গতি পায়নি টানেল কেন্দ্রিক ব্যবসা,ব্যতিক্রম শুধু কেইপিজেড

ভিড় শুধু খাবারের দোকানে

এম. নুরুল ইসলাম, আনোয়ারা | শনিবার , ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ at ৬:২৩ পূর্বাহ্ণ

কর্ণফুলী টানেল চালুর পর ওয়ান সিটি টু টাউন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক বন্দর সমপ্রসারণ কিংবা কক্সবাজার পর্যন্ত বাণিজ্যিক হাবের নানা কথা শোনা গিয়েছিল। বাস্তবতা হলো তার কোনোটাই এখনে সেভাবে গতি পায় নি। ৩৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে আলো ছড়াচ্ছে কেইপিজেড। গত এপ্রিলে বিনিয়োগ সম্মেলনের পর নতুন নতুন বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন ইউনিট চালুর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সুযোগ ও রপ্তানি বাড়ানোসহ উভয়ক্ষেত্রে রেকর্ড পরিমাণ সাফল্য ধরে রেখেছে কোরিয়ান শিল্পজোন কেইপিজেড।

কর্ণফুলী টানেল চালুর পর কর্ণফুলীর দক্ষিণ প্রান্তে আনোয়ারায় শিল্প সম্ভাবনা বেড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দরের সাথে এই এলাকার দূরত্ব এখন ১০ মিনিটের পথ। কিন্তু সেই অর্থে এখানে এখনো ব্যবসাবাণিজ্যে গতি আসেনি। ভালো কিছু হওয়ার আশায় যারা ছোটমাঝারি পরিসরে ব্যবসা চালু করেছিলেন লোকসান গুণে তারাও দিশেহারা। এখানে সামান্য কিছু ভিডবাট্টা যা আছে তা মূলত টানেল সংযোগ সড়কের চাপেঁয়াজুর দোকান ঘিরে। মানুষ ভাসমান দোকানে ভিড় করায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বড় বড় রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা মালিকানা পরিবর্তন করে কয়েক দফা হাতবদল হয়েছে।

আনোয়ারায় শিল্প বাণিজ্য, কর্মসংস্থানসহ এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নে বড় পরিসরে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি শতভাগ পরিবেশবান্ধব শিল্পজোন হিসেবে বিদেশী বিনিয়োগে সারাদেশের মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে কেইপিজেড।

অনেক বছর ধরে রপ্তানিতে শীর্ষস্থানে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্যোক্তা কিহাক সাংয়ের মালিকানাধীন ইয়াংওয়ান করপোরেশন। এর মূলেই রয়েছে কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরের কেইপিজেড। সর্বশেষ ২০২৪২৫ অর্থবছরে ইয়ংওয়ান ৯৭ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৮৭ কোটি ডলার। সেই হিসাবে গত অর্থবছর তাদের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ। এক বছরে ইয়াংওয়ান ৩ কোটি ৯৭ লাখ পিস তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। আনোয়ারায় অবস্থিত দেশের প্রথম বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কোরিয়ান ইপিজেড ইয়াংওয়ানের হাত ধরেই যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে কেইপিজেডে কাজ করছে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক। যাত্রা শুরুর পর থেকে এই পর্যন্ত জুতা, পোশাক রপ্তানিসহ বিভিন্ন খাতে ৩০ হাজার কোটি টাকা রপ্তানির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পৌঁছে গেছে অনন্য উচ্চতায়। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে আনোয়ারায় শিল্প, কর্মসংস্থান, ব্যবসা বাণিজ্যে, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে বড় ভূমিকায় কাজ করছে কোরিয়ান অর্থনৈতিক অঞ্চল কেইপিজেড।

২০২৩ তারিখের ২৮ অক্টোবর টানেল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। টানেল চালুর পর দুই মাস গাড়ি চলাচলের চাপ থাকলেও পরবর্তীতে ধীরে ধীরে ভাটা পড়ে গাড়ি চলাচলে। প্রতিদিন গড়ে টানেলকে লোকসান গুণতে হচ্ছে ২৭ লাখ ৯ হাজার হাজার টাকারও বেশি। আয়ের তুলনায় লোকসান প্রায় চারগুণের কাছাকাছি। তাছাড়া গত তিন বছরেও টানেলের অতিথিশালা চালু করতে পারেনি সেতু বিভাগ। অতিথিশালা ইজারা দিতে দেশি বিদেশী দরপত্র আহ্বান করা গেলেও এখনো পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। তাছাড়া টানেল এলাকার কাছেই সিডিএর একটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার কথা শোনা গিয়েছিল। সেটিও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে প্রত্যাশা অনুযায়ী গাড়ি চলাচল বাড়েনি। টানেল চালুর সাথে সাথে প্রস্তাবিত চায়না শিল্পজোন গড়ে উঠার কথা থাকলেও এ প্রকল্পের দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। এই মেগাপ্রকল্পটিও সরকারের লাল ফিতায় বন্দি রয়েছে। কবে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে তা কারো জানা নেই। তবে গতি বেড়েছে কেইপিজেডে। গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বিনিযোগ সম্মেলনে কেইপিজেডের প্রতিষ্ঠাতা কিহাক সাং এর সম্মানসূচক বাংলাদেশী নাগরিকত্ব প্রদানের মাধ্যমে সেই সম্ভাবনা আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ইতিমধ্যে কেইপিজেডে ৫০টির বেশি শিল্পকারখানা চালু আছে। পাশাপাশি ১০০শয্যার হাসপাতাল, নার্সিং কলেজ চালু করা হয়েছে। চালুর অপেক্ষা রয়েছে দেশ সেরা টেঙটাইল বিশ্ববিদ্যালয়। সেই সাথে ৫০০ শয্যার বিশ্বমানের আরো একটি মেডিকেল বাস্তবায়ন কাজ শুরু করেছে। স্কুলকলেজ নির্মাণের প্রকল্প চালু করা হয়েছে।

জানা যায়, কেইপিজেডের নিজস্ব ৪৮ শিল্প কারখানার পাশাপাশি বর্তমানে আমেরিকা ও জার্মানির তিনটি কারখানা চালু রয়েছে। আমেরিকাভিত্তিক এমেরিকান এফার্ড সুতা উৎপাদন ও পেঙার বাংলাদেশ এঙেসরিজ উৎপাদনে জড়িত। জার্মানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এনজেল বার্ডের বিনিয়োগ রয়েছে গার্মেন্টস খাতে। তিন প্রতিষ্ঠান মিলে ১৪ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। তাছাড়া আইটিখাতে বড় বিনিয়োগ করেছে কেইপিজেড।

স্থানীয় বৈরাগ ইউনিয়নের বাসিন্দা এডভোকেট নুরুল আজিম জানান, কেইপিজেড প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর আনোয়ারার আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বিপুল সংখ্যক নারী পুরুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে বহুমূখী নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

স্থানীয় ব্যবসায়ী, শাকিল বিন ইসলাম বলেন, কাফকো সেন্টার, চাতরি চৌমুহনী বাজার, আনোয়ারা সদর, বটতলী রুস্তম হাট থেকে শুরু করে পুরো আনোয়ারায় বহুমুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বাসা ভাড়া থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসা, বিনোদন কেন্দ্র সর্বক্ষেত্র কেপিজেডের ভূমিকা অন্যতম।

কেইপিজেডের উপমহাব্যবস্থাপক মুশফিকুর রহমান জানান, কোরিয়ান ইপিজেড দেশের শতভাগ পরিবেশ বান্ধব শিল্পজোন। কেইপিজেডে বিনিয়োগ বান্ধব সবধরনের সুবিধা রয়েছে। কেইপিজেডের বড় সুবিধা হলো ৪০ মেগাওয়াট নিজস্ব সোলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। বর্তমানে উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে ১৬ মেগাওয়াট নিজেদের কারখানায় ব্যবহৃত হচ্ছে, বাকী বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। তাই বিনিয়োগকারীদের বিদ্যুৎ নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। বর্তমানে কেইপিজেডে ৪০ হাজারের বেশি শ্রমিক রয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে কেইপিজেডে ৭০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনগরীর তিন আসনে বাসদ মার্কসবাদীর প্রার্থী ঘোষণা
পরবর্তী নিবন্ধপুলিশ কমিশন-এনজিও আইন তড়িঘড়ি করে পাস করা সমীচীন হবে না : ফখরুল