লোকগান হলো সাধারণ মানুষের মৌখিক ঐতিহ্যে চলে আসা গ্রামীণ সংস্কৃতি, আবেগ ও জীবনবোধের গান, যা শ্রুতি ও স্মৃতির ওপর নির্ভর করে যুগ যুগ ধরে টিকে থাকে। বাংলার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর যাপিতজীবন, প্রেম, ভক্তি ও পেশাভিত্তিক জীবনকে প্রভাবিত করা ঐতিহ্যবাহী লোকগানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো–গম্ভীরা। গম্ভীরা গান, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীতের একটি অনুপম ধারা, যার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জনগণের অনুভূতি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে পরিবেশন করা হয়। গম্ভীরা বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার এক বিশেষ লোকসংগীত ও নাট্যধারা। ‘গম্ভীর’ এর শব্দগত অর্থ নিরানন্দ, বিমর্ষ। নিম্নস্বরবিশিষ্ট, লঘু নয় এমন, গভীর, অগাধ। গম্ভীরা শব্দ নিয়ে নানা ধরনের মতবাদ আছে। মধ্যযুগে গম্ভীরা বলতে দেবগৃহ বা মন্দির বুঝানো হতো। কিন্তু বাস্তবে গম্ভীরা নামক কোনো মন্দিরকে কেন্দ্র করে কোনো পূজা ও উৎসবের আয়োজন করা হতো না। মূলত সূর্যপূজা পরবর্তী পর্বে শৈবধর্ম প্রভাবে শিবপূজাকে অনেক সময় গম্ভীরা বুঝানো হতো। গম্ভীরা শব্দ নিয়ে আরও কিছু মতবাদ পাওয়া যায়, এগুলো হলো― ক) হিন্দু পৌরাণিক দেবতা মহাদেবের অপর নাম গম্ভীর। মধ্যযুগে গম্ভীরা বলতে বিশেষভাবে শিবের মন্দির বুঝানো হতো। বহু আগে থেকে উত্তরবঙ্গে চৈত্র সংক্রান্তিতে চড়কপূজা, শিবের নৃত্য ইত্যাদির প্রচলন ছিল। এই কারণে উত্তরবঙ্গের কোথাও কোথাও শিবকে গম্ভীরা বলা হতো। মূলত শিবের গাজন উৎসব থেকে গম্ভীরার ক্রমবিবর্তন। বাঙালি ছাড়াও কোচ, রাজবংশী, পলিয়া এবং মাহালী, হাঁড়ি, বাগদী, কেওট, নুনীয়া, চামার, পোদ নাগর, ধানুক চাঁই, তুড়ী ইত্যাদি সমপ্রদায়ও শিবপূজা (গাজন উৎসব) করতো। এই সূত্রে যে গীত রচিত এবং পরিবেশিত হতো, তাই কালক্রমে গম্ভীরা নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। খ) বিহারে গাওহার বৃক্ষ, উত্তরবঙ্গে গাম্ভীর নামে অভিহিত হয়। শিবপূজায় এই কাঠের পিঁড়ি ব্যবহৃত হতো। সেখান থেকে গম্ভীরা নামটি এসেছে এমনটা অনেকের দাবি। বঙ্গদেশে বৌদ্ধযুগের শেষে হিন্দুধর্মের পুনরভ্যুত্থান ঘটে। এই সময় বুদ্ধমূর্তির আদলে শিবমূর্তি তৈরি হওয়া শুরু হয়। শিবের মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং শিবপূজার ব্যাপক প্রচলনের সূত্রে সৃষ্টি হয়েছিল শৈবধর্ম। বাংলায় পালরাজ্য প্রতিষ্ঠার পর, হিন্দুধর্মের উত্থান শুরু হলে, শৈবধর্ম সুদৃঢ় অবস্থানে চলে আসে। গোড়ার দিকে হিন্দুতান্ত্রিকবাদ এবং শৈববাদের ভিতর দ্বন্দ্ব ছিল। সে সময় শৈবধর্মের অঙ্গ হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলে শিবের গান প্রচলিত হয়। এই গান আঞ্চলিকতার বিচারে গাজন, নীল, গম্ভীরা নামে পরিচিতি লাভ করে। গোড়ার দিকে এই সকল গানের প্রধান উপকরণ ছিল শিববন্দনা। কালের পরিক্রমায় আঞ্চলিক ভাবনা, আর্থ–সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে শিব–সঙ্গীত আঞ্চলিক সংস্করণে নানারূপ লাভ করে। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলা এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে এই গানের নাম হয় গম্ভীরা, উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গের অঞ্চলবিশেষে গাজন এবং পূর্ববঙ্গে এর নাম হয় নীল।
গম্ভীরা গানের গোড়াপত্তন মূলত অবিভক্ত বাংলার মালদা জেলায়, যা শিবপূজাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এবং চৈত্র সংক্রান্তিতে পরিবেশিত হতো; পরে এটি বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীতে জনপ্রিয়তা লাভ করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর লোকসংস্কৃতিতে এটি একটি স্বতন্ত্র ও প্রাণবন্ত ধারা হিসেবে বিকশিত হয়েছে। গম্ভীরা হাজার বছরেরও বেশি পুরনো এবং এটি একটি অনন্য গান ও নৃত্যশিল্প। ‘গম্ভীরা’কে আনুমানিক ১২০০–১৫০০ শতাব্দীর পালযুগের সমসাময়িক বলে মনে করা হয়। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের দিনপঞ্জীতে গম্ভীরার উল্লেখ পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ অঞ্চলে চৈত্রসংক্রান্তির গাজন উৎসবই গম্ভীরা পূজা ও উৎসব নামে পরিচিত। চৈত্রের শেষ চারদিনে মূল অনুষ্ঠান হয়। প্রথমদিন ‘ঘটভরা’ অনুষ্ঠান– গম্ভীরা মণ্ডপে ঘট স্থাপন করে শিবপূজার উদ্বোধন করা হয়। দ্বিতীয় দিনে হয় ‘ছোট তামাশা’– এই দিনে শিব ও পার্বতীর পূজা হয়, পুজার অনুষ্ঠান রং, তামাশা, আনন্দ, রসিকতার মধ্যে কাটে এবং ঢাক–ঢোল বাদ্য সহযোগে মণ্ডপে নানা নৃত্যানুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়। তৃতীয় দিনে ‘বড়ো তামাশা’র সন্ন্যাসীরা শুদ্ধচিত্তে শুদ্ধাচারে কাঁটা–ভাঙ্গা, ফুল–ভাঙ্গা ও বাণফোঁড়ায় অংশ নেয়। এদিন বিভিন্ন সঙের দল ঘোরে; রাতে গম্ভীরা মণ্ডপে মুখোশনৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। চামুণ্ডা, নরসিংহী, কালীর মুখোশ পড়ে উদ্দাম নৃত্যের মধ্য দিয়ে গম্ভীরার বিশেষ রূপ প্রকাশ পায়। চতুর্থ দিনের উৎসবের নাম ‘আহারা’। এই দিন মণ্ডপে শিবের সঙ্গে নীলপূজাও হয়, সঙ্গে গম্ভীরা গান গাওয়া হয়ে থাকে। বিকালবেলায় সঙ বেরোয়। বিভিন্ন সাজে সেজে সঙ গ্রাম–শহর পরিক্রমা করে। এই সঙ আবার দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম রীতিতে গান গেয়ে অভিনয় করা হয়। এখানে সবরকমভাবে নাটকীয় গুণ প্রকাশ পায়। এই রীতিটিই হল গম্ভীরা লোকনাট্য। গম্ভীরা গানের শুরুতে দেবাদিদেব শিবকে বন্দনা করার রীতি আছে। শিবরূপী অভিনেতাকে মঞ্চে নিয়ে এসে তাঁকে সমস্ত বিষয়ে জানানো হয়। সমাজের মঙ্গলের জন্য কী করণীয় বা কোনও সমস্যা থাকলে কীভাবে তার সমাধান করা যেতে পারে, তার প্রতিকারের নিদান দেন শিব। অঞ্চলভেদে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ এমনকি শ্রাবণ মাসেও শিবমূর্তি স্থাপন করে গম্ভীরা পূজা হয়। বর্তমানে শিবপূজা নামে খ্যাত হলেও প্রাচীনকালে এটি সূর্যের উৎসব ছিল বলে মনে করা হয়। শিবের কাছে নিজেদের শোক–সন্তাপ, অভাব–অভিযোগ গানের মাধ্যমে মানুষ দলবদ্ধভাবে প্রকাশ করে–
‘শিব তোমার লীলাখেলা কর অবসান
বুঝি বাচেনা আর জান
অনাবৃষ্টি কইর্যো সৃষ্টি
মাটি করলা নষ্ট হে…’
গম্ভীরা ধর্মীয় প্রেক্ষাপট থেকে সরে এসে সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা তুলে ধরার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে, যেখানে প্রধানত নানা–নাতি বা গুরু–শিষ্যের কথোপকথনের মাধ্যমে বিদ্রুপাত্মক পরিবেশনা করা হয়। আগে গম্ভীরা গানের আসরে শিবের অস্তিত্ব কল্পনা করা হলেও বর্তমানে গম্ভীরা গানের আসরে শিবের পরিবর্তে ‘নানা–নাতি’র ভূমিকায় দুজন অভিনয় করেন। নাটকটি সংলাপের মতো সাজানো, গানের সাথে মেশানো। সংলাপের জন্য গদ্য এবং পদ্য উভয়ই ব্যবহার করা হয়েছে। গম্ভীরা মজাদার সংলাপ, গান, নৃত্য এবং রসিকতার মাধ্যমে সমসাময়িক সামাজিক সমস্যাগুলিকে প্রতিফলিত করে। উভয় অভিনেতাই লুংগি পরেন। ধূসর দাড়িওয়ালা দাদুর মাথায় মাথাল (খড়ের টুপি) এবং হাতে একটি লাঠি থাকে। নাতির পরনে থাকে একটি ছেঁড়া জার্সি এবং কোমরে একটি গামছা বাঁধা। অতীতে গম্ভীরা গান একতাল, ত্রিতাল, দাদরা, খেমটা, কাহারবা ইত্যাদি মাপে গাওয়া হত। বর্তমানে জনপ্রিয় বাংলা ও হিন্দি সিনেমার গান দ্বারা সুর প্রভাবিত। হারমোনিয়াম, তবলা, করতাল, ট্রাম্পেট প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করা হয় গম্ভীরা পরিবেশনায়।
প্রাথমিকভাবে গম্ভীরা দুই ধরণের– প্রাথমিক গম্ভীরা এবং আখ্যানমূলক গম্ভীরা। প্রাথমিক গম্ভীরা দেব–দেবীদের সম্বোধন করা হতো এবং মানুষের আনন্দ– বেদনা, কখনও কখনও বছরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি বর্ণনা করা হতো। আখ্যানমূলক গম্ভীরাতে, প্রতিটি চরিত্র একটি সামাজিক সমস্যার প্রতিনিধিত্ব করতো। আবার গম্ভীরাকে আদ্যের গম্ভীরা এবং পালা–গম্ভীরা হিসেবেও ভাগ করা হয়। পালা–গম্ভীরায় নানা–নাতির অভিনয় কৌশল ও গানের সুর মানুষের হৃদয়কে বিমোহিত করে। পালা গম্ভীরার আধুনিক রূপকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গম্ভীরা শিল্পী ওস্তাদ শেখ সফিউর রহমান ওরফে ‘সুফি মাস্টার’। ১৮৯৪ সালে তৎকালীন মালদহ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ভারতের কিছু অংশ) জেলার ইংরেজ বাজার থানার ফুলবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গম্ভীরা গানের আমূল সংস্কার করেন এবং আধুনিক পালা গম্ভীরার পথ প্রদর্শক। তাছাড়া নবাবগঞ্জের কুতুবুল আলম, রকিবউদ্দিন, বীরেন ঘোষ এবং মাহবুবুল আলম নতুন বিষয়, চরিত্র এবং আকর্ষণীয় ও মজাদার সংলাপ উপস্থাপন করে গম্ভীরা গানকে বাংলাদেশে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। আধুনিক গম্ভীরা গানের প্রবর্তক বিংশ শতাব্দীর বাঙালি বৌদ্ধিক মননের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি বিনয়কুমার সরকার যিনি ১৯০৭ সালে ‘জাতীয় শিক্ষা সমিতি’ গঠনের মধ্য দিয়ে গম্ভীরা আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। গম্ভীরা গানের ছয়টি পর্যায় আছে–বন্দনা পর্যায়, ডুয়েট, চারইয়ারী, রিপোর্ট, ছুট্গান ও সঙ্ের গান। বন্দনা পর্যায়ের গান হলো–
‘ওহে নানা, ভাল্ লাগেনা, দেখে তোর দশা।
বলি ওহে নানা, ভাল্ লাগেনা,
দেখ তোর দশা।
তুই ছিলি হাতি,
রাতারাতি হলি ক্যানে মশা
একি তোর দশা?’…
ডুয়েট পর্যায়ের গান হলো–
‘স্ত্রী: দেখ, সংসারে তো বড্ড অভাব
পুরুষ: এই কথার কি চাহিস জবাব
স্ত্রী: হুকুম দাও তো চাকরি করি
পুরুষ: তোর চাকরির ঠোকনা মারি
আমি ঘরের বৌকে দিয়ে ছাড়ি
ঘুরব হয়ে রাতকানা…’
বাংলাদেশে গম্ভীরার পরিবেশনায় নাট্য ও গানের গুরুত্ব বেশি। এখানে মুখোশের বদলে নানা–নাতির অভিনয়ই মূল আকর্ষণ। নানা ও নাতির আন্তরিক কথোপকথনের মাধ্যমে সমাজের নানা অসঙ্গতি ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়, যা একদিকে দর্শকের মনে হাস্যরসের সঞ্চার করে, অন্যদিকে দর্শকের মনে প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়ে যায়।
দৈনন্দিন জীবনসংগ্রামে সংঘটিত নানা ঘটনা সঙ্গীত ও নৃত্যের মধ্যে দিয়ে উপস্থাপনা ও পর্যালোচনা করাই হচ্ছে গম্ভীরা গানের মূল বৈশিষ্ট্য। সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষামূলক, এমনকি সামপ্রতিকতম নানা রাজনৈতিক হালচালও গম্ভীরা শিল্পের মধ্যে দিয়ে উপস্থাপিত হয়। সব মিলিয়ে যা উপস্থাপন হয় তা মানুষের জীবনের কথা, মানুষের কষ্টের কথা, যাপিতজীবনের সমস্যার কথা। গম্ভীরার সামাজিক বার্তা মানুষের মনে গভীরভাবে দাগ কেটে যায়। ব্রিটিশ শাসনামলে স্বাধীনতা সংগ্রামে এই গানের প্রতিবাদী সুর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। সোস্যাল–মিডিয়ার প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বর্তমানে গম্ভীরা তার জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। বাংলাদেশের লোক–সংস্কৃতির এই উর্বর ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি রক্ষা করতে সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। গম্ভীরা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি গ্রামীণ জনগণের দুঃখ–কষ্ট, রাজনীতি এবং জীবনের বাস্তবতার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি, যা বাংলার সরস লোক–ঐতিহ্য।












