কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ফ্রান্সে বিক্ষোভ, কয়েকটি নগরীতে সংঘর্ষ

রাস্তায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ, পুলিশ ৭০ হাজার

| রবিবার , ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং সরকারি নীতির প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ ঠেকাতে দেশজুড়ে কড়া নিরাপত্তা নেওয়ার মধ্যেও ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ শনিবার বিক্ষোভে রাস্তায় নেমেছে। এর মধ্যে কেবল রাজধানী প্যারিসেই নামে ১ লাখ ১০ হাজার বিক্ষোভকারী। বেশ কয়েকটি নগরীতে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ ও ধরপাকড়ের ঘটনা ঘটেছে। খবর বিডিনিউজের।

ফ্রান্সে গত সপ্তাহের সহিংস ঘটনার পর দেশজুড়ে আবারও বড় ধরনের বিক্ষোভের আশঙ্কায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগের দিনই পুলিশ বিভাগ ৭০ হাজার সদস্য এবং বিশেষায়িত ইউনিট মোতায়েন করে। গত সপ্তাহের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এই কড়া নিরাপত্তা নেয় কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যেই বিক্ষোভকারীরা দলে দলে রাজধানী প্যারিসের রাস্তায় নেমেছে। দেশজুড়ে বিক্ষোভের অংশ হিসাবে ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ রাজধানীর রাস্তায় মিছিল করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পতাকা হাতে সমবেত বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ স্লোগান দিচ্ছিল ‘রাষ্ট্র, পুলিশ এবং ফ্যাসিস্টদের পতন হোক’।

ওদিকে, মার্সেই এবং লিওঁ শহরে মুখোশধারী তরুণদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। লিওঁতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিক্ষোভ করার চেষ্টাকালে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস এবং নিস শহরে জলকামান ব্যবহার করে। বিভিন্ন নগরীতে চলা বিক্ষোভে অন্তত ১৩৫ জনকে আটক করা হয়েছে। প্যারিসসহ মন্টপেলিয়ার, রুয়া ও নিসের মতো শহরগুলোর কেন্দ্রস্থলে সভা–সমাবেশ ও মিছিলের ওপর কড়াকড়ি ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

ওর্লেয়াঁ শহরে কট্টর ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র‌্যালির (আরএন) বার্ষিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করেও বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে প্রায় ১১ হাজার মানুষ অংশ নেয়। কয়েকটি নগরীতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হলেও রাজধানী প্যারিসের বড় সমাবেশ মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল এবং গত সপ্তাহের তুলনায় পরিস্থিতি কম গুরুতর ছিল। প্যারিস পুলিশ এবং গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, মূল মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে শেষভাগে কিছু জায়গায় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ জানিয়েছেন, গত ১৭ অক্টোবরের তুলনায় এবার ১০ হাজার বেশি পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হয়। আগের সপ্তাহে বিক্ষোভের একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবার পুলিশকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নুনিয়েজের দাবি, উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্রের তৎপরতায় সহিংসতার ঝুঁকি বেড়েছে। প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকায় শনিবার কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। নগরী লকডাউনের মতো আবস্থায় ছিল। ২০টির বেশি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয় এবং লুভর জাদুঘর, মুসে দর্সে ও প্যারিস অপেরাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। আগের সপ্তাহে দেশটির বিভিন্ন স্থানে দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত ও লুটপাটের ঘটনার পর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও দোকান বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছিল।

প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের মিছিলের পথ নির্ধারণ নিয়েও গোল বেঁধেছে। পুলিশের নির্দেশে মূল মিছিলের পথ শহরের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দক্ষিণ–পূর্ব প্রান্তে নেওয়া হয়। পুলিশের যুক্তি ছিল, আগের সপ্তাহে যেসব বাণিজ্যিক এলাকায় ভাঙচুর হয়েছিল, সেগুলোর কাছ দিয়ে মিছিল গেলে নতুন করে সহিংসতা হওয়ার আশঙ্কায় পথ সরানো হয়েছে। তবে বামপন্থি রাজনীতিবিদদের অভিযোগ, শেষ মুহূর্তে পথ পরিবর্তনের ফলে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে এবং তাদেরকে শহরের কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্যারিসের মিছিলে অংশ নেন বামপন্থি নেতা জ্যঁ–লুক মেলঁশোঁ। তিনি বিক্ষোভকারীদের সংযমের প্রশংসা করেন। ফ্রান্সের সংকট মোকাবেলায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

ফ্রান্স প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দিয়ে এই উত্তাল বিক্ষোভ হচ্ছে। ২০২৭ সালের ১৮ এপ্রিল এবং ২ মে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গত মাসে ফ্রান্সের ক্রেতেই–এ শিক্ষার্থী বিক্ষোভ শুরু হয় এবং দ্রুত তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, স্কুলের দীর্ঘ সময়, পর্যাপ্ত শিক্ষা সরঞ্জামের অভাব এবং স্কুলের জরাজীর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভ চলে আসছে। পুলিশ বলপ্রয়োগ করার কারণে বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে।

শিক্ষার্থী আন্দোলন ধীরে ধীরে জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিরুদ্ধে শ্রমিক ইউনিয়ন এবং অন্যান্য দলগুলোর একটি জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে মিশে গেছে। গত ১৭ অক্টোবর এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এমন এক বড় দাঙ্গা আর লুটপাটে রূপ নেয়, যা ফ্রান্স বহু বছরের মধ্যেও দেখেনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধতত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টির প্রস্তাব এসেছে : সালাহউদ্দিন