খাদ্যে স্বাবলম্বী না হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়

রেজাউল করিম স্বপন | মঙ্গলবার , ১৭ অক্টোবর, ২০২৩ at ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ

মুক্তবাজার অর্থনীতির এই যুগে চাহিদা ও যোগানের উপর নির্ভর করে পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয়। চাহিদা বেশি হলে পণ্যের দাম বাড়ে, যোগান বেশি হলে পণ্যের দাম কমে। আর বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের উঠা নামা মূল্য নির্ধারণে মূখ্য ভুমিকা পালন করে। তবে এই ফর্মুলাটি অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কার্যকর হয় না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে সারা বিশ্বে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি কমে সর্বনিম্ন হয়েছে। এই সময়ে চাল ও চিনি ছাড়া বিশ্ববাজারে প্রায় সব খাদ্যপণ্যের দাম কমেছে অথচ আমাদের দেশে দাম বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা সরকারকে ধার দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা ছাপানোকে মূল কারণ বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, পৃথিবীর প্রায় সব দেশ সুদের হার বাড়িয়ে যেখানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করছে, সেইখানে বাংলাদেশ হাঁটছে উল্টো পথে। ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে এখনো কৌশলে সুদহার কমিয়ে রাখা হয়েছে। তারা বলেন, সমন্বিত বাজার অব্যবস্থাপনার কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যার কারণে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত সব ধরনের জিনিস কিনতে সাধারণ মানুষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মূল দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। অভ্যন্তরীণ ভাবে যে রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা, সরকার তা করতে পারছে না। আবার যা আদায় হচ্ছে, তা দিয়ে সরকারের ব্যয় নির্বাহ হচ্ছে না। অন্যদিকে উন্নয়ন ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দেশে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আরো টাকা (ঋণ) নেয়া সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে সরকারকে যোগান দিচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত অবমূল্যায়ন হচ্ছে টাকার এবং সেই অবমূল্যায়নের কারণে দেশে জিনিস পত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। তবে এর বাইরে আরেকটি কারণ হচ্ছে, সরকারের দাম বেঁধে দেওয়া। দেখা যায়, বর্তমানে দেশে এক দশকের মধ্যে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি। দাম বেঁধে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে কমছে না। বলা যায়, সরকার বাজারকে বাজারের মত চলতে দিচ্ছে না। আর এতেই ঘটছে বিপত্তি।

কয়েকদিন আগে সরকার আলু, পেঁয়াজ ও ডিমের দাম বেঁধে দেওয়ার পাশাপাশি মূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজারে অভিযান শুরু করে। এতে দাম না কমে বাজারে আলু ও দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ কমে যায়। খুচরা বিক্রেতারা বলেন, অভিযানের আতঙ্ক ও লোকসানের ভয়ে তাঁরা নতুন করে দোকানে আলু ও পেঁয়াজ তুলতে চাইছেন না। তারা বলেন, আলু ও পেঁয়াজ বিক্রি না করলে তাদের খুব বেশি ক্ষতি নেই। কিন্তু সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি করলে লোকসান দিতে হবে। তাই তাঁরা বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। এই তিন পণ্যের বাইরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), ভোজ্যতেল ও চিনির দাম সরকার আগে বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু সেসব পণ্যও সরকার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) দেশে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। ১ জুন ২০২৩এ নির্ধারিত বাজার মূল্য অনুযায়ী প্রতি কেজি আলু ৪০৪২ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ৭০৮০, আমদানি করা পেঁয়াজ ৭৫৮৫, রসুন (দেশি) ১৪০১৬০, শুকনা মরিচ (দেশি) ৩৯০৪২০, বেগুন ৪০৬০, আদা (দেশি) ৩২০৩৪০, লবণ (আয়োডিনযুক্ত) ৩৮৪২, চিনি ১৩০১৪০, মসুর ডাল ১৩০১৩৫, ছোলা ৮০৮৫, ব্রয়লার মুরগি ১৯০২১০, খাসির মাংস ১,০০০,১০০, গরুর মাংস ৭৫০৭৮০ টাকা, ডিম (ব্রয়লার) ৪৭৫০ টাকা হালি, সয়াবিন তেল প্রতি লিটার (খোলা) ১৭৫১৮৫ ও শর্ষের তেল (বোতল) ৩৬০ টাকা।

তবে নিত্যপণ্যের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির ফলে নানা শ্রেণি পেশার মানুষসহ সাধারণ জনগোষ্ঠীর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই তুলনায় মানুষের আয় সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। লাগাম হীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে বেশির ভাগ মানুষ তাঁদের চাহিদা মেটাতে অক্ষম হয়ে পড়ছে। এতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সামপ্রতিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালের আগস্টে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ১২.৫৪%। এই মূল্যস্ফীতি (১২.৭১%) বেশি বেড়েছে গ্রামীণ এলাকায়। যা ২০২৩ সালের জুলাইতে ছিল ৯.৮২%। সব মিলিয়ে ২০২৩ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ৯.৪০%। তবে মূল্যস্ফীতি আরো অনেক বেশি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আয় বেশি হলে জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও মানুষের তেমন সমস্যা হয় না। সহজ করে বললে, মূল্যস্ফীতি যদি ৯% হয়, আর মজুরি বৃদ্ধির হার যদি এর বেশি হয়, তাহলে বাড়তি দাম দিয়েও পণ্য কিনতে পারেন ক্রেতারা। বিবিএসের হিসাবে দেশে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার এক বছর ধরে কম। তাদের হিসাবে দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতির হার ৯% উপরে। আর গত এপ্রিলে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.২৩%

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে অতি মুনাফা এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এক সময় কিছু পণ্য নিয়ে কারসাজি হতো এখন কারসাজি হয় না এমন পণ্য পাওয়া দুষ্কর। ব্যবসায়ীরা নীতি নৈতিকতা ভুলে শুধু লাভের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা একবার রাশিয়াইউক্রেন যুদ্ধের কারণ দেখিয়ে ও বিশ্বে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সমস্যার কথা বলে নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির করেছিল। পরবর্তীতে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি ও সংকট, এলসি খোলা যাচ্ছে না আবার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এভাবে নানা অজুহাত সামনে এনে অস্থিরতা তৈরি করছে, এর ফলে বাড়ছে আমদানি করা পণ্যের মূল্য।যা দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য অশনি সংকেত।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরকার শুধু দাম নির্ধারণ করে দিলে হবে না। প্রয়োজন এই সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং কৃষি, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে নিয়ে সমন্বিত বাজার তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, ব্যবসায়ীরা বাজার তদারকিকে হাস্যকর করার জন্য নানা ফন্দিফিকির করে। এজন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে যেসব পণ্য নিয়ে কারসাজি হবে সেইগুলো দ্রুত আমদানি করে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি বিপুল সংখ্যক মানুষকে স্বস্তি দিতে হয়, তাহলে মানুষের আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো অর্থনীতি ও ব্যবসা বাণিজ্য চাপে থাকায় যতটা প্রয়োজন, মজুরি ততটা বাড়ছে না। অন্যদিকে অর্থনীতিতে যথেষ্ট কর্মসংস্থানও হচ্ছে না। তাঁরা আরো বলেন, আমাদের অর্থনীতিতে বিপুল শ্রমশক্তি উদ্বৃত্ত রয়েছে। সরকারি তথ্যে বেকারত্বের হার কম দেখা গেলেও আসলে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার অনেক বেশি। তারা আয় করতে পারছে না। আবার অর্থনীতিতে যথেষ্ট বিনিয়োগও হচ্ছে না। আর বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থানও বাড়বে না। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দরিদ্র শ্রেণির জন্য কিছু ব্যবস্থা করতে হবে, তাঁদের সরকারি সহায়তা দিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি আরো বাড়াতে হবে। অন্যদিকে দেশের পতিত জমিতে নিত্য প্রয়োজনীয় কৃষি পণ্যের চাষ বাড়াতে হবে, যাতে কোথাও কোনও জমি পতিত না থাকে। এক্ষেত্রে কৃষি অধিদপ্তর কে আরো সক্রিয় করতে হবে। কৃষকের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিনামূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক ও পর্যাপ্ত পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে করে দেশ খাদ্যে দ্রুত স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

পূর্ববর্তী নিবন্ধসংবাদপত্রের একটি স্লোগান
পরবর্তী নিবন্ধভূগোলের গোল