(শেষ পর্ব)
বোধ করি সিংহভাগ মানুষ সামাজিক–সাংস্কৃতিক–অর্থনৈতিক বাস্তবতার বাইরে গিয়ে পাহাড়ের প্রতি হৃদয়বৃত্তিক আকর্ষণবোধ করে মূলত এর সৌন্দর্য ও বৃহত্তরকে কেন্দ্র করে। পাহাড়, টিলা, ঝরনা, নদী, ঝিরি, সাগর, মেঘ, অরণ্য আর প্রাণিকুলের সামষ্টিক ও পারস্পরিক প্রাকৃতিক সম্পর্কের রসায়ন আমাদের টানে, মনের পুষ্টি জোগাতে উস্কানী দেয়, দেয় ভাবনা–নির্মাণে সৃজনশীল দার্শনিক ইশারা। পাহাড়ের মৌন ও ঊর্ধ্বমুখী অভিপ্রায় অভিযাত্রীর কানে যেমন অপ্রতিরোধ্য অভিযাত্রার মন্ত্র দেয়, তেমনই শুধায় নৈঃশব্দের অন্তর্নিহিত সংগীত। এই মন্ত্র ও সংগীত তো সবাই সমান মাত্রায় গ্রহণ করতে পারে না। প্রকৃতির এমন মন্ত্রণা পারে না অনেকেই ঠিকঠাক গ্রহণ করতে, হয়ে ওঠে স্বেচ্ছাবধির । বৈষয়িক উন্নতির স্বার্থপর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে বধির হয়ে ওঠা এই মানুষগুলোর কাছে পাহাড় কেন সমতলের প্রাকৃতিক আবেদনও শূন্যের কোঠায়। এরা দীর্ঘদিন ধরে বাস করা ইতিবাচক প্রকৃতিবান্ধব জনগোষ্ঠীর জন্যও হুমকীস্বরূপ। বাংলাদেশের আদিবাসী পাহাড়ি মানুষদের কথাই ধরুন। তথাকথিত সমতলীয় সভ্য সামাজিক ও রাষ্ট্রিক শক্তির কাছে তাদের জীবনযাত্রা ও ঐতিহ্যের মূল্য কি আজ পর্যন্ত যথাযথ মর্যাদা পেয়েছে? আমরা কি শিখতে পেরেছি বৈচিত্র্যের মধ্যে কী করে ঐক্য গড়তে হয়? দীর্ঘদিনের শাসকশ্রেণীয় কর্তৃত্ববাদ পাহাড়িদের জব্দ করতে পাহাড়কে কলোনীতে পর্যবসিত করেছে। যা সংখ্যাগরিষ্টের সামাজিক ও কর্পোরেট কর্তৃত্ববাদিতাকে প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। ফলে জীববৈচিত্র্য ও অরণ্যের পাশাপাশি পাহাড়–টিলা হারাচ্ছে নিজ অস্তিত্ব। সরকারি–বেসরকারি উন্নয়ন ও ব্যবসার নাম করে বৃক্ষনিধন, পাহাড় নিধন, সর্বোপরী প্রকৃতি–নিধনের উৎসব এদেশে সারা বছর বিরাজ করে। মাটি–পানি–বাতাস সকল কিছুই দূষিত হয়ে উঠেছে, আর তাই তারা আত্মঘাতি অকৃতজ্ঞ মানুষ জাতিকেও দিচ্ছে অভিশাপ। বৈশ্বিক উষ্ণতাবৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভয়ঙ্কর অভিশাপ। এই অভিশাপ থেকে একমাত্র মুক্তির শক্তি পাই আমেরিকার সাদা সর্দারের কাছে লেখা লাল সর্দারের সেই চিঠিটি থেকে। লাল সর্দারের সে চিঠিটা শুধু আমেরিকার প্রেসেডিন্টের জন্য নয়, সকল দেশের সকল কালের মানুষ ও সমাজ–রাষ্ট্রের জন্য লেখা অমর কবিতা, প্রকৃতি–বান্ধব দেশ ও বিশ্বের ইস্তেহার। একটি আধুনিক সভ্য শহর গড়ে তোলার ধুয়া তুলে দিয়ে ১৮৫৪ সালে, আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সিয়াটলের আদিবাসীদের নির্দেশ দেন তাদের বসতি এলাকা ছেড়ে চলে যেতে। প্রত্যুত্তরে সিয়াটল আদিবাসীদের প্রধান (লাল সর্দার) তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতিকে (সাদা সর্দার) একটি চিঠি দেন। চলুন বিখ্যাত নিসর্গপ্রেমী লেখক বিপ্রদাশ বড়ুয়ার অনুবাদে চিঠিটি পড়া যাক–
“কী করে তোমরা বেচাকেনা করবে আকাশ, ধরিত্রীর উষ্ণতা? আমরা তোমাদের চিন্তা বুঝতে পারি না। বাতাসের সতেজতা, জলের ঝিকিমিকি–আমরা তো এগুলোর মালিক নই, তবে তোমরা (আমাদের থেকে) এগুলো কিনবে কেমন করে? এই ধরিত্রীর প্রতিটি অংশই আমাদের লোকদের কাছে পবিত্র। পাইনগাছের প্রত্যেকটি চকচকে ডগা, বালুকাময় প্রতিটি সমুদ্রতট, অন্ধকার বনভূমিতে জমে থাকা কুয়াশা, প্রতিটি প্রান্তর, প্রত্যেকটি পতঙ্গের গুনগুন আমার লোকদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিতে পবিত্র। প্রতিটি বৃক্ষের ভেতর দিয়ে যে বৃক্ষরস প্রবাহিত হচ্ছে, তারা লাল মানুষদের (উপজাতি/আদিবাসীদের) স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছে।
সাদা মানুষের (আধুনিক মানুষদের)-মৃতেরা তাদের নিজেদের দেশকে ভুলে দূর আকাশের তারার কাছে (স্বর্গে) চলে যায়, আমাদের মৃতেরা এই সুন্দর পৃথিবীকে কখনও ভোলে না, কেননা এই পৃথিবী লাল মানুষদের মা। আমরা এই পৃথিবীর অংশ, এও আমাদের অংশ। সুগন্ধ ফুলগুলো আমাদের বোন; হরিণ, ঘোড়া, বিশাল ঈগল পাখি–এরা আমাদের ভাই। পাহাড়ের পাথুরে সব গহ্বর, সরস মাঠ, ঘোড়ার বাচ্চার গায়ের যে উষ্ণতা আর মানুষ–সবকিছু মিলে আমাদের একই পরিবার। তার জন্য ওয়াশিংটনের বড় সাদা সর্দার (তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট) যখন বলে পাঠায় যে, সে আমাদের দেশ নিতে চায়–তখন সে বলে আমাদের বাস করার জন্য একটা সংরক্ষিত অঞ্চল দেবে, যেখানে আমরা আরামে থাকব। সে আমাদের পিতার মতো হবে, আমরা তার সন্তানের মতো হবো। সুতরাং আমরা তার কথা বিবেচনা করে দেখব। কিন্তু এটা এত সহজ নয়। এই ভূমি আমাদের কাছে পবিত্র। যদি আমরা এ ভূমি তোমাদের দিয়ে দিই, তাহলে তোমাদের মনে রাখতে হবে যে, এই ভূমি পবিত্র। তোমরা তোমাদের ছেলেমেয়েদের নিশ্চয়ই শেখাবে এর পবিত্রতার কথা। তাদের শিখিও যে, এখানকার হ্রদগুলোর পরিষ্কার জলের মধ্যে দেখতে পাওয়া যেকোনো রহস্যময় ছায়াই আমাদের মানুষদের জীবনের কোনো না কোনো ঘটনার স্মৃতি।
ঝরনাগুলোর জলের মর্মরে আমার বাবার ও তার পিতৃপুরুষদের স্বর শোনা যায়।
নদীরা আমাদের ভাই, তারা আমাদের তৃষ্ণা মেটায়। নদীরা আমাদের ক্যানো (এক রকম নৌকো) বয়ে নিয়ে যায়, আমাদের ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার জোগায়। যদি আমাদের দেশ তোমাদের দিয়ে দিই তাহলে তোমরা মনে রেখো, তোমাদের ছেলেমেয়েদের শিখিও যে, নদীরা মানুষের ভাই, সুতরাং তোমরা নদীদের সেরকমই যত্ন করো যেমন তোমরা তোমাদের ভাইদের করো।
আমরা জানি সাদা মানুষ আমাদের ধরন–ধারণ বোঝে না। তার কাছে পৃথিবীর এক অংশের সঙ্গে অন্য অংশের কোনো তফাত নেই। কেননা সে ভিনদেশি– রাত্রির অন্ধকারে আসে, নিজের যা দরকার মাটির কাছ থেকে কেড়েকুড়ে নিয়ে চলে যায়। এই ধরিত্রী তার আত্মীয় নয়, তার শত্রু। সে একে জয় করে, তারপর ফেলে দিয়ে যায়। সে পেছনে ফেলে দিয়ে যায় নিজের পিতার কবর, কিছুই মনে করে না। নিজের সন্তানের কাছ থেকে পৃথিবীকে সে চুরি করে, কিছুই তার মনে হয় না। তার পিতৃপুরুষের কবর, তার সন্তানের অধিকার সে ভুলে যায়। তার মা এই ধরিত্রী, তার ভাই আকাশ–এসবকে সে মনে করে ভেড়া কিংবা রঙিন পুঁতির মতো কেনাবেচা করার, লুট করার জিনিস। তার লোভ এই পৃথিবীকে খেয়ে ফেলবে, পড়ে থাকবে কেবল এক মরুভূমি। আমরা এসব বুঝতে পারি না। আমাদের ভাবনা অন্যরকম। তোমাদের শহর লাল মানুষদের ব্যথা দেয়। অবশ্য আমরা লাল মানুষেরা জংলি, তার জন্যই হয়তো এমন হয়। সাদা মানুষদের শহরে কোথাও শান্ত নিরিবিলি জায়গা নেই–যেখানে বসে বসন্তকালে পাতায় কুঁড়িগুলোর খুলে যাওয়ার শব্দ শোনা যায়। অবশ্য আমরা জংলি বলেই আমাদের এরকম মনে হয়। এত গোলমাল মনে হয় যেন তারা মানুষের কানকে অপমান করছে। জীবনের কী মূল্য আছে একজন লোক যদি জলের ঘূর্ণির মধ্যে আপন মনে একাকী গুনগুন করার শব্দ শুনতে না পায়? কিংবা রাতে ব্যাঙদের বকবকানি? আমি একটা লাল মানুষ, আমি এসবের কিছু বুঝতে পারি না (অর্থাৎ শহরের) । আমরা লাল লোকেরা ছোট পুকুরের জল ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের হালকা শব্দ শুনতে ভালোবাসি, ভালোবাসি দুপুরের বৃষ্টিতে ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যাওয়া বাতাসের নিজস্ব গন্ধ, পাইন বনের গন্ধ। লাল মানুষদের কাছে বাতাস পবিত্র আর মূল্যবান, কেননা জন্তু, গাছ, মানুষ–সবার নিঃশ্বাস একই বাতাসের মধ্যে ধরা আছে।
সাদা মানুষেরা যে বাতাসে নিঃশ্বাস নেয় তার দিকে মন দেয় না। অনেক দিনের বাসি মৃতদের মতো হয়ে গেছে তারা, তাদের চারপাশের বাতাসের দুর্গন্ধ তারা আর বোধ করে না। কিন্তু আমরা তোমাদের দিয়ে দেব আমাদের জমি, মনে রেখো এই বাতাস আমাদের কাছে মূল্যবান। বাতাস যে জীবনকে বাঁচিয়ে রাখে তার সঙ্গে মিশে থাকে। যে বাতাস আমাদের পূর্বপুরুষের বুকে তার প্রথম বাতাসটি দিয়েছিল, সেই তার শেষ নিঃশ্বাসটি ধরে রেখেছে।…
জীবজন্তু ছাড়া মানুষ কী! যদি পৃথিবীতে কোনো জানোয়ার না থাকে, তার আত্মার একাকিত্বে মানুষ নিজেও মরে যাবে। জন্তু–জানোয়ারের যা হবে, কিছুদিন পর মানুষেরও তাই হবে। সবকিছুই একে অন্যের সঙ্গে বাঁধা। এই পৃথিবীর যা হবে পৃথিবীর সন্তানদেরও তাই হবে। জীবনের এই ছড়ানো জাল, মানুষ একে বোনেনি–সে কেবল এর একটি সূতো মাত্র। এই জালটিকে সে যা করবে, তার নিজেরও হবে ঠিক তাই। আজ তোমরা ভাবো ঈশ্বর তোমাদেরই। যেমন তোমরা আমাদের এই দেশকে দখল করে নিতে চাও তোমাদের নিজেদের বলে, কিন্তু তা তোমরা পারবে না। সব মানুষের ঈশ্বর সে, তার দয়ার কাছে সাদা এবং লাল মানুষ একই রকম।”
লাল সর্দারের চিঠির ভাষার মতো হৃদয়ের মানুষের পৃথিবী চাই। যে হৃদয়ের মানুষ শুধু মানুষের জন্য নয়, সমস্ত প্রকৃতির জন্যও। লেখাটার সমাপ্তি টানছি মধুশাহ্’র মাজারের চিল–পূর্ণিমার স্মৃতিকথা দিয়ে। চট্টগ্রামের ওয়ার্লেস এলাকায় পাহাড়ের উপর মধুশাহ্’র আস্তানা। বহু আগেই প্রয়াত হয়েছেন। মাজার যে টিলায় তার পাশের চূড়ায় পাগল–ফকিরদের জন্য ধুনি আছে। সে দিন অর্ধরাতভর গান হয়েছিল পূর্ণিমায়। যে ঘরে গানের আসর বসেছিল হঠাৎ লক্ষ করে দেখি একটি চিল ঘরের একদিকে উপরে কোনায় আড়াআড়ি টানানো বাসের উপর বসে আছে। দেখে মনে হলো সে মোটেও অনাহূত নয়। আর গান ও বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনিতে সে মোটেও বিরক্ত হয় না। বরং আসরের মনোযোগী নিরব শ্রোতা যেন। পরে জানলাম এটা আহত হয়ে পড়েছিল আশেপাশে কোথাও। একজন ফকিরের শুশ্রুষায় সুস্থ হয়। শুশ্রুষার মধ্য দিয়ে তাদের হার্দিক নৈকট্য বাড়ে। এরপর চিলটি ধুনীতেই স্থায়ী বাস শুরু করে। আকাশে কালপুরুষ উঠেছিল কিনা মনে নেই। পূর্ণিমার তীব্র আলোয় পথ চলছিলাম আমি আর সোমনাথ। টিলা কাটার কুৎসিত দৃশ্য কোনও মতেই এড়িয়ে যেতে পারছিলাম না। নিচের দিকে নামছিলাম আর চিলটিকে সুস্থ করা সেই নাম–না–জানা ফকিরের মুখ ভাসছিল চোখে, ভাসছিল লাল সর্দারের চিঠির প্রতিটি অক্ষর, আর মানুষের অসীম মূর্খতাজাত আত্মঘাতি পদচিহ্ন।











