সকালটা অন্য দিনের মতো নয়। কোর্ট চত্বরের এক কোণে বসে থাকা পুরোনো লোহার যন্ত্রটি যেন আজ একটু বেশি ক্লান্ত। তার চাবিগুলোতে ধুলো জমেছে, রঙ ফিকে, ফিতার কালো কালি প্রায় নিভে আসছে। কখনো কোনো আঙুল এসে পড়ে কি না–এই অপেক্ষায় সে দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে। এক সময় যে যন্ত্রের খটখট শব্দে মুখর হয়ে উঠত অফিসপাড়া, আদালতের বারান্দা, ভূমি অফিসের উঠান–আজ সেখানে শুধু নীরবতা। নীরবতার ভেতর যেন চাপা পড়ে আছে একটি পেশার দীর্ঘশ্বাস, একটি সময়ের বিদায়। টাইপরাইটার একসময় ছিল আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ তা স্মৃতি।
একসময় ছিল, যখন কোনো অফিসে ঢুকলেই প্রথম যে শব্দ কানে আসত, তা ছিল খটখট। সেই শব্দে ছিল কর্মব্যস্ততা, ছিল মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্ন, ছিল শ্রমজীবী মানুষের অস্তিত্ব। কোর্টের বারান্দায় সারি সারি টেবিল, নড়বড়ে চেয়ার, কার্বন কাগজ, কালো ফিতা–এই ছিল এক শ্রেণির মানুষের জগৎ। তাদের সামনে বসে মানুষ লিখত জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজ–মামলার আবেদন, জমির দলিল, অভিযোগ, বিয়ের চুক্তি, বিচ্ছেদের নথি, কখনো শেষ আশ্রয়ের আবেদন। অন্যের জীবনের গল্প টাইপ করতে করতে তারা যেন হয়ে উঠেছিল সমাজের নীরব সাক্ষী।
টাইপরাইটার শুধু একটি যন্ত্র ছিল না; এটি ছিল প্রশাসনের ভাষা, আইনের হাতিয়ার, মধ্যবিত্ত জীবনের ভরসা। যখন হাতের লেখা ছিল ধীর ও অস্পষ্ট, তখন টাইপরাইটার মানুষের চিন্তাকে দিল গতি, কাগজে দিল শৃঙ্খলা। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমা বিশ্বে এই যন্ত্রের জন্ম হয়। ১৮৬০–এর দশকে প্রথম ব্যবহারিক টাইপরাইটার তৈরি হয়, ১৮৬৮ সালে এর পেটেন্ট নেওয়া হয়, আর ঊনিশ শতকের শেষভাগে এটি আধুনিক অফিসের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে। এই যন্ত্রের সঙ্গে জন্ম নেয় QWERTY কিবোর্ড বিন্যাস–যা আজও বিশ্বের প্রায় সব কিবোর্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ঔপনিবেশিক প্রশাসনের হাত ধরে টাইপরাইটার আসে উপমহাদেশে। ঊনিশ শতকের শেষ দশক থেকে ব্রিটিশ শাসনামলে সরকারি দপ্তর ও আদালতে টাইপরাইটারের ব্যবহার শুরু হয়। বিশ শতকের শুরুতে এটি ধীরে ধীরে প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে। বাংলা, উর্দু, হিন্দি ভাষার জন্য তৈরি হয় আলাদা টাইপফেস। বিশ শতকের মধ্যভাগে শহর থেকে মফস্বল–সবখানে টাইপরাইটার হয়ে ওঠে অপরিহার্য। তখন টাইপরাইটার মানেই চাকরি, মানেই সামাজিক মর্যাদা, মানেই মধ্যবিত্ত জীবনের নিরাপত্তা।
এক সময় পাড়ার মোড়ে শর্টহ্যান্ড স্কুলে সন্ধ্যার পর খটখট শব্দে মুখর হয়ে উঠত পরিবেশ। ছেলেদের বসানো হতো টাইপরাইটারের সামনে, কারণ বিশ্বাস করা হতো–এই যন্ত্র একদিন সংসারের চাল–ডাল জোগাবে। টাইপিংয়ের গতি ছিল ভবিষ্যতের মাপকাঠি। মিনিটে কত শব্দ টাইপ করা যায়–এই প্রশ্নেই নির্ধারিত হতো চাকরি, আয়, সামাজিক অবস্থান। টাইপরাইটার ছিল শুধু প্রযুক্তি নয়; এটি ছিল মধ্যবিত্ত সমাজের আত্মবিশ্বাস।
কিন্তু সময় বদলাতে শুরু করে।
বিশ শতকের শেষভাগে নীরবে এসে হাজির হয় কম্পিউটার। তার সঙ্গে আসে কিবোর্ড, স্ক্রিন, সফটওয়্যার, অটো সংশোধন। ভুল হলে আর কাটাকাটি নেই, কার্বন কাগজ নেই, ফিতা নেই, খটখট শব্দ নেই। নব্বইয়ের দশক থেকে টাইপরাইটারের প্রয়োজন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। দুই হাজার সালের পর ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে টাইপরাইটারের চাহিদা দ্রুত মলিন হয়ে যায়। যেখানে একসময় খটখট শব্দ ছিল আধুনিকতার প্রতীক, সেখানে এখন নিঃশব্দ কিবোর্ড আধুনিকতার ভাষা।
প্রযুক্তির এই অগ্রগতি মানুষের কাজকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে কেড়ে নিয়েছে বহু মানুষের জীবিকা। টাইপরাইটারের সঙ্গে যারা নিজেদের জীবন গড়ে তুলেছিল, তারা হঠাৎ করেই নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক বলে আবিষ্কার করল। যেখানে একসময় সারিবদ্ধভাবে বসে কাজ করত অসংখ্য মানুষ, সেখানে আজ নীরবতা। কেউ পেশা বদলাতে পেরেছে, কেউ পারেনি। যারা পারেনি, তারা আজও পুরোনো যন্ত্রটিকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকে কোনো কাজের আশায়। সারাদিন বসে থেকেও কখনো দুই–তিনটি কাজ জোটে, কখনো একটি–ও নয়। আয় কখনো সামান্য, কখনো শূন্য। তবু তারা আসে–কারণ এই যন্ত্রের বাইরে তাদের আর কোনো পরিচয় নেই। পুরোনো টাইপমেশিনের চাবিগুলো ক্ষয়ে গেছে, রোদ–বৃষ্টি সহ্য করতে করতে রঙ ফিকে হয়েছে, কিন্তু মায়া কমেনি। এই যন্ত্র শুধু কাজ নয়; এ তাদের অতীত, তাদের দক্ষতা, তাদের আত্মসম্মান। যন্ত্রটির প্রতিটি কী–তে জমে আছে অগণিত মানুষের গল্প– বিচারের আবেদন, দুঃখের চিঠি, স্বপ্নের দলিল, হতাশার আর্তনাদ।
টাইপরাইটারের পতন কেবল একটি প্রযুক্তির বিলুপ্তি নয়; এটি একটি সামাজিক শ্রেণির ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার গল্প। একসময় যে পেশা ছিল সম্মানের, আজ তা প্রায় অপ্রয়োজনীয়। যে মানুষগুলো রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও আইনগত কাঠামোর ভিত গড়ে তুলেছিল, তারা আজ ইতিহাসের আড়ালে চলে যাচ্ছে। তাদের জীবনসংগ্রাম, দারিদ্র্য, অপেক্ষা ও হতাশা আধুনিক সমাজের উন্নয়নের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির জয়গান গাইতে গিয়ে আমরা ভুলে যাচ্ছি–প্রতিটি উন্নতির পেছনে কিছু মানুষের জীবনের পরাজয় লুকিয়ে থাকে।
তবু টাইপরাইটার শুধু পরাজয়ের গল্প নয়; এটি স্মৃতির গল্প। সাহিত্য, সিনেমা, সংস্কৃতি–সবখানে টাইপরাইটারের উপস্থিতি ছিল অবিচ্ছেদ্য। অফিসপাড়ার দৃশ্য, আদালতের পরিবেশ, মধ্যবিত্ত জীবনের সংগ্রাম–সবখানেই খটখট শব্দ ছিল জীবনের ছন্দ। এই যন্ত্র মানুষের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে, তা ছাড়া এক সময়ের সমাজকে কল্পনা করাই কঠিন।
আজ যখন আমরা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ আর ডিজিটাল স্ক্রিনে শব্দ লিখি, তখন হয়তো বুঝতে পারি না–একসময় প্রতিটি অক্ষরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মানুষের শ্রম, অপেক্ষা ও স্বপ্ন। পুরোনো টাইপরাইটারের চাবিগুলো আজ আর সচল নয়, কিন্তু স্মৃতি নিঃশেষ হয়নি। কোর্টের কোনো কোণে, অফিসের কোনো পরিত্যক্ত ঘরে কিংবা ফুটপাতের কোনো ছায়ায় পড়ে থাকা যন্ত্রটির ভেতর এখনো যেন জমে আছে এক সময়ের শব্দ।
খটখট… খটখট…
সে শব্দ আর বাস্তবে নেই। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে, মানুষের স্মৃতিতে, মধ্যবিত্ত জীবনের আত্মায়– সে এখনো বেঁচে আছে। কারণ টাইপরাইটার ছিল শুধু একটি যন্ত্র নয়; এ ছিল সময়ের ভাষা, শ্রমের মর্যাদা, আর হারিয়ে যাওয়া এক শ্রেণির মানুষের নীরব ইতিহাস।











