জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনের ১৪টি বছর কাটিয়েছেন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। বেশ কয়েকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য। তবুও কখনো জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম থেকে পিছপা হননি।
পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর সাথেও কোনো প্রকার আপস করেননি। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বাংলার জনগণের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। নিজের সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়েছিলেন গরীব দুঃখী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের জন্য। তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কারণেই সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আজ স্বাধীন দেশের মালিক ও নাগরিক। সেই জন্য বঙ্গবন্ধু পেয়েছেন জাতির জনকের মর্যাদা, পেয়েছেন অমরত্ব। আসলেই প্রকৃত রাজনৈতিক নেতারা এমনিই হন।
যারা জনগণের পক্ষে কথা বলে অবলীলায় সব দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে পারেন, পরবর্তীতে তাঁরাই ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন মহীরুহ। কিন্তু চট্টগ্রামে যাকে চট্টলবীর হিসেবে অভিহিত করা হয় সেই মহিউদ্দিন চৌধুরীর চরিত্রও ছিলো কিছুটা ঐরকম। তিনি চট্টগ্রামবাসীর পক্ষে কথা বলার জন্য অবলীলায় সরকারের ও দলের বিরোধিতা করেছিলেন। চট্টগ্রামের স্বার্থের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেছিলেন বলেই তাকে চট্টলবীর হিসাবে অভিহিত করা হয়।
এজন্য তিনি চট্টগ্রামবাসীর হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। আজো চট্টগ্রামের কোনো সংকট আসলে সবাই তাঁর কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। এই জানা কথাগুলো আবারো স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পিছনে কারণ হলো, গত কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়রের একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গৃহকর সুরক্ষা পরিষদের চলমান আন্দোলন। বর্তমান মেয়র একজন সজ্জন লোক হিসাবে পরিচিত, বীর মুক্তিযোদ্ধা।
সারাজীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন। তিনি মেয়র হওয়ার পর আমরা নগরবাসীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম। ভেবেছিলাম চট্টগ্রামে আর যাই হোক, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। যদি কখনো সাধারণ জনগণের বিপক্ষে কোনও সিদ্ধান্ত সরকার থেকে আসে, তবে তিনি নিজেই সেটা মোকাবেলা করবেন। কিন্তু সেই তিনিই যখন বৃহৎ জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন তখন মনে প্রশ্ন জাগে। কেন এমন হলো?
গত কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় নতুন পদ্ধতিতে গৃহকর আদায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদ। এর ধারাবাহিকতায় করদাতা সুরক্ষা পরিষদ গত ১৩ মার্চ ২০২৩ চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি প্রদান করে। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা বলেন, ভাড়ার উপর অর্পিত পঞ্চবার্ষিক কর মূল্যায়নের ধারা থেকে সরে আসার জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলনের যত ধরনের কর্মসূচি রয়েছে সব প্রয়োগ করেছে চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদ। তবু সিটি মেয়র ‘কর্ণপাত না করায়’ বাধ্য হয়ে ‘নগর ভবন ঘেরাও’ কর্মসূূচি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ।
এতে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, চসিক ২০১৬–১৭ অর্থবছরে পঞ্চবার্ষিক কর মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়ম আয়তনের ভিত্তিতে গৃহকর নির্ধারণ বাদ দিয়ে স্থাপনার আয়ের উপর গৃহকর নির্ধারণ করে। এতে গৃহমালিকদের হোল্ডিং ট্যাক্স রাতারাতি কয়েকশ গুণ বৃদ্ধি পায়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, স্থাপনার উপর ভাড়া ভিত্তিক গৃহকর নির্ধারণের এই ধারাটি স্বৈরাচার আমলে করবিধি ১৯৮৬ এ অসাংবিধানিকভাবে যুক্ত করা হয়। ধারাটি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো সিটি কর্পোরেশনের কোনো নির্বাচিত মেয়র প্রয়োগ করেছেন, এমন নজির নেই! অথচ চসিক বাংলাদেশে প্রথম এই কালো আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নগরবাসীর পকেট থেকে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক ঘৃণ্য পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামে।
লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, ইতিপূর্বে অতিরিক্ত করের নোটিশ পেয়ে নগরে বসবাস রত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত গৃহমালিকগণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তারা প্রতিকারের কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদের ব্যানারে ধারাবাহিক আন্দোলেনের সূচনা হয়।
কয়েক বছর আগে আন্দোলনের তীব্রতায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় স্থগিত ঘোষণা করে। পরে বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নিয়ে আবার সেই গৃহকর আরোপ করা শুরু করেন। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বর্তমানে দ্রুত সময়ে স্থাপিত আপিল বোর্ডের মাধ্যমে কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগ করদাতাদের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঘুষ বাণিজ্য করে ফেলে। যা করদাতা সুরক্ষা পরিষদের ‘গণশুনানি’ র মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রমাণ করে দেয়।
লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, আইনের বিধান অনুযায়ী ধার্যকৃত কর এর আপিল আবেদনের ক্ষেত্রে সিটি মেয়র সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ কর ছাড় প্রদানের ক্ষমতা রাখেন। এরপর আপিলের সুযোগ রয়েছে বিভাগীয় কমিশনারের হাতে। বিভাগীয় কমিশনারও সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় প্রদানের ক্ষমতা রাখেন।
তাহলে কোন আইনে মেয়র ধার্যকৃত করের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় প্রদান করছেন? সরকার কি কর ছাড়ের ক্ষেত্রে উনাকে ইন্ডিমিনিটি দিয়েছেন? যদি তিনি ইন্ডিমিনিটি না পেয়ে থাকেন তাহলে এই আপিল আবেদনের সুযোগ গ্রহণকারী করদাতাগণ আগামীতে অনাদায়ী কর এর আইনি ঝামেলার মুখোমুখি হবেন কি না, সে বিষয়ে মেয়রের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন সুরক্ষা পরিষদের নেতৃবৃন্দ।
আমি যে বাড়িতে থাকি সেটি দুইতলা একটি বাড়ি। নিচতলা খালি ২য় তলায় আমি পরিবার নিয়ে বসবাস করি। আগে এই ঘরের এসেসমেন্ট মূল্য ছিলো ৩৯ হাজার টাকা। মাস খানেক আগে আমি বকেয়া হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্ট রাজস্ব অফিসে গেলে আমাকে জানানো হয় আমার ঘরের নতুন এসেসমেন্ট মূল্য হলো ৪ লক্ষ টাকা। যা আগের মূল্যের ১০ গুণের চেয়েও বেশি। আমি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করি কিসের ভিত্তিতে আপনারা নতুন মূল্য নির্ধারণ করলেন। তাঁরা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে আমি বাসায় এসে আশেপাশে খবর নিয়ে জানলাম, সবার বাড়ির এসেসমেন্ট মূল্য পুনঃ নির্ধারণ করা হয়েছে (যদিও আশে পাশের সবার বাড়ির ভবন বর্ধিত করা হয়েছে শুধু আমারটা ছাড়া)। আরো জানলাম সংশ্লিষ্ট কর আদায়কারী প্রায় সবার সাথে যোগাযোগ করে সমঝোতার মাধ্যমে সবারটা এসেসমেন্ট করে দিয়েছেন। কিন্তু আমার সাথে কোনো যোগাযোগ না করে ইচ্ছে মত এসেসমেন্ট করে দিয়েছেন।
খবর নিয়ে জানলাম পুরো সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কোটি কোটি টাকা লেনদেনের মাধ্যমে কর পুনঃ নির্ধারণ করা হয়েছে। যারা তাদেরকে খুশি করেনি, তাদেরটা ইচ্ছেমত এসেসমেন্ট করে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন মেয়র মহোদয়ের কাছে প্রশ্ন হলো আমার কষ্টার্জিত অর্থে নির্মাণ করা বাড়ির পুনঃ এসেসমেন্ট করার সময় আমার সাথে আলোচনা না করে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? তাঁরা কিসের ভিত্তিতে পুনঃএসেসমেন্টে বাড়ির নতুন মূল্য নির্ধারণ করলেন তা জানার অধিকার নিশ্চয় আমার আছে।
মানুষ সারাজীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় দিয়ে বৃদ্ধ বয়সে একটু স্বস্তি ও নিরাপত্তার আশায় নগরে বা শহরে স্থায়ী আবাসন করাকে নিরাপদ মনে করে। সেজন্য সারাজীবনের জমানো টাকা বা ঋণ করে হলেও একটু মাথা গোঁজার ঠিকানার পাশাপাশি রিটায়ার্ড লাইফে নির্দিষ্ট স্থায়ী আয়ের লক্ষ্যে কয়েকটা ঘর তৈরি করে নিশ্চিতে থাকতে পছন্দ করে এবং ঐ ঘর ভাড়ার আয় থেকে তারা তাদের অবসর জীবনটা নিশ্চিন্তে কাটাতে চায়।
কিন্তু বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন যে হারে গৃহকর নির্ধারণ করছে তাতে অবসর জীবনে অনেকে অনিশ্চিত অবস্থায় পড়ছে বলে ভুক্তভোগী অনেকের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে। তাই মেয়র মহোদয়ের দৃষ্টি আর্কষণ করে বলতে চাই, আপনি একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন, একই এলাকার একই সাইজের পাশাপাশি বাড়ির এসেসমেন্ট মূল্যে কত তফাৎ করা হয়েছে। একটু খোঁজ খবর নিলে দেখতে পাবেন মাঠ পর্যায়ের লোকজন কী পরিমাণ অনিয়ম করেছে।
করোনা মহামারি ও রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে পুরো বিশ্বের মত বাংলাদেশের অর্থনীতি ও টালমাটাল অবস্থায় আছে এবং একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের জীবনযাত্রার কঠিন হয়ে পড়েছে। শহরে টিকতে না পেরে হাজার হাজার মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। ফলে এখন শহরে অনেক ঘর খালি পড়ে আছে। এতে ঘর ভাড়া আগের চেয়ে কমে গেছে। সেই কঠিন সময়ে সিটি কর্পোরেশনের গৃহকর বৃদ্ধির এই প্রবণতা সাধারণ জনগণের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। মনে রাখতে হবে শুধু আইনের দোহাই দিয়ে জীবন চলে না। আইন করা হয় মানুষের কল্যাণের জন্য। যে আইন বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অকল্যাণ করে সেটি বাস্তবায়ন না করাই শ্রেয়।
তাই সমগ্র বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখে নতুন পদ্ধতিতে গৃহকর নির্ধারণ না করে আগের পদ্ধতি অর্থাৎ আয়তনের ভিত্তিতে গৃহকর নির্ধারণ করবেন এই আশা বর্তমান মেয়রের কাছে আমরা করতেই পারি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।











