খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক প্রশান্তিতে মিলবে মুক্তি

রমজানে আইবিএস

ডা. তারেক শামস | বৃহস্পতিবার , ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:৩৩ পূর্বাহ্ণ

একটি বাস্তব চিত্র

৩০ বছর বয়সী নাসরিন খাতুন, পেশায় একজন স্কুল শিক্ষিকা। রমজান মাস এলে তাঁর মন খুশিতে ভরে উঠলেও পাশাপাশি এক অজানা দুশ্চিন্তাও তাঁকে ঘিরে ধরে। ইরিটেবল বা ওয়েলসিনড্রোমে (আইবিএস) আক্রান্ত নাসরিনের কাছে সেহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত দীর্ঘ সময় পাড়ি দেওয়া মানেই পেটে ব্যথা, অস্বস্তি আর পেট ফাঁপার বিরুদ্ধে এক নিরন্তর লড়াই। নাসরিনের মতো অসংখ্য রোগীর মনে একই প্রশ্নশারীরিক এই যন্ত্রণা সামলে কীভাবে পবিত্র মাসের রোজা ও ইবাদত স্বস্তির সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব?

আইবিএস কী ও কেন হয়?

নাসরিনের এই উদ্বেগের মূলে রয়েছে অন্ত্রের একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে আইবিএস নামে পরিচিত। মজার ব্যাপার হলো, এই সমস্যায় অন্ত্রে কোনো বাহ্যিক ক্ষত থাকেনা, বরং এর স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। এর প্রধান কারণ হলো ‘ব্রেইনগাটঅ্যাক্সিস’ বা মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের সংযোগে সমন্বয়হীনতা। যখন আমাদের মস্তিষ্ক চাপে থাকে, তখন অন্ত্রের স্নায়ুগুলো সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নির্দিষ্ট কিছু শর্করা, যাকে বলা হয় ফডম্যাপ। এই শর্করাগুলো ক্ষুদ্রান্ত্রে ঠিকমতো শোষিত না হয়ে সরাসরি বৃহদান্ত্রে চলে যায় এবং সেখানে ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে গাঁজন ফারমেনটেশন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত গ্যাস ও পানি তৈরি করে অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়।

রমজানের রোজা : ঝুঁকি না সুযোগ?

প্রশ্ন জাগতে পারে রমজানের দীর্ঘ উপবাস কিএই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে? উত্তরটি নির্ভর করে আমাদের জীবনযাত্রার ওপর। সাধারণত সারাদিন না খেয়ে থাকার পর ইফতারে যখন আমরা হঠাৎ প্রচুর পরিমাণে ভাজাপোড়া, ঝালমসলা বা মিষ্টি খাবার গ্রহণ করি, তখনই আইবিএসের উপসর্গ গুলো তীব্র হয়। কিন্তু আমরা যদি সঠিক নিয়ম মানি, তবে রোজা হতে পারে একটি পরম আশীর্বাদ। রমজানের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও একাগ্রতা মানসিক চাপ কমিয়ে অন্ত্রের পেশিগুলোকে শিথিল করতে সাহায্য করে।এই দীর্ঘ উপবাস মূলত আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে বিশ্রামের সুযোগ দেয় এবং অন্ত্রের অতিসংবেদনশীলতা কমিয়ে আনে।

সমাধান কোন পথে?

এই সুফল পেতে হলে আমাদের প্রতিদিনের সেহরি ও ইফতারে কিছু সচেতন পরিবর্তন আনা জরুরি। সেহরিতে : নাসরিনের মতো রোগীদের এমন খাবার বেছে নিতে হবে যা সহজপাচ্য; যেমন ওটস, চিড়াদই, ডিমবাকলা। রান্নায় অতিরিক্ত পেঁয়াজরসুন এড়িয়ে চলাই ভালো।

ইফতারে : ইফতারের সময় ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে অল্প পরিমাণে খাবার খাওয়া শুরু করতে হবে। ঐতিহ্যবাহী ভাজাপোড়ার বদলে গ্রিল করা মুরগি বা মাছ এবং পরিমিত পানি স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে। খেজুর খেতে চাইলে একটির বেশি না খাওয়াই ভালো।

রাতের অভ্যাস : একবারে পেট ভরে না খেয়ে রাতের সময়টুকুতে খাবারগুলোকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। ক্যাফে ইনওকার্বনেটেড পানীয় এড়িয়ে পর্যাপ্ত সাধারণ পানি পান করা জরুরি। শেষে বলা যায়, খাদ্যাভ্যাসে পরিমিতিবোধ আর রমজানের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি নাসরিন খাতুনের মতো হাজারো রোগীর জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।একটু সঠিক পরিকল্পনা আর মনের প্রশান্তিই পারে আপনার সিয়াম সাধনাকে নিরাপদ ওআনন্দময় করতে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকেউ কাপড় কাটছেন, কেউ করছেন সেলাই
পরবর্তী নিবন্ধআমাদের ভাষা আমাদের আশা