মানব সমাজের প্রতিটি সিদ্ধান্তই একটি ‘খেলা’। পরিবারে, ব্যবসায়ে, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবন প্রতিটি অবস্থায় মানুষ কৌশলগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। এমন পরিস্থিতিতে গেম থিওরি আমাদের শেখায় কীভাবে ব্যক্তি বা পক্ষ একে অপরের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত বিবেচনা করে নিজের সর্বোত্তম ফলাফল অর্জন করতে পারে ।
গেম থিওরি কেবল অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাজনীতি, ব্যবসা, কূটনীতি, আইন, এমনকি জীবনধারার প্রতিদিনের সিদ্ধান্তেও প্রয়োগযোগ্য।
গেম থিওরি কী? গেম থিওরি কে বাংলায় বলা হয় ক্রীড়াতত্ত্ব। গেম থিওরি হল কৌশলগত মিথস্ক্রিয়ার এক গাণিতিক মডেল। এটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিজ্ঞান। গেম থিওরি এমন একটি তত্ত্ব যা এমন পরিস্থিতিতে মানুষের কৌশলগত সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করে যেখানে একাধিক বুদ্ধিমান ও যুক্তিবাদী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী জড়িত থাকে, এবং একজনের ফলাফল অন্যদের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। ওলিগোপলি বাজারে ফার্মসমূহের মধ্যে পরিস্পর নির্ভরশীলতা এবং কোন ফার্মের গৃহীত কর্ম কৌশলের ফলে প্রতিযোগী ফার্মসমূহের প্রতিক্রিয়া যে বিশ্লেষণ দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয় তা ক্রীড়াতত্ত্ব নামে পরিচিত।
গেম থিওরির ইতিহাস : ১৯২০ এর দশকে বিখ্যাত গণিতবিদ এমিয়েল বোরেল সর্বপ্রথম ক্রীড়া তত্ত্বের সূত্রপাত ঘটান। পরবর্তীতে ১৯৪৪ সালে জন ন্যাশ, ভন নিউম্যান এবং ওসকার মর্গেনস্টার্ন তাদের প্রকাশিত The Theory of Game and Economical Behaviour” গ্রন্থে অর্থনীতিতে ওলিগোপলি বাজারের সমস্যা সমাধানে ক্রীড়া তত্ত্বের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তবে ক্রীড়া তত্ত্ব শুধুমাত্র ওলিগোপলি বাজারের সমস্যা সমাধানে ব্যবহৃত হয় না বরং অনিশ্চয়তামূলক অবস্থায় চাহিদা নির্ধারণের মধ্যে অর্থনৈতিক সমস্যা ছাড়াও ব্যবসা প্রশাসন, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, বাষ্ট্রবিজ্ঞান , সমরনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
১৯৪৭ সালে ভন নিউম্যান একমাত্রিক কার্যক্রমের (Linear Programming ) সাথে ক্রীড়া তত্ত্বের সম্পর্ক স্থাপন করেন। ক্রীড়া তত্ত্ব হচ্ছে এমন একটি গাণিতিক পদ্ধতি যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি পক্ষের বিভিন্ন কৌশলের মধ্য থেকে সম্ভাব্য প্রাপ্তি (Pay-off) Matrix এর Row এবং Column এ স্থাপন করে Matrix পদ্ধতিতে সর্বোৎকৃষ্ট কৌশল বা কৌশলসমূহের সংমিশ্রণ নির্ধারণ করা হয়। যেকোন ক্রীড়ার (Game ) ক্ষেত্রে নিজস্ব নিয়ম বা পদ্ধতি আছে যা খেলায় অংশগ্রহণকারীদের মেনে চলতে হয়। অংশগ্রহণকারীদের বলা হয় খেলোয়ার এবং কৌশল (Strategy ) হচ্ছে নির্দিষ্ট ফলাফল প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে গৃহীত কার্যপদ্ধতি (Course of Action ) বা নিয়ম।
গেম থিওরির উপাদান : গেম থিওরি মূলত তিনটি ধারণার উপর ভিত্তি করে: ১। প্লেয়ার –অংশগ্রহণকারী পক্ষ– যারা সিদ্ধান্ত নেয়। যারা খেলায় অংশগ্রহণ করে। উদাহরণ: রাষ্ট্রপ্রধান, কোম্পানি, ব্যক্তিগত ব্যবসায়ী, ভোটার। ২। স্ট্র্যাটেজি–কৌশল– যেকোনো প্লেয়ারের সম্ভাব্য পদক্ষেপ। প্রতিটি প্লেয়ারের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত। উদাহরণ: কোম্পানি দাম বৃদ্ধি বা কমানো। উদাহরণ: জনীতিক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ বা উপেক্ষা। ৩। পে–অফ – পরিশোধ–প্রতিটি সিদ্ধান্তের ফলাফল
প্রতিটি পদক্ষেপের ফলাফল। উদাহরণ: লাভ, ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা, নিরাপত্তা। সমন্বয় এবং প্রতিযোগিতা গেমে কখনও সমন্বয়, কখনও প্রতিযোগিতা ঘটে।
গেম থিওরির প্রকারভেদ : ১। কো–অপারেটিভ গেম: খেলোয়াড়রা একে অপরের সাথে সমন্বয় করে লক্ষ্য: সম্মিলিত সর্বোত্তম ফলাফল। উদাহরণ: আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তি। ২। নন–কো–অপারেটিভ গেম: খেলোয়াড়রা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে লক্ষ্য: নিজের সর্বোচ্চ পে–অফ অর্জন উদাহরণ: রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। জিরো–সাম গেম একজনের লাভ অন্যজনের ক্ষতি উদাহরণ: দাবা, বাজার প্রতিযোগিতা। নন–জিরো–সাম গেম সহযোগিতায় সবাই লাভ করতে পারে। উদাহরণ: ব্যবসায়িক জোট বা কূটনৈতিক চুক্তি।
অর্থনীতিতে গেম থিওরির প্রভাব: অর্থনীতিতে গেম থিওরি অনেকগুলি সমস্যার সমাধান করেছে যা ব্যবসা ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগত গাণিতিক অর্থনৈতিক মডেলগুলির মুখোমুখি হয়েছিল। সাধারণত, কোম্পানিগুলিকে বিভিন্ন ব্যবসা এবং বিপণন উপাদান সম্পর্কিত অনেক কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এখন, এই সিদ্ধান্তগুলি সরাসরি অর্থনৈতিক লাভের উপর প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, একটি নতুন পণ্য লঞ্চ করার সঠিক সময় কিনা, প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য দাম কমানো এবং ট্রেন্ডিং মার্কেটিং কৌশলগুলির সাথে পরীক্ষা করার জন্য এটি ঠিক করা ব্যবসার জন্য বেশ কঠিন।
ন্যাশ ভারসাম্য: ন্যাশ ভারসাম্য হলো গেম থিওরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যেখানে প্রতিটি খেলোয়াড় এমন একটি কৌশল বেছে নেয় যে, অন্য খেলোয়াড়দের কৌশল অপরিবর্তিত থাকলে, সে নিজে কৌশল পরিবর্তন করে লাভবান হতে পারে না; এটি এমন একটি স্থিতিশীল অবস্থা যেখানে কেউই এককভাবে নিজের কৌশল পরিবর্তন করতে আগ্রহী হয় না, কারণ তাতে তার ফল খারাপ হবে। এটি অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, যেখানে বিভিন্ন পক্ষের সিদ্ধান্ত একে অপরের উপর নির্ভরশীল।
উদাহরণস্বরূপ দুজন বন্দীকে অপরাধ করার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তবে অফিসারদের কাছে তাদের বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ নেই। একমাত্র উপায় হল তাদের স্বীকার করা। তথ্য পাওয়ার জন্য তারা প্রতিটি বন্দীকে আলাদা চেম্বারে জিজ্ঞাসাবাদ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে উভয়ই স্বীকারোক্তি দিলে, তাদের পাঁচ–বছরের জন্য কারাগারের পিছনে পাঠানো হবে, তবে, যদি কেউ তাদের অপরাধ স্বীকার না করে তবে তাদের দুই বছরের জেল হবে। যদি তাদের একজন তাদের অপরাধ স্বীকার করে তবে অন্য একজনকে দশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে। সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত হল স্বীকার না করা। উভয় বন্দীই সম্ভবত স্বীকারোক্তি দিতে পারে কারণ এটি তাদের জন্য পৃথকভাবে একটি অনুকূল সিদ্ধান্ত শোনাবে। ‘আলবার্ট টাকার’ বিষয়টিকে দুইজন কারাবন্দী ব্যক্তির দৃশ্যকল্পে তুলে ধরেছেন এবং নাম দিয়েছেন ‘দ্য প্রিজনার’স ডিলেমা’ বা ‘কারাবন্দীদের উভয়সঙ্কট’।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ: গেম থিওরি বাংলাদেশে বিভিন্ন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়, বিশেষ করে জটিল আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে, একটি কার্যকর কাঠামো প্রদান করে।
১. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: গেম থিওরি ব্যবহার করে বাংলাদেশের সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নানা বিষয়ে বিশ্লেষণ হয়, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা ও আস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়। এটি পানি, বাণিজ্য, ও নিরাপত্তা ইস্যুগুলোর আন্তঃসম্পর্ক বোঝাতে সাহায্য করে।
২. অর্থনীতি ও ব্যবসা: বাংলাদেশে কোম্পানিগুলো নতুন পণ্য লঞ্চ, দাম নির্ধারণ বা প্রতিযোগীদের মোকাবিলা করার মতো কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে গেম থিওরি ব্যবহার করতে পারে, যা মুনাফা বাড়াতে সাহায্য করে।
৩.সামাজিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত: যদিও এটি গাণিতিক মডেল, এর প্রয়োগ কেবল অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যেখানে রাজনীতিবিদদের ভূমিকা মুখ্য। একে অন্যের ত্রুটি বিবেচনা না করে নিজেকে কতোটা পরিশুদ্ধ করা যায় তাতেই মনোনিবেশ করা দরকার।
আধুনিক যুগে গেম থিওরি কতোটা প্রাসঙ্গিক?
ডিজিটাল অর্থনীতি, স্টক মার্কেট, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, রাজনৈতিক প্রচারণা্তসব ক্ষেত্রেই গেম থিওরি অপরিহার্য। উদাহরণ: রিমোট ওয়ার্ক প্ল্যাটফর্মে কর্মী এবং প্রতিষ্ঠান কৌশল নির্ধারণ। ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে বিনিয়োগকারী ও এক্সচেঞ্জ কৌশল। স্বচ্ছ নীতি, তথ্যপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ, কৌশলগত সমঝোতার মাধ্যমে তা সমাধান করা যেতে পারে।
গেম থিওরি আমাদের শেখায় কৌশলগত চিন্তাভাবনা, সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্ব, যা ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। ব্যক্তিগত লাভের চিন্তা কখনো কখনো সামগ্রিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। এটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে অংশগ্রহণকারীদের কৌশলগত চিন্তা উন্নত করতে সাহায্য করে। সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা সঠিকভাবে সমন্বয় করা জরুরি।
তথ্যের স্বচ্ছতা এবং প্রণোদনা কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। গেম থিওরি শেখায় যে সিদ্ধান্তের জটিলতা কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থের উপর নির্ভর করে না, বরং অন্যদের সম্ভাব্য পদক্ষেপও বিবেচনা করতে হয়।
মানুষের জীবন নামক খেলার পাশা চিরকাল এক চাল দেয় না, চাল পাল্টাই, পাশা ঘুরে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ও দেখেছি, একবার কৌরবের হার আর একবার পাণ্ডবের জয়। পাশার চালে ফের পাণ্ডবের হার আর কৌরবের জয়। রাজনীতিক অঙ্গনেও দেখা যায় একদল আসে, একদল যায়। খেলা চলে ভালো মন্দের। অনেকসময় নিজেদের অজান্তেই আমরা সাধারণ জনগণ রাজনৈতিক গেইমের ধাঁধাঁয় জড়িয়ে যাই। সেই খেলায় জিততে হলে আমাদের অবশ্যই গেম থিওরি (ন্যাশ ভারসাম্য) প্রয়োগ করতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ; প্রভাষক, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।











