বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা একই পর্যায়ে আছে বলে জানিয়েছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এজেডএম জাহিদ হোসেন। গতকাল শনিবার রাতে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান।
বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের এ সদস্য বলেন, গত তিন দিন ২৭, ২৮ ও আজ ২৯ তারিখ; আলহামদুলিল্লাহ উনার অবস্থা একই পর্যায়ে আছে। এটাকে আমরা ডাক্তারি ভাষায় যদি বলি, চিকিৎসকরা যে চিকিৎসা দিচ্ছেন সেটা তিনি গ্রহণ করতে পারছেন। কাজেই এ চিকিৎসা যেন উনি গ্রহণ করে সুস্থ হয়ে যেতে পারেন সেজন্য আপনারা সবাই দোয়া করবেন। এটাই আমাদের আহ্বান।
বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে অধ্যাপক জাহিদ বলেন, বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে সার্বিকভাবে উনার শারীরিক সুস্থতা এবং মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত ও সুপারিশের ওপর। সেই সিদ্ধান্ত ও সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে; আপনাদেরকে জানানো হবে। খবর বিডিনিউজ ও বিবিসি বাংলার।
সবশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জাহিদ বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ম্যাডামের চিকিৎসা কার্যক্রম সার্বক্ষণিকভাবে তদারক করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি সার্বক্ষণিকভাবে চিকিৎসকদের সঙ্গে, মেডিকেল বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে চিকিৎসা কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয়, সেই লক্ষ্যে সার্বিক সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ম্যাডামের চিকিৎসার ব্যাপারে আমরা যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিংস এবং মাউন্ট সিনাইসহ বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকদের আলাপ আলোচনার ভিত্তিতেই ম্যাডামের চিকিৎসা অব্যাহত আছে।
তিনি বলেন, আমরা আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে এবং সকল মানুষের কাছে উনার সুস্থতার জন্য দোয়া চাই। প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যরা, অনেকেই ওনার জন্য দোয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন; সেজন্য আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
জাহিদ বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসার ব্যাপারে দেশের বাইরের অনেক রাষ্ট্রপ্রধান, অনেক সরকার প্রধান, অনেক দেশ তাদের আগ্রহের কথা, উৎকণ্ঠার কথা প্রকাশ করেছেন। সেজন্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এবং সবার সহযোগিতা চেয়েছেন।
বিদেশ নেওয়ার অবস্থায় নেই : ৭৯ বছর বয়সী খালেদা জিয়া ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের গুরুতর সংক্রমণ নিয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। নতুন করে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত রোববার থেকে তিনি হাসপাতালেই আছেন। অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে মেডিকেল বোর্ডের নিবিড় তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে।
গুরুতর অসুস্থ ও সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপার্সনকে বিদেশে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এখনই বিদেশে নেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থায় তিনি নেই। খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় দেশি–বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পরই তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে বিদেশে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হচ্ছে।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব জানান, আমেরিকার জন হপকিন্স এবং লন্ডন ক্লিনিকের চিকিৎসকরা খালেদা জিয়ার চিকিৎসা করছেন। তার শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসায় করণীয় নানা বিষয় নিয়ে গত রাতে প্রায় দুই ঘণ্টা মেডিকেল বোর্ড বৈঠক করেছে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সবশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বেশ কয়েকদিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় এভারকেয়ার হাসপাতালে আছেন। তার শারীরিক অবস্থা কিছুটা সংকটাপন্ন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়া প্রয়োজন, এ কথা তারা (চিকিৎসকেরা) বলছেন যে, হয়তো প্রয়োজন হতে পারে; কিন্তু তার এখন যে শারীরিক অবস্থা, তাকে বিদেশে নেওয়ার মতো কোনো শারীরিক অবস্থা নেই। তবে বিদেশে নেওয়ার জন্য যে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো রয়েছে ভিসা, অন্যান্য দেশের সঙ্গে… যেসব দেশে যাওয়া সম্ভব হতে পারে, সেসব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যাপারগুলো নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে এবং সেগুলো নিয়ে কাজ এগিয়ে আছে। অর্থাৎ যদি প্রয়োজন হয় এবং দেখা যায় যে ‘সি ইজ রেডি টু ফ্লাই’, তখন তাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
এর আগে গতকাল দুপুর ২টা ১৭ মিনিটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিনও খালেদা জিয়াকে বিদেশ নেওয়ার জন্য সব বন্দোবস্তের কথা তুলে ধরেন। নিজের ফেইসবুক পেইজে তিনি লেখেন, আমরা যতটুকু শুনেছি, দেশবাসীর দোয়া ও ভালোবাসায় সিক্ত আপসহীন নেত্রীর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তাকে লন্ডনে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার পরিকল্পনা করছে জিয়া পরিবার। এই বছরেই লন্ডনের যে হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের অধীনে চার মাস থেকে তিনি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন, তাদের সঙ্গে ইতিমধ্যে যোগাযোগ করেছেন তারেক রহমান ও তার স্ত্রী। সেই লক্ষ্যে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত একটি বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালে ভিড় না করার অনুরোধ : বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটময় বলে শুক্রবার জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। খালেদা জিয়ার অসুস্থতার খবরে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত হাসপাতালটিতে ভিড় করছেন নেতাকর্মীরা। তবে নেতাকর্মীদের সেখানে ভিড় না করার অনুরোধ জানিয়েছেন দলের মহাসচিব।
সংবাদ সম্মেলনে ফখরুল বলেন, আমি আপনাদের (সাংবাদিকদের) মাধ্যমে গোটা দেশবাসীর কাছে জানাতে চাই যে, স্বাভাবিকভাবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী এবং তার অসুস্থতায় সব মানুষই উদ্বিগ্ন–উৎকণ্ঠিত এবং অসংখ্য মানুষ হাসপাতালে ভিড় করছেন। এতে করে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকরা অত্যন্ত বিব্রত বোধ করছেন। তারা চিকিৎসাকার্য চালাতে ম্যাডামেরটাও এবং একসঙ্গে অন্যান্য যারা রোগী আছেন সেখানে বিঘ্ন সৃষ্টি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে অনুরোধ জানাতে চাই যে, আপনারা কেউ দয়া করে হাসপাতালে ভিড় করবেন না। অনুগ্রহ করে বিএনপি নেতাকর্মী, তার শুভাকাঙ্ক্ষী বা দেশের মানুষ তারা দয়া করে হাসপাতালে ভিড় করবেন না। সময়মতো তার হেলথ বুলেটিন সম্পর্কে জানানো হবে, সেটা আপনারা জানবেন। কিন্তু আবার অনুরোধ করছি, দয়া করে কেউ সেখানে উপস্থিত হবেন না।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে ‘মশাল রোড শো’ কর্মসূচি ঘোষণা করতে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। সেখানে বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক সবশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে দলের মহাসচিব।
দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন খালেদা জিয়া। তার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, গত কয়েক মাস ধরেই উনি (খালেদা জিয়া) খুব ঘন ঘন আক্রান্ত হচ্ছিলেন। আমরা যে কারণে ভর্তি করিয়েছি সেটা হচ্ছে যে, উনার কতগুলো সমস্যা একসঙ্গে দেখা দিয়েছে। সেটা হচ্ছে, উনার বুকে সংক্রমণ হয়েছে। যেহেতু উনার হার্টের সমস্যা আগে থেকেই ছিল। উনার হার্টে স্থায়ী পেসমেকার আছে এবং হার্টে উনার স্ট্যান্টিং (রিং পরানো) করা হয়েছিল। হার্ট ও ফুসফুস দুটোই একসঙ্গে আক্রান্ত হওয়াতে উনার খুব শ্বাস–প্রশ্বাসজনিত সমস্যা হচ্ছিল। সেজন্য এখানে আমরা খুব দ্রুত উনাকে নিয়ে এসেছি।
ঢাকায় নিজের বাসায় থাকা অবস্থাতেই ২০২১ সালের মে মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেন তিনি। তখনো শ্বাসকষ্টে ভোগার কারণে তাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালের জুনে তার হৃদপিণ্ডে পেসমেকার বসানো হয়। তখনো তিনি মূলত হার্ট, কিডনি ও লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছিলেন, যা তার শারীরিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছিল। এর আগে থেকেই তার হার্টে তিনটি ব্লক ছিল। আগে একটা রিংও পরানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুনে খালেদা জিয়াকে লিভারের চিকিৎসাও দেওয়া হয়েছে বিদেশ থেকে ডাক্তার এনে।












