বাংলাদেশে ক্যানসারের সামগ্রিক চিত্র খুবই উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার (আইএআরসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর নতুন ক্যানসার রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার এবং মৃত্যু হয় প্রায় ১ লাখ মানুষের। এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মুখ ও ফুসফুসের ক্যানসার, যার বড় কারণ হিসেবে তামাক ব্যবহারকে চিকিৎসাবিজ্ঞান স্পষ্টভাবে দায়ী করছে। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ (জিবিডি) ২০১৯ দেখায়, তামাক ধূমপানজনিত ক্যানসারে বিশ্বজুড়ে মৃতের সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি এবং এশিয়ায় বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেই এর বড় অংশ সংঘটিত হচ্ছে।
প্রতি বছর ৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। মানুষ, স্বাস্থ্যসেবা পেশাদার, প্রতিষ্ঠান এবং সমপ্রদায়কে একত্রিত করে ক্যান্সার সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে, প্রাথমিক সনাক্তকরণকে উৎসাহিত করতে এবং প্রতিরোধ ও চিকিৎসা প্রচেষ্টাকে সমর্থন করতে এই দিবস পালিত হয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ক্যানসার এত বেশি হওয়ার প্রধান কারণ হলো তামাকের সহজলভ্যতা ও ব্যাপক ব্যবহার। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ অনুযায়ী, দেশের ৩৫.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করে– সংখ্যায় যা প্রায় ৩৭.৮ মিলিয়ন মানুষ। এর মধ্যে প্রায় ১৪ শতাংশ মানুষ ধূমপান করে এবং প্রায় ২৮ শতাংশ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করে। অর্থাৎ, শুধু সিগারেট নয়– জর্দা, গুল, সাদা পাতা বা পান–তামাক– সবই ক্যানসার ঝুঁকির বড় উৎস। ধোঁয়াবিহীন তামাকের ক্ষেত্রে তথ্য আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশে পরিচালিত একটি হাসপাতালভিত্তিক কেস–কন্ট্রোল গবেষণায় দেখা গেছে, ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারীদের মুখগহ্বর ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৮.৮ গুণ বেশি। নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি– ১৪ গুণেরও বেশি। গবেষণাটি হিসাব করে দেখিয়েছে, দেশে পুরুষদের প্রায় ৪১ শতাংশ এবং নারীদের প্রায় ৭৬ শতাংশ মুখগহ্বর ক্যানসার ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের কারণে হয়ে থাকে। বিশ্ব ক্যানসার দিবসে ক্যানসার প্রতিরোধের কথা বলতে গেলে, এই তথ্যগুলো উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
বলা হয়ে থাকে, বর্তমানে ৪০ শতাংশ ক্যানসার প্রতিরোধ করা যায়। ক্যানসার চিকিৎসা একটি সমন্বিত চিকিৎসাপদ্ধতি। এটি জটিল, দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল। কেবল কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি বা অস্ত্রোপচার নয়, বরং সব কটি চিকিৎসা সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করতে হয়। এর বাইরে অন্যান্য সাধারণ চিকিৎসাও প্রয়োজন হয়। তাই সমন্বিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা পরিচালিত একটি টিম গঠন করে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হলে ক্যানসার চিকিৎসার সুফল পাওয়া সম্ভব। আমাদের প্রয়োজনীয় ওষুধের ৯০ শতাংশের বেশি ওষুধ দেশীয় কোম্পানি থেকে পাচ্ছি। ফলে ক্যানসার চিকিৎসার খরচ কমে এসেছে অনেক গুণ। ক্যানসার কেমোথেরাপি বা ইমিউনো থেরাপির জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব আমাদের নেই। ওষুধের যথাযথ প্রয়োগের জন্য ল্যাব সুবিধা প্রয়োজন। মলিকুলার টেস্টগুলো না জানলে যথাযথ ওষুধ দেওয়া সম্ভব নয়। বর্তমানে ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। বর্তমানে রোগীদের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হয়। ক্যানসার নিরাময়, সহায়ক চিকিৎসা, প্যালিয়েটিভের জন্য রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হয়। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় মিলে এ সুবিধা আছে যৎসামান্যই। বিষয়টির প্রতি নজর দেওয়া খুবই জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যানসার চিকিৎসায় উন্নত বিশ্বে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। সেসব দেশে অধিকাংশ রোগীর ক্যানসার পূর্ব অবস্থায় বা প্রথম স্টেজেই রোগ নির্ণয় হয়। ফলে উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিরাময় হয়; নিরাময়ের হার অনেক বেশি। অন্যদিকে আমাদের কাছে রোগীদের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ আসেন তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়ে।
এখনো ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও ওষুধের দাম পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় বেশি। রোগীরা উন্নত পদ্ধতিতে রোগ নির্ণয় করতে গিয়ে সিংহভাগ টাকা ব্যয় করে ফেলেন। পরে দেখা যায়, চিকিৎসার জন্য ব্যয় করার টাকা অবশিষ্ট থাকে না। কর মওকুফ করে দেওয়ায় আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে ওষুধের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে গেছে। আমাদের চিকিৎসা ব্যয় বেশি। ব্যয়বহুল এ রোগের চিকিৎসায় সরকারি পর্যায়ে আরো জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ক্যানসার চিকিৎসার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।








