে, তিন শ্যালিকা ও এক শ্যালক নিখোঁজ আছেন। অন্য একটি পরিবারের চার সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন। তারা হলেন যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান তুহিন, তার স্ত্রী আফসানা ও তাদের সাত বছরের মেয়ে রোবাইনা এবং তিন বছরের মেয়ে সুনাইনা। নাহিদুর ঢাকায় শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ছিলেন। পরিবার নিয়ে তিনি ঢাকাতেই বসবাস করতেন।

নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স সাংবাদিকদের বলেন, তার ভাই শুক্রবার কক্সবাজার যাবেন বলে বলেছিলেন। শনিবার আগুনের ঘটনা জানার পর ভাইকে মোবাইলে ফোন দেন। কিন্তু তিনি মোবাইলে নাহিদুর বা পরিবারের কাউকে পাচ্ছেন না। নিখোঁজদের তালিকায় অপরজন ঢাকা জেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফয়সালের স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তা। এছাড়া জিহাদ হাওলাদার ও আবেদুল ইসলামও প্রথমে নিখোঁজদের তালিকায় ছিলেন। তবে তারা রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে প্রকৃতপক্ষে কতজন নিখোঁজ রয়েছেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের গুঞ্জন
পরবর্তী নিবন্ধপ্রধানমন্ত্রী আসছেন কাল বরণে প্রস্তুত নগরবাসী