গ্যাসসংকট : পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি দরকার

| বুধবার , ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৭:১৭ পূর্বাহ্ণ

তীব্র গ্যাসসংকট বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি জাতীয় বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে। এটি এখন একটি নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা বছরই দেশবাসী এই ভোগান্তিতে আছে। বলা যায়, এলপি গ্যাসের বাজারে চলছে নজিরবিহীন নৈরাজ্য। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। এলপিজির দাম নিয়ে এমন নৈরাজ্য এখন দেশজুড়েই। এদিকে লাইনের গ্যাসেও চাপ না থাকায় পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে ভয়াবহ।

গত কয়েকদিন ধরে সিলিন্ডার গ্যাসের তীব্র সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ। বাসাবাড়ি, হোটেলরেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবাই এই সংকটের শিকার। ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতায় ভোগান্তিতে পড়েছে সব শ্রেণির মানুষ। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত বাজার তদারকি জোরদার ও সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই সংকট আরও দীর্ঘ হতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো, যাদের জন্য রান্নাঘরে আগুন জ্বালানোই এখন বড় দুশ্চিন্তার কারণ। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, শুধু বাসাবাড়ি বা রেস্তোরাঁ নয়, চলমান তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সংকটে ভুগছে অটোগ্যাস স্টেশনগুলোও। দেশে প্রায় এক হাজার অটোগ্যাস স্টেশন থেকে গাড়ির মালিক ও চালকরা এলপিজি নেন। কিন্তু বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না স্টেশনগুলো। এতে অনেক স্টেশন বন্ধের মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে মোট এলপিজি ব্যবহারের অন্তত ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৫ হাজার টন এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশনে সরবরাহের দাবি জানিয়েছে। গত শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি ব্যবহার হয়। এর মধ্যে যানবাহন খাতে মাত্র ১৫ হাজার মেট্রিক টন, অর্থাৎ মোট ব্যবহারের প্রায় ১০ শতাংশ, এলপিজি অটোগ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অথচ এই পরিমাণ এলপিজি গ্যাস স্টেশনে সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় পুরো অটোগ্যাস খাত বিপর্যয়ের মুখে। বিইআরসির কাছে বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অনুরোধ জানায়, এ খাতে ব্যবহারের জন্য প্রতি মাসে মোট এলপিজি ব্যবহারের অন্তত ১০ শতাংশ অর্থাৎ ১৫ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশনগুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করার।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন পত্রিকান্তরে বলেন, এখন অনেক ব্যবসায়ীর অপর নামই যেন মানুষকে জিম্মি করে পকেট কাটা। আমদানি কম হলে তা অন্তত এক মাস আগে জানানোর কথা, শীত বাড়লেই লাইনের গ্যাসে সংকট দেখিয়ে এলপিজির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার থেকে সিলিন্ডার উধাও হয়ে যাওয়া স্পষ্ট কারসাজির ইঙ্গিত দেয়। এখানে আমদানিকারক, ডিস্ট্রিবিউটর এবং পাইকারিখুচরা বিক্রেতাদের যোগসাজশ রয়েছে। সমপ্রতি এক বক্তব্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ‘যোগসাজশ ও পরিকল্পিত কারসাজির ফল’ হলো গ্যাস সংকট। সরকারের হাতে দুই শতাংশ মালিকানা থাকলেও ৯৮ শতাংশ বেসরকারি হাতে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এলপিজির এমন অস্বাভাবিক দামে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়লেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি নেই। এই অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। দ্রুত বাজার তদারকি না বাড়ালে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মজুত গ্যাসও ফুরিয়ে আসছে। গ্যাস সংকটে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য নষ্ট হবে। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, যা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে। গ্যাসসংকট দূরীকরণে কোনো সরকারই যথেষ্ট মনোযোগ দেয়নি। সে কারণেই গ্যাসের এই করুণ দশা। এ রকম বাস্তবতায় দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর বিশেষ করে জোর দিতে হবে। দেশের অর্থনীতি ও শিল্পকে বাঁচাতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এ মুহূর্তে সরকারকে সমুদ্র অঞ্চলে তেলগ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগ দিতে হবে। তাঁরা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের দুর্ভোগকে আমলে নিচ্ছে না। সিলিন্ডার গ্যাস নিয়ে সিন্ডিকেট ব্যবসা চলছে এবং জনগণের দুর্ভোগকে ব্যবসায় পরিণত করা হয়েছে। তাঁদের ভাষায়, এটি একটি পরিকল্পিত সংকট। সিন্ডিকেট না ভাঙলে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে