গুগল-মেটা-অ্যাপলসহ মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের

শান্তি ফেরাতে পাকিস্তান ও চীনের পাঁচ দফা প্রস্তাব কেবল তেহরানের নিজস্ব শর্তেই যুদ্ধ বন্ধ হতে পারে : পেজেশকিয়ান

আজাদী ডেস্ক | বুধবার , ১ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনায় এবার সরাসরি মার্কিন প্রযুক্তি খাতকে লক্ষ্য করে হুমকি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। একই সময়ে যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছে চীন ও পাকিস্তান। অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যুদ্ধের ইতি টানার সিদ্ধান্ত কেবল তেহরানের নিজস্ব শর্তেই নির্ধারিত হবে।

গতকাল আইআরজিসির প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলো সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সেই যুক্তিতে এসব প্রতিষ্ঠানকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। বিবৃতিতে আরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়, যদি আবার কোনো ইরানি নেতা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তাহলে বোয়িং, টেসলা, গুগল, মেটা ও অ্যাপলসহ অন্তত ১৫টির বেশি মার্কিন কোম্পানিকে সরাসরি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের দ্রুত মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগের আহ্বানও জানানো হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইনের দাবি অনুযায়ী, গত এক মাসে ইরানের ১১ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে মার্কিন নৌবাহিনী ১৫০টির বেশি জাহাজ ধ্বংস করেছে বলেও দাবি করা হয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় এখন বি৫২ বোমারু বিমান স্থলভাগের ওপর দিয়ে চলাচল করতে পারছে, যা নতুন হামলার সুযোগ তৈরি করছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানের নতুন নেতৃত্বকে সতর্ক করে বলেছেন, তারা যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে না আসে, তাহলে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হবে। অন্যদিকে ইসরায়েলি পক্ষ দাবি করছে, যুদ্ধ ইতোমধ্যে ‘অর্ধেকের বেশি পথ’ অতিক্রম করেছে এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ইরানে ৩,৪৯২ জন নিহত হয়েছে। যার মধ্যে ১,৫৭৪ জন বেসামরিক ও ২৩৬ জন শিশু। ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৯ জন নিহত হয়েছে। লেবাননে ১,২৪৭ জন নিহত, যার মধ্যে ১২৪ শিশু। উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছে।

গতকাল দুবাইয়ে নোঙর করা একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। কুয়েতের পতাকাবাহী ওই জাহাজটিতে আগুন লাগলেও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। একই সময়ে দুবাইসহ বিভিন্ন উপসাগরীয় শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। সরকারগুলো মোবাইল সতর্কবার্তার মাধ্যমে জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে। যদিও অধিকাংশ হামলা প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো হরমুজ প্রণালি। ইরান এই প্রণালিতে টোল বা শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যেকোনো মূল্যে এই প্রণালি খোলা রাখা হবে। কারণ এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট।

চীনপাকিস্তানের পাঁচ দফা : যুদ্ধের মধ্যেই কূটনৈতিক সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছে চীন ও পাকিস্তান। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পর পাঁচ দফা প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়। এতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, দ্রুত শান্তি আলোচনা শুরু, বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বন্ধ, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত ও জাতিসংঘভিত্তিক বহুপাক্ষিক শান্তি কাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। চীন ও পাকিস্তান জানিয়েছে, সংলাপই এই সংকটের একমাত্র কার্যকর সমাধান।

আপস নয়, শর্তে সমাধান : তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া কোনো শর্তে যুদ্ধ বন্ধ হবে না। ইরান নিজের জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও মর্যাদার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনসেবা, অর্থনীতি ও অবকাঠামো সচল রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে এটিকে ‘জাতীয় গৌরবের অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পেজেশকিয়ান আরও দাবি করেন, ইরানি জনগণের সংহতি ও প্রতিরোধই দেশটির প্রধান শক্তি এবং এই ঐক্য বজায় থাকলে শেষ পর্যন্ত তারা বিজয়ী হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু সামরিক সীমায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি প্রযুক্তি, জ্বালানি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু ঘোষণা করা, সংঘাতের চরিত্রকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ইরান পাল্টা প্রতিরোধের পাশাপাশি কৌশলগত হুমকি দিচ্ছে। একই সময়ে চীন ও পাকিস্তান কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে, কিন্তু বাস্তবতা হলোযুদ্ধ এখনো থামার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গভীরভাবে পড়বে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ‎পেকুয়ায় মসজিদ নির্মাণে ১ একর জমি দান
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে প্রতি মাসে আড়াই লাখ অসহায় পরিবার ন্যায্যমূল্যের পণ্য থেকে বঞ্চিত