সৌদি আরবে আটকা পড়া ক্রুড অয়েল বোঝাই জাহাজ দেশে আনার চেষ্টা করছে সরকার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল বোঝাই অন্তত দুটি জাহাজ দেশে আনার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে তেল বোঝাই একটি অয়েল ট্যাংকার সৌদি আরবে আটকা পড়েছে। অপর জাহাজটির আগামী ২২ মার্চ দুবাই থেকে যাত্রা করার কথা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাহাজ যাত্রা করতে পারছে না। অপরদিকে যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে উঠছে। সাপ্লাই চেইন অনেকটা ভেঙে পড়েছে। ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া থেকে তেল নিয়ে আসার কথা থাকলেও জাহাজগুলো আসেনি। এতে পরিশোধিত তেলের যে প্রবাহ তাও ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যামান পরিস্থিতিতে ইস্টার্ন রিফাইনারিই বিপিসির জ্বালানি তেল প্রবাহের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে দেড় লাখ টনের মতো ক্রুড অয়েল রয়েছে। যা দিয়ে আগামী এক মাসের বেশি সময় উৎপাদন চালানো যাবে। তবে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন দেশের চাহিদার তুলনায় নগন্য হওয়ায় সংকট থেকে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে ৭০ লাখ টনের মতো জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হয়। দেশে সিংহভাগ তেল আমদানি করা হয় পরিশোধিত অবস্থায়। ১৫ লাখ টনের মতো অপরিশোধিত বা ক্রুড অয়েল, যা দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করে বাজাবে দেওয়া হয়।
ক্রুড অয়েলের প্রবাহ ঠিক না থাকলে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। গত ২ মার্চ ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে এমটি নর্ডিক পলাঙ নামের একটি মাদার ট্যাংকার চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রার করার আগে সৌদি আরবের রাস তানুয়া বন্দরে আটকা পড়ে। নির্ধারিত সময়ের আগে জাহাজটিতে ক্রুড অয়েল লোড করা হলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেটি এখনো বন্দরে নোঙর করে আছে। হরমুজ প্রণালি চালু না হওয়া কিংবা বিশেষ কোনো উদ্যোগ না নেওয়া পর্যন্ত জাহাজটি সৌদি আরবের বন্দরে নোঙর করে রাখতে হবে।
অপরদিকে আগামী ২২ মার্চ দুবাইয়ের জেবল আলী বন্দর থেকে এমটি ওমেরা গ্লাস্কি নামের অপর একটি অয়েল ট্যাংকারের ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে যাত্রা করার কথা ছিল। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই জাহাজটিও যাত্রা করতে পারবে না। ক্রুড অয়েল নিয়ে জাহাজ দুটি চট্টগ্রামে না পৌঁছালে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হবে না বলে সূত্র জানিয়েছে।
গতকাল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ক্রুড অয়েলের মজুদ ছিল ১ লাখ ৪৮ হাজার টন। এখানে প্রতিদিন ৪ হাজার টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে। এর মধ্যে ২ হাজার টন ডিজেল, ১১শ টন ফার্নেস অয়েল এবং তিন থেকে চারশ টন পেট্রোল। কিছু জেট ফুয়েল, এলপিজি, বিটুমিনসহ বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করে। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অকটেন উৎপাদন করা হয় না। যে পরিমাণ ক্রুড অয়েল মজুদ রয়েছে তা ব্যবহার করে ইস্টার্ন রিফাইনারি আগামী ৩ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন চালাতে পারবে। এর মধ্যে ক্রুড অয়েল বোঝাই দুটি জাহাজ দেশে পৌঁছলে উৎপাদন সংকট হবে না।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝে হলেও আপাতত এই দুটি জাহাজ দেশে আনার জন্য চেষ্টা করছে সরকার। বিপিসি ইতোমধ্যে পুরো বিষয়টি জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। বিদ্যমান সংকটের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে একটি উপায় বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে। দুবাই থেকে ২২ মার্চ যে জাহাজটির যাত্রা করার কথা রয়েছে সেটি যদি ঠিকভাবে আসতে পারে তাহলে ইস্টার্ন রিফাইনারি অনেকদিনের কাঁচামাল পেয়ে যাবে। এক জাহাজ ক্রুড অয়েল দিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি গড়ে প্রায় এক মাস উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারে। অন্যদিকে দুবাই থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজ পৌঁছাতে ১৩ থেকে ১৪ দিন সময় লাগবে।
বিপিসির পদস্থ একজন কর্মকর্তা গতকাল আজাদীকে বলেন, পরিস্থিতি এখনো আমাদের নিয়ন্ত্রণে। দেশে জ্বালানি তেলের সংকট নেই। যুদ্ধের কারণে সাপ্লাই চেইনে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আমরা তা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত না হলে পরিস্থিতি সামাল দিতে কোনো অসুবিধা হবে না। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় সেক্ষেত্রে আমরা সংকটে পড়ব। জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া এবং ভাড়া অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় পরিশোধিত তেল আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে বলে জানান তিনি। সরকার বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে চট্টগ্রামে গতকালও পেট্রোল ও অকটেনের জন্য পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কোনো কোনো পেট্রোল পাম্প অকটেন নেই বলে নোটিশ লাগিয়ে দিয়েছে। কোনো কোনো পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে। যুদ্ধাবস্থায় জ্বালানি তেলের সংকটের শঙ্কায় মানুষ হুড়োহুড়ি করে অতিরিক্ত তেল কিনতে শুরু করলে বাড়তি চাপ তৈরি হয়, যা সামাল দিতে রেশনিং শুরু করে বিপিসি। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে রেশনিং তুলে দেওয়া হবে বলে জানান বিপিসির একজন কর্মকর্তা।








