এলপি গ্যাসের পর এবার সংকট দেখা দিচ্ছে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের। আগামী ৬ দিনের মধ্যে দেশের ডিজেল এবং জেট ফুয়েলের মজুদ ফুরিয়ে যাচ্ছে। পাইপলাইনে যে তেল রয়েছে সেগুলো এনে বহির্নোঙর থেকে খালাস করে ডিপোগুলোতে পাঠিয়ে মাঠ পর্যায়ে পৌঁছাতে যে সময়ের প্রয়োজন তাতে জেট ফুয়েল ও ডিজেলের সংকট প্রকট হবে। তবে বিপিসির পরিচালক (অপা. ও পরি) ড. একেএম আজাদুর রহমান বলেন, আমরা একটু আগে একটি মিটিং করেছি। আমাদের কার্গোগুলো পৌঁছালে আর ক্রাইসিস থাকবে না। বিষয়টি ‘সলভড’ হয়ে যাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে গড়ে ৭০ লাখ টনের কাছাকাছি জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হচ্ছে। এর প্রায় পুরোটা আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল এবং বাকিটা পরিশোধিত অবস্থায় বিশ্বের নানা দেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদার ৮০ শতাংশ ডিজেল। অর্থাৎ দেশে বছরে ৫৫ লাখ টনের বেশি ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদা প্রতি বছর বাড়ছে। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের কৃষি খাতে ডিজেলের চাহিদা বেশি। এছাড়া কলকারখানা, যানবাহনসহ বিভিন্ন জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহৃত হয়।
দেশের জ্বালানি তেলের পুরো নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) হাতে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপিসি তেল আমদানি করে তিনটি তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা অয়েল কোম্পানি, যমুনা অয়েল কোম্পানি ও মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মাধ্যমে বাজারজাত তথা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে। আমদানি এবং সরবরাহ চেইন বিপিসি রক্ষা করে জ্বালানি তেলের যোগান ও চাহিদার সমন্বয় ঘটায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সাপ্লাই চেইনে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এতে করে দেশ ডিজেল এবং জেট ফুয়েলের সংকটে পড়তে যাচ্ছে। আগামী দিন কয়েকের মধ্যে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের মজুদ ফুরিয়ে যাবে। আজ একটি ট্যাংকার ৩২ হাজার টন ডিজেল নিয়ে বহির্নোঙরে পৌঁছার কথা থাকলেও এ জাহাজ থেকে তেল আনলোড করে তা ডিপো পর্যন্ত পৌঁছাতে যে সময় লাগবে, ওই সময় পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর মতো ডিজেল তিনটি তেল বিপণন কোম্পানির কাছে নেই। বিষয়টি নিয়ে গত রাতে উচ্চ পর্যায়ের একটি সভা করেছে বিপিসি। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
যমুনা অয়েল কোম্পানির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, আজ (গতকাল) আমাদের কাছে সর্বমোট ডিজেলের মজুদ রয়েছে ৪৫ হাজার টনের মতো। কাগজপত্রে এই মজুদ থাকলেও এর মধ্যে ফতুল্লা ডিপোতে থাকা অন্তত ১ কোটি লিটার তেল আমরা বিক্রি করতে পারছি না। ডিপোতে তেল নিয়ে যে অনিয়ম হয়েছে সেটির তদন্ত রিপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সমাধা না হওয়া পর্যন্ত এই তেল বিক্রি করা যাবে না। এই তেলসহ ট্যাংকগুলো সিলগালা করে রাখা হয়েছে। এর বাইরে আমাদের কাছে যে পরিমাণ তেল রয়েছে সেগুলো দিয়ে তিন থেকে চারদিনের তেলের যোগান দেয়া সম্ভব। যমুনা অয়েল কোম্পানি প্রতিদিন ৮ হাজার টনের বেশি ডিজেল বিক্রি করে।
পদ্মা অয়েল কোম্পানির একজন কর্মকর্তা বলেন, আমাদের কাছে ৫৪ হাজার টন ডিজেল রয়েছে। আমরা প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৮ হাজার লিটার তেল বিক্রি করি। এই তেল দিয়ে ৬ দিন চালাতে পারব। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মজুদে রয়েছে ২৪ হাজার টন ডিজেল। মেঘনা পেট্রোলিয়ামও দৈনিক প্রায় সাড়ে ৮ হাজার টন ডিজেল বিক্রি করে। এতে করে মজুদে থাকা ডিজেল দিয়ে তারা মাত্র আড়াই থেকে তিন দিন চালাতে পারবে।
ডিজেলের কিছু সংকটের কথা স্বীকার করে বিপিসির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, জাহাজের রিসিডিউলের কারণে ডিজেলের যোগান নিয়ে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। তবে আজ ৩২ হাজার টন ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ বহির্নোঙরে পৌঁছাবে, যা সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র বলেছে, আজ রাত সাড়ে ১২টায় জাহাজটি ৩২ হাজার টন ডিজেল নিয়ে বহির্নোঙরে নোঙর করবে। এই মাদার ট্যাংকার থেকে ছোট অয়েল ট্যাংকারে তেল খালাস করে তা দেশের ডিপোগুলোতে পৌঁছানো এবং ওখানে আনলোড করতে অন্তত ৮ দিন সময় প্রয়োজন। ওই সময় পর্যন্ত সামাল দেয়ার তেল দেশে মজুদ নেই।
অপরদিকে বিমানের জ্বালানি জেট ফুয়েলের অবস্থা আরো শোচনীয়। বিপিসি জেট ফুয়েল আমদানি করে কেবলমাত্র পদ্মা অয়েল কোম্পানির মাধ্যমে বাজারজাত করে। পদ্মা অয়েল কোম্পানির ভান্ডারে জেট ফুয়েলের মজুদ কমে এসেছে। গতকাল সকালে পদ্মা অয়েল কোম্পানির প্রধান ডিপোতে জেট ফুয়েল ছিল প্রায় সাড়ে ৮ হাজার টন। এছাড়া গুদনাইল ও ঢাকা বিমানবন্দর মিলে ছিল ৭ হাজার টনের মতো। দেশে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার টন জেট ফুয়েলের চাহিদা রয়েছে। অর্থাৎ পদ্মা অয়েলের মজুদে থাকা জেট ফুয়েল এক সপ্তাহের মধ্যে ফুরিয়ে যাবে।
বিপিসির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সিঙ্গাপুর থেকে জেট ফুয়েল নিয়ে একটি ট্যাংকারের আসার কথা রয়েছে। জাহাজটি ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছার কথা। জাহাজটি ঠিকভাবে পৌঁছালে জেট ফুয়েলের কোনো সমস্যা হবে না।
তবে গতকাল সিঙ্গাপুরে চট্টগ্রামের জন্য জেট ফুয়েল বোঝাই বা কোনো জাহাজের যাত্রার বিষয়টি প্রকাশ করা হয়নি। এতে করে জাহাজটি যে গত রাতে যাত্রা করেনি তা নিশ্চিত। জাহাজটি যদি আজ রাতে যাত্রা করে তাহলে সেটি চট্টগ্রামে পৌঁছাতে সময় লাগবে কমপক্ষে ৫ দিন। পরে ওই জাহাজ থেকে জেট ফুয়েল আনলোড করে তা ট্যাংকারে করে গন্তব্যে পৌঁছাতে ৮ থেকে ৯ দিন সময় লাগবে। দেশে ৮–৯ দিনের জেট ফুয়েল নেই বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।
বিপিসির সিনিয়র একজন কর্মকর্তা বলেন, কিছু সংকট আছে, তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আমরা মাসে ১৪টি পার্সেল অর্থাৎ দুইদিনে একটি পার্সেল অপারেট করতে পারি। ইলেকশনের জন্য পেট্রোল, অকটেন বাড়িয়ে আনতে হয়েছে। মোটরসাইকেল এবং গাড়ির ব্যবহার বাড়ার ফলে পেট্রোল এবং অকটেনের চাহিদা মাথায় রেখে বাড়তি আনার প্রয়োজন দেখা দেয়। এজন্য ডিজেল এবং জেট ফুয়েলে দুয়েকদিন এদিক–ওদিক হয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে ইরি মৌসুম হওয়ায় ডিজেলের চাহিদা বেড়ে গেছে, বিক্রি বেড়ে গেছে। তাই কিছুটা সংকট তৈরি হচ্ছে। তবে আমরা যত দ্রুত সম্ভব ডিজেল এবং জেট ফুয়েল আনার চেষ্টা করছি।












