গণতন্ত্রের পুনরুত্থান : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বাংলাদেশের আগামীর পথ

আলমগীর মোহাম্মদ | রবিবার , ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনশব্দটি দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত, অনিশ্চয়তা আর প্রাণহানির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই কলঙ্কিত ইতিহাসকে মুছে দিয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। উগ্রতা ও নোংরামির ভিড়ে যখন সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হতে বসেছিল, তখন একটি শান্তিপূর্ণ ভোট উৎসব দেশপ্রেমিক নাগরিকদের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছে। বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যেমন সাজে, তেমনি এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্রও এক নতুন সাজে সজ্জিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এই নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি ছিল বাংলাদেশের আত্মপরিচয় রক্ষার এক কঠিন পরীক্ষা, যেখানে জয়ী হয়েছে এ দেশের সাধারণ মানুষ এবং তাদের দীর্ঘদিনের লালিত গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথগত কয়েক মাস ধরে যে পরিমাণ উগ্রতা ও অসভ্যতার বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি, তা কোনো সুস্থ সমাজের কাম্য নয়। ফেসবুকের পাতায় পাতায় যে পরিমাণ ঘৃণার চাষাবাদ করা হয়েছে, ব্যক্তিগত আক্রমণ আর উস্কানির মাধ্যমে যে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলেছে, তা দেখে মনে হচ্ছিল দেশ বোধহয় এক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে। দিনশেষে দেশপ্রেমিক নাগরিকদের জয় হয়েছে। যারা মনে করেছিলেন এ দেশ উগ্রপন্থীদের দখলে চলে যাবে, যাদের ধারণা ছিল বাংলাদেশ হয়তো তার উদারতা হারিয়ে মৌলবাদ বা চরমপন্থার চাদরে ঢাকা পড়বে, তাদের সেই আশংকা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশ তার সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি এবং উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। অতীতের তিক্ততা ভুলে আজ আমাদের এগিয়ে যাওয়ার সময়। নির্বাচনের জয়পরাজয় বড় কথা নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জয়ী হওয়াই ছিল আজকের দিনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।একটি দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন, তার জন্য তিনি বিশেষ ধন্যবাদের দাবিদার। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের আগে ও পরে যে পরিমাণ খুনখারাবিও জানমালের ক্ষতি হতে দেখা যেত, এবার তা থেকে দেশ মুক্ত ছিল। এটি মিরাকল নয়, বরং এটি সঠিক নেতৃত্ব এবং সদিচ্ছার ফল। ড. ইউনূসের নিরপেক্ষ অবস্থান এবং তার আন্তর্জাতিক মানের প্রশাসনিক ও চারিত্রিক দক্ষতা প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্রপ্রধান যদি নির্লোভ হন এবং তার লক্ষ্য যদি হয় কেবল জাতির কল্যাণ, তবে রক্তপাতহীন ক্ষমতা হস্তান্তর এবং একটি স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যেন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, দল বা মতাদর্শ বিশেষ সুবিধা না পায়। তার এই নির্বাচন উপহারবাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অন্যতম মাইলফলক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ড. ইউনূস প্রমাণ করেছেন সংঘাত নয়, সঠিক ব্যবস্থাপনাই পারে একটি জাতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে।

এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পেছনে আরেকটি বিশাল স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং সিভিল প্রশাসন বা আমলারা। অতীতে বিভিন্ন সময় আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক দেখা দিলেও, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের ভূমিকা ছিল অভাবনীয় এবং প্রশংসনীয়। সশস্ত্র বাহিনী কোনো বিশেষ দলের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ না করে জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। তারা প্রমাণ করেছেন, আমাদের জনপ্রশাসন দেশের সংবিধান এবং সাধারণ মানুষের জানমালের অতন্দ্র প্রহরী।

অন্যদিকে, আমলারা তাদের পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ প্রমাণ দিয়েছেন। জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের পোলিং অফিসার পর্যন্ত প্রত্যেকের মধ্যে যে নিরপেক্ষতা এবং দায়িত্ববোধ দেখা গেছে, তা আমাদের আমলাতান্ত্রিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নির্বাচনের মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডতৈরিতে তাদের ভূমিকা ছিল অনবদ্য। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদী বার্তা দেয়। যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তবে এ দেশে সকল প্রকার ভোট এবং জাতীয় সংকট শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সমাধান করা সম্ভব। আগামীর বাংলাদেশের জন্য এই প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ধরে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের ইতিহাসের মহানায়কদের এবং কঠিন সময়ে যারা নিজেদের মেধা ও শ্রম দিয়ে কাজ করেছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার কথা উল্লেখ করতেই হয়। তার রাজনৈতিক জীবন ছিল উত্থানপতন এবং ত্যাগে ভরা। তার আত্মা শান্তি পাক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার যে আপসহীন ভাবমূর্তি এবং অবদান, তা অনস্বীকার্য। এই নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আমাদের উচিত হবে সকল রাজনৈতিক ভেদাভেদ এবং ব্যক্তিগত আক্রোশ ভুলে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ডাক দেওয়া। রাজনীতিতে মতভেদ থাকবেই, কিন্তু সেই মতভেদ যেন কখনো দেশদ্রোহিতা বা একে অপরের প্রতি চূড়ান্ত ঘৃণায় রূপ না নেয়। ফেসবুক বা ডিজিটাল মাধ্যমে যে ঘৃণা ও বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়েছিল, তা ভুলে আজকের এই আনন্দঘন মুহূর্তকে আমাদের সম্মিলিতভাবে উদযাপন করা উচিত। ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং নীতি ও আদর্শের লড়াই হওয়াই হোক আগামীর রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এ দেশের মানুষ প্রমাণ করেছে তারা শান্তিপ্রিয়, তারা প্রগতিশীল এবং তারা নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতন।

এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাঁধে। তাদের মনে রাখতে হবে, এবারের এই নির্বাচনের পরিবেশ এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছে। এই শান্তি বজায় রাখার কৃতিত্ব যতটা না কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের, তার চেয়ে অনেক বেশি এ দেশের সাধারণ জনগণের, যারা চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। কৃতিত্ব ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের, যারা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতিকে একটি পথ দেখিয়েছেন। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী ও আমলাতন্ত্র যে অনন্য উচ্চমান নির্ধারণ করে দিয়েছে, তা যেন ভবিষ্যতে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি যদি আবার ফিরে আসে, তবে এই অর্জন ম্লান হয়ে যাবে। তাই বিজয়ীদের বিনয়ী হতে হবে এবং বিজয় উল্লাসে যেন অন্যের অধিকার খর্ব না হয়, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে।

বাংলাদেশ তার হারানো গৌরব এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার ভাবমূর্তি পুনরায় ফিরে পাবে এই নির্বাচনের মাধ্যমে আশা করা যায়। রক্তপাতহীন এই নির্বাচন বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে দিল যে, উগ্রতা বা পেশিশক্তি নয়, বরং দেশপ্রেম, নৈতিকতা আর নিয়মতান্ত্রিক পন্থাই হলো টেকসই উন্নয়নের মূলমন্ত্র। আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া নয়, গণতন্ত্র মানে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। আজ আমরা যে নতুন সূর্যোদয় দেখছি, তার আলো যেন প্রতিটি নাগরিকের ঘরে পৌঁছায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচার যেন কেবল নির্দিষ্ট কিছু মানুষের হাতে বন্দী না থাকে।

সকল দেশপ্রেমিক নাগরিককে আবারও অভিনন্দন। উগ্রপন্থার করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পাওয়া বাংলাদেশ আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেএটাই হোক আমাদের আজকের শপথ। আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি যেখানে আর কোনো মা’কে তার সন্তান হারাতে হবে না রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে। যেখানে তরুণ প্রজন্ম কোনো নোংরা ট্রোলিং বা উগ্রতার শিকার না হয়ে গঠনমূলক তর্কে মেতে উঠবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের সেই স্বপ্নের দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই পথচলা হোক দীর্ঘস্থায়ী, এই জয় হোক প্রতিটি বাঙালির। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ