খালেদা জিয়াকে স্মরণ, সংকটময় সময়ে ঐক্যের আহ্বান

আজাদী ডেস্ক | শনিবার , ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ

নীতির প্রশ্নের বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ‘দৃঢ়চেতা’ মনোভাব, তার ‘প্রতিহিংসার বদলে শান্তির’ বার্তা মনে রেখে সংকটময় সময়ে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান এসেছে নাগরিক শোকসভা থেকে। গতকাল শুক্রবার বিকালে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নাগরিক শোকসভায় নানা শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিদের মানুষের কাছ থেকে এই আহ্বান আসে। খালেদা জিয়ার ছেলে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সপরিবারের সদস্যরা অংশ নেন ওই শোকসভায়। বিএনপি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আর বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও উপস্থিত ছিলেন।

বক্তারা বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ত্যাগ, সংযম, উদারতা ও দৃঢ়তাপূর্ণ নেতৃত্বকে স্মরণ করেছেন। সভা শুরু হয় বিশ্বজয়ী হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরিমের কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। এরপর শোকগাথা পাঠ করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সালেহ উদ্দিন। শোকসভার আহ্বায়ক ছিলেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্ল্যাহ এবং সভাপতিত্ব করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি জে. আর. মোদাচ্ছির হোসেন। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ছিলেন খালেদা জিয়ার ছেলে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্য, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট নাগরিকরা। খবর বিডিনিউজ ও বাংলানিউজের।

শোকসভায় বক্তারা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, দেশজাতি ও গণতন্ত্রের জন্য তার ত্যাগ, ব্যক্তিগত সংযম এবং তার প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলার নানা দিক তুলে ধরেন। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন, উনি থাকবেন। আমরা একটি সংকটকালীন মুহূর্তে আছি। যেকোনোভাবেই হোক ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেন হয়। আমি সেটা চাই। ভোটকেন্দ্রে সবাইকে যেতে হবে উৎসবমুখরভাবে। ভোটের পরিবেশ যেন বিঘ্নিত না হয়। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হতে হবে। বেগম খালেদা জিয়াকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে।

নিউ এইজের সম্পাদক নূরুল কবীর জানান, বেগম খালেদা জিয়া শুধু জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী ছিলেন না, সত্যিকার অর্থেই মানুষের এবং দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন। তার মৃত্যুর মাধ্যমে তিনি তা প্রমাণ করে গেছেন, লক্ষ লক্ষ মানুষের দলমত নির্বিশেষে জানাজায় অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, বলেন নূরুল কবীর। এই সাংবাদিক বলেন, মানুষ হিসেবে বরাবর তার যেই গুণটি আমাকে আকৃষ্ট করেছে, রাজনীতিতে যখন রুচি, শালীনতা এবং পরিমিতিবোধের এক খরা চলছিল বহু বছর ধরে, সে সময় আমি লক্ষ্য করেছি নিরন্তরভাবে, রাজনীতিবিদ হিসেবে তার যেমন সাফল্য ছিল, সে সাফল্য মোকাবিলা করতে গিয়ে তার ওপর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যে আঘাত দিয়েছেন, তার পরিবারের ওপর যে দুর্ভোগ গিয়েছে, এর জন্য কখনোই তিনি প্রকাশ্যে তার বেদনাবোধ বা ক্ষোভের কথা উচ্চারণ করেননি। এই যে সংযম, পরিমিতবোধ এবং আত্মমর্যাদা, রাজনীতিতে অনেক অনুসারী থাকবেন, অনেক মতদর্শন থাকবেই; যিনি রাজনীতিবিদ, যেই সংস্কারেরই অনুসারী হোন না কেন, আজকের বাংলাদেশের অসহিষ্ণু সময়ে এই সংযমপরিমিতিবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। এটা তাকে আজীবন ইতিহাসে অনন্যতার সঙ্গে স্মরণ রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।

খালেদা জিয়া স্বাধীন সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করতেন জানিয়ে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, আমি স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করি। বেগম খালেদা জিয়ার আমলে তার সঙ্গে একাধিকবার দেখা করেছি। তিনি উৎসাহিত করতেন। গণতন্ত্রে তার অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। বিগত সরকার তাকে নানাভাবে নির্যাতন করেছে। এতকিছু করার পরও ৭ আগস্ট তিনি আমাদের যে বাণী দিয়েছেন তা তার উদারতার পরিচয় বহন করে। তিনি বলেছেন, ধবংস নয়। ভবিষ্যতের ভালোবাসা ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার কথা বলেছেন। খালেদা জিয়ার এই বাণীকে যেন আমরা লালন করি।

খালেদা জিয়ার সময়টাকে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে উল্লেখ করে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, এক কঠিন মুহূর্তে তার রাজনৈতিক উত্থান পর্ব। তখন তিনি ছিলেন আপসহীন। সরকার গঠন। এই সময়ে তার সাফল্য ও ব্যর্থতা আছে। আর ২০০৭ সাল থেকে আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় দিতে হবে তিনি নিরপেক্ষ পদ্ধতিতে নির্বাচনে প্রথম প্রধানমন্ত্রী।

বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে দৈনিক আমার দেশএর সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, আমাদের বাংলাদেশে গত ১০০ বছরে পাঁচ জন এমন নেতা এসেছিলেন যারা জীবনের কোনো সময় জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেছেন, তাদের মধ্যে একজন ব্রিটিশ আমলে, দুজন পাকিস্তান আমলে এবং দুজন স্বাধীন বাংলাদেশে। ব্রিটিশ আমলে এসছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। পাকিস্তান আমলে মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশে আমলে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এই পাঁচজনের মধ্যে মওলানা ভাসানী কখনো ক্ষমতায় যাননি, বাকি চারজন ক্ষমতায় গেছেন। এই চারজনের মধ্যে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের রাজনীতিতে উত্থানপতন আছে। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনেও উত্থানপতন আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো শহীদ প্রেসিডেন্ট এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১০০ বছরের ইতিহাসে দুই নেতা এবং নেত্রী, যারা জনপ্রিয়তার শীর্ষে সারা জীবন অবস্থান করেছেন। এটা আমাদের স্মরণে রাখা দরকার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধখালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ইচ্ছাকৃত অবহেলা ছিল : এফএম সিদ্দিক
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে ৯ সংসদীয় আসনে বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী, একটিতে এনসিপি