হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির উর্বর ক্ষেত্র হলো লোকগান। এই লোকগান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জনজীবনের এক জীবন্ত দলিল, যা এখনো গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে এবং লোকসংস্কৃতির ধারক–বাহকদের মাধ্যমে বেঁচে আছে। এই লোকগান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণকারী এক বিশাল ধারার গান, যা বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি, সারি, বিচ্ছেদ, কবিগান, পাঁচালীর মতো বিভিন্ন রূপের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের যাপিতজীবনের সুখ–দুঃখ, আনন্দ–বেদনা, প্রেম–বিরহ, উৎসব–অনুষ্ঠান, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক বিষয় তুলে ধরে। এটি মৌখিক সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং যুগ যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসছে। এই লোকগানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গাজীর গান বা গাজীর পালা।
গাজীর গান একটি লোককথামূলক গান। ‘গাজী’ শব্দটি সাধারণত সাহসী যোদ্ধা বোঝাতে ব্যবহৃত হয় এবং গাজীকে ‘বাঘের অধিষ্ঠাতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর অর্থ হল, গাজী একটি শক্তিশালী চরিত্র, যা বাঘের সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘গাজীর গীত’ শুধু গীত নয়, ‘আলাপচারি’ ও আছে, অর্থাৎ গানের মাঝে মাঝে পাঁচালির মত গাজীকালুর জীবনকথা কথিত হয়। গাজীর গানের উৎপত্তি মূলত চতুর্দশ শতাব্দীতে, যা পরবর্তীতে ফরিদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। গাজী পীরের মাহাত্ম্য কীর্তনের মধ্য দিয়ে এই গানের উৎপত্তি। গাজী পীর ছিলেন একজন যোদ্ধা সাধক যিনি বাংলায় ইসলামের প্রসারের সময়কালে বসবাস করতেন। খানজাহান আলীর আগে দক্ষিণ বাংলায় গাজীর আগমন ঘটেছিল বলে অনেক গবেষকের ধারণা, যা এই অঞ্চলের ইসলামীকরণে সহায়ক ছিল। গাজী পীরের ভক্তরা শুধু মুসলিমই ছিলেন না, বরং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের অন্যান্য অনুসারীরাও এর ভক্ত ছিলেন এবং এই গান পরিবেশনার আসর বসাতেন। ভক্তরা সন্তান লাভ, রোগব্যাধি নিরাময়, অধিক ফসল উৎপাদন ও ব্যবসা–বাণিজ্যের উন্নতির মতো মনস্কামনা পূরণের জন্য এই গানের পালা দিতেন। গাজীর গান গাওয়ার সময় হলো কার্তিক–অগ্রহায়ণ মাস। যে সময় কৃষকের উঠোনে ধান থাকে। অন্য সময় কখনোই বেদেদের গাজীর গান গাইতে দেখা যেত না। গাজীর পটের ওপর ভিত্তি করে একটি প্রবাদ আছে ‘অদিনে গাজীর পট’। সঠিক সময় ছাড়া বা অসময়ে কেউ কিছু করলে এই প্রবাদটি বলা হয়।
গাজীর গান বাঙলার মুসলমান সমাজের পুজিত গাজী পীরের লৌকিক–অলৌকিক কাহিনীকেন্দ্রিক কৃত্যমূলক ‘পীর পাঁচালী’। গাজীর গানের পালার গায়ক গায়েনই ‘গাজী’। এখানে গাজী রূপক। তাই গায়েন পালা অনুযায়ী গাজীর গান পরিবেশন করে থাকেন। গাজীর গানে যেমন গাজীকালু, আল্লাহ–রসুল ও পীর–মুর্শিদ এর গুণকীর্তন করা হয়, তেমনি নরনারীর প্রেম–বিরহ ও সমসাময়িক অনেক ঘটনাপ্রবাহ গাজীর গানে গীত হতে দেখা যায়। মূল গানে প্রথমে গাজীর প্রশংসা করা হয়–
‘পূবেতে বন্দনা করি পূবের ভানুশ্বর। এদিকে উদয় রে ভানু চৌদিকে পশর!!
…তারপরে বন্দনা করি গাজী দয়াবান। উদ্দেশে জানায় ছালাম হেন্দু মোছলমান’–
বন্দনা তথা প্রশংসা শেষ হলে ‘খলিফা’ বা ‘গায়েন’ আসেন মূল পুঁথির কাহিনি নিয়ে। গান ও কথায় মধ্যযুগের এক প্রেমকাহিনি ‘গাজী কালু চম্পাবতী’র বয়ান চলতে থাকে। পুঁথির পরতে পরতে চমকে দেওয়ার মতো ঘটনা, পঙ্ক্তি যা নির্মল আনন্দকে ধারণ করে আছে।
‘দারুণ বিধিরে না জানি কী ঘটল তামশা আমার কপালে’
কিংবা
‘হায়রে পিরিতের মরা মরছেরে মঙ্গলবারে’–
এ ধরনের অনেক পঙ্ক্তি একদম সরল অনুভূতির প্রকাশ হয়ে বাতাসে বাতাসে ঘুরতে থাকে। পুঁথির কাহিনি গায়েন নানা অঙ্গভঙ্গি করে, মঞ্চে ঘুরে ঘুরে বলতে থাকেন। বায়েনরা সুরে সুরে সেই কথারই রেশ ধরে টানেন। এভাবে গানের কাহিনী নবরূপ পরিগ্রহ করতে থাকে। চলতে থাকে গাজীর জীবন বৃত্তান্ত, দৈত্য–রাক্ষসের সঙ্গে যুদ্ধ, রোগ–মহামারি, বালা–মুসিবত, খারাপ আত্মার সাথে যুদ্ধ, অকুল সমুদ্রে ঝড়–ঝঞ্ঝা থেকে পুণ্যবান ভক্ত সওদাগরের নৌকা রক্ষার কাহিনীর বর্ণনা। নদীতরঙ্গে নৃত্যের তালে তালে দাঁড় বাইতে বাইতে যখন দাঁড়িরা গায়:
‘আমরা আজি পোলাপান, গাজী আছে নিখাবান।
শিরে গঙ্গা দরিয়া, পাঁচপীর বদর বদর।।
শুধু গাজী এবং বদর নয়, নাবিকের আরাধ্য দেবতা আরও আছেন: গঙ্গাদেবী, আর আছেন পাঁচপীর। এ পঞ্চদেবতা কারা ? পূর্ব্ববঙ্গে যে গাজীর গীত প্রচলিত আছে, তার ভেতর পাঁচপীরের কথা পাওয়া যায়–
‘পোড়া রাজা গয়েস্দি, তা’র বেটা সমস্দি,
পুত্র তা’র সাই সেকেন্দর।
তার বেটা বরখান্ গাজী, খোদাবন্দ মুলুকের রাজী
কলিযুগে যা’র অবসর;
বাদসাই ছিঁড়িল বঙ্গে, কেবল ভাই কালুসঙ্গে
নিজ নামে হইল ফকির।’
গানের দলে ঢোলক ও বাঁশিবাদক এবং চার–পাঁচজন দোহার থাকে। এদের দলনেতা গায়ে আলখাল্লা ও মাথায় পাগড়ি পরিধান করে একটি আসাদন্ড হেলিয়ে–দুলিয়ে এবং লম্বা পা ফেলে আসরের চারদিকে ঘুরে ঘুরে গান গাইতে থাকেন। আর দোহাররা মুহুমুর্হু বাদ্যের তালে তালে এ গান পুনরাবৃত্তি করে।
গাজী পীর (পীর বড়খাঁ গাজী) ছিলেন দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতাব্দীর একজন বাঙালি মুসলিম যোদ্ধা ও সাধক (গাজী), যিনি বাংলায় ইসলাম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং সুন্দরবন অঞ্চলে বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর উপর তার অলৌকিক ক্ষমতার জন্য পরিচিত ছিলেন; তিনি হিন্দু–মুসলমান উভয় সমপ্রদায়ের কাছেই শ্রদ্ধেয়, বিশেষত দক্ষিণবঙ্গে তাঁর মাহাত্ম্য প্রচলিত এবং ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী’ লোককাহিনীর অন্যতম প্রধান চরিত্র। গাজীর প্রকৃত নাম গাজী মিয়া বা বড়খান গাজী। তাঁর পিতার মৃত্যু হয় ১৩১৩ সালে। সেসময় তিনি ছিলেন ত্রিবেনী ও সপ্তগ্রাম অঞ্চলের শাসনকর্তা। বাল্যকালেই ফকির–দরবেশের সাহচর্যে আধ্যাত্মিক সাধনায় উন্নতি লাভ করেন গাজী। পিতার কাছে শাসনক্ষমতা নিতেও অস্বীকার করেন তিনি। ইসলাম প্রচার শুরু করেন দক্ষিণ বঙ্গের যশোর–খুলনা অঞ্চলে। ধর্মপ্রচারে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে রাজা মুকুট রায়ের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয় তার। তখনই হয়ত তাঁর চম্পাবতীর সঙ্গে দেখা হয়।
বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলে পট বা চিত্র দেখিয়ে গাজীর গান গেয়ে বেড়াত বেদে সমপ্রদায়ের একটি অংশ। তার মধ্যে মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফরিদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, সিলেট ও নরসিংদী অঞ্চলেই এমন বেদেদের বিচরণ ছিল বেশি। এ সমপ্রদায়ের মানুষ গ্রামে গ্রামে গিয়ে গাজীর গান গেয়ে ধান অথবা টাকা নিতো, যা দিয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতো। এভাবে করে একসময় গাজীর গান বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে যায়। গাজীর পট বাংলার ঐতিহ্যবাহী এক ধরনের লোকচিত্রকলা। লোকগীতির বিষয়বস্তু পীর বড়খাঁ গাজীর উপাখ্যান যাতে গাজী পীরের বিভিন্ন ঘটনা গীতি আকারে বর্ণনা করা হয়েছে। গাজীর পট উপাখ্যান পূর্বে বৃহত্তর ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, যশোর, খুলনা, রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল। ‘পট’ শব্দের একাধিক অর্থ আছে, যার মধ্যে প্রধান হলো কাপড় বা বস্ত্র, যেমন পটচিত্র (কাপড়ে আঁকা ছবি), দৃশ্যপট এবং স্মৃতিপটে।
বিষয়বৈচিত্র্য অনুসারে সংগৃহীত পটগুলিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে; যেমন চকসুদনপট, যমপট, সাহেবপট, কালিঘাটপট, গাজিপট, সত্যপীরেরপট, পাবুজীপট, হিন্দুপ্রাণপট ইত্যাদি। সাধারণভাবে পটকে ছয়ভাগে বিভক্ত করা যায়। সেগুলি হল–বিষয়নিরপেক্ষ, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, ধর্মীয়, সামাজিক এবং পরিবেশগত। পটগান হলো বাংলার একটি প্রাচীন লোকসঙ্গীতের ধারা, যেখানে পটুয়া শিল্পীরা কাপড়ে আঁকা ছবির (পট) মাধ্যমে গান গেয়ে গল্প বলেন। তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে এই পটচিত্র প্রদর্শন করেন এবং সেগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট লৌকিক ও পৌরাণিক কাহিনি সুরে সুরে পরিবেশন করেন। এটি পটচিত্র ও সঙ্গীতের একটি সম্মিলিত পরিবেশনা, যা একসময় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে গল্প ও তথ্য জানানোর মাধ্যম ছিল। গাজীর পটগান বা চিত্রভিত্তিক গানের আসরে কারবালার ময়দান, কাশ্মীর, মক্কার কাবাগৃহ, হিন্দুদের মন্দিরের মতো পবিত্র স্থানগুলো বিশেষ চিহ্নে আঁকা থাকতো। অনেক সময় এসব চিহ্ন মাটির সরা বা পাতিলেও আঁকা হতো। পট হচ্ছে মূলত মারকিন কাপড়ে আঁকা একটি চিত্রকর্ম, যা প্রস্থে চার ফুট, দৈর্ঘ্যে সাত–আট ফুটের মতো। মাঝখানের বড় ছবিটি পীর গাজীর। তার দুই পাশে ভাই কালু ও মানিক। গাজী বসে আছে বাঘের ওপর। এই ছবিটি কেন্দ্র করে আরও আছে কিছু নীতি বিষয়ক ছবি বা চিত্র। মনোরম ক্যানভাসের এ পটটির বিভিন্ন অংশের ছবি লাঠি দিয়ে চিহ্নিত করে গীত গাওয়া হয়। লোকগান মূলত একটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় ধারা। এই লোকগানে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের জীবনের হর্ষ, বিষাদ, সার্থকতা, ব্যর্থতার কথা তথা গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের জীবনযাত্রা, রীতিনীতির চিত্র ফুটে ওঠে। বর্তমানে আধুনিক সভ্যতায় প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও পুঁজিবাদী সমাজবাস্তবতায় হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যঋদ্ধ বাংলার লোকসংস্কৃতি। প্রযুক্তির বদৌলতে পাওয়া রঙিনপর্দায় ভিনদেশী সংস্কৃতির জাঁতাকলে নিষ্পেষিত বাংলার আপন শিল্প–সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। আবহমান বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যঋদ্ধ এই লোকসংস্কৃতির সুরক্ষায় সামাজিক ও রাষ্ট্রিক ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।











