জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে যে গণভোট হয়েছে তার প্রতি সম্মান দেখাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, অনেক কিছু, আইনের অনেক ব্যত্যয় ঘটিয়ে আমরা এই জায়গায় এসেছি। গতকাল মঙ্গলবার রাতে জাতীয় সংসদে অধিবেশনের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, খেয়াল রাখতে হবে, কোনো বিপ্লব কোনো সংবিধানের আওতায় হয় না, জনগণের ইচ্ছা, জনগণের আকাঙ্ক্ষায় হয়। দুই নম্বর সংবিধানের অনেক কিছু ছাড়াই এ পর্যন্ত আমরা এসেছি। খবর বিডিনিউজের।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারে জুলাই জাতীয় সনদ গ্রহণ করে। জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা ঠিক করে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। আর সেসব সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়নের বিষয়ে জনগণের সম্মতি নিতে ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন হয় গণভোট।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ অনুযায়ী, বর্তমান সংসদের সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও ভূমিকা রাখার কথা। সংসদের মতই সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার কথা। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে, নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তিরা একই দিনে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সে অনুযায়ী প্রস্তুতি রেখেছিল সংসদ সচিবালয়।
জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলের সদস্যরা সেদিন দুটি শপথ নিলেও বিএনপির এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। ফলে নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি।
রোববার বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান কার্যপ্রণালী–বিধির ৬২ বিধি অনুসারে জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের নোটিস দেন। এ নোটিসের ওপর মঙ্গলবার সংসদে আলোচনা হয়েছে। সংসদ নেতার পক্ষে প্রস্তাব রেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেজন্য আজকে এই মহান জাতীয় সংসদে প্রস্তাব রাখছি–সংসদ নেতার পক্ষে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সকল রাজনৈতিক দলের এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করা হোক। উক্ত কমিটিতে সকলে মিলে আলাপ–আলোচনা করে সমঝোতার মাধ্যমে জনপ্রত্যাশিত সংবিধান সংশোধনী বিল এই মহান জাতীয় সংসদে উত্থাপন করি এবং সেটা সমঝোতার মাধ্যমে আমরা গ্রহণ করি। অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, আমরাও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান চাই। সংস্কার পরিষদের ওপর যে আলোচনা হল, তাকে একটি জায়গায় পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তবে সেখানে আমাদের আহ্বান থাকবে সরকারি ও বিরোধী দল, দুই দিক থেকেই সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে এই কমিটি গঠন করতে হবে।
অধিবেশনের পর বেরিয়ে এসে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা বলেছি সমস্যার সমাধান চাই। এখন বিষয়টা সমস্যার মধ্যে ঢুকে গেছে। ওনাদের অনুরোধ করেছি, আপনারা বলেছেন সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ গড়বেন, সেই বাংলাদেশটাই আমরা আশা করি। সামনে আরও অনেক প্রশ্ন আসবে। আমরাও আন্তরিকতা নিয়ে সংসদে আসব। তিনি বলেন, অন্তবর্তী সরকারের ক্ষেত্রেও সংবিধান মানা হয়নি। নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন না করে বাধ্যবাধকতা অমান্য হয়েছে, সেটাও মানতে পারে নাই। অনেক কিছু, আইনের অনেক ব্যত্যয় ঘটিয়ে আমরা এই জায়গায় এসেছি।
জামায়াত আমির বলেন, আইন জনগণের জন্য, আইনের জন্য জনগণের নয়, জনগণের জন্য সংবিধান, সংবিধানের জন্য জনগণ নয়। এরকম অতীতে গণভোট হয়েছে, সংবিধানে ছিল না। সেই গণভোটও হয়েছে এবং তার ফলও জাতি ভোগ করেছে। সাংবাদিকদের সামনে শুরুতেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তবর্তী সরকার গঠন থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাবলীর কথা তুলে ধরেন শফিকুর রহমান। সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার সাক্ষাতের বিষয়টিও আসে সংবাদ সম্মেলনে।
শফিকুর রহমান বলেন, আমরা বলেছি, দেশের ৬৮ ভাগ মানুষ গণভোটে রায় দিয়েছে। আমরা তাদের অনুরোধ করেছি এই গণরায়কে, গণঅভিপ্রায়কে সম্মান করার জন্য। তাহলে তারাও সম্মানিত হবে। আমরা বলেছি গোটা সংসদ সম্মানিত হবে, যদি সবাই মিলে গণভোটকে সম্মান করতে পারি। আমরা আশা করি তারা আন্তরিকভাবে বিবেচেনায় নেবেন।
এসময় আমিরের সঙ্গে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল খান উপস্থিত ছিলেন।













