ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে ‘ভূমিধস’ বিজয়ের পর সরকার গঠনের পথে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপি। ২৯৭ আসনের গেজেট প্রকাশের পর এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু – কারা হচ্ছেন তারেক রহমানের প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্য। নতুন–পুরনো মিলে বিএনপির ‘হেভিওয়েট’ নেতাদের নিয়ে আলোচনা উঠলেও অনেকাংশে সারাদেশের মানুষের আলোচনার বাইরে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে পাহাড়ের বাসিন্দাদের কাছে আলোচনার প্রধান কেন্দ্র কে পাচ্ছেন পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব?
২৯৮, ২৯৯, ৩০০ নম্বর পার্বত্য তিনটি সংসদীয় আসন তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান নিয়ে। এরমধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮ নম্বর পার্বত্য খাগড়াছড়ি আসনে জয় পেলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াদুদ ভুইয়া। ২৯৯ নম্বর পার্বত্য রাঙামাটি আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ–ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। অন্যদিকে, দেশের শেষ সংসদীয় আসন ৩০০ নম্বর পার্বত্য বান্দরবান আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাচিং প্রু (জেরি)। পার্বত্য চট্টগ্রামবিয়ষক মন্ত্রণালয় মূলত ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ সইয়ের পর গঠিত হয়েছে। এ চুক্তির আইন অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যিনি দায়িত্ব পাবেন তিনি উপজাতীয় (পাহাড়ি) সদস্য থেকে মনোনীত হবেন। সঙ্গত কারণেই তিন পার্বত্য জেলায় বিএনপি তিনটি আসনে জয় পেলেও পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে ছটকে গেলেন খাগড়াছড়ির ওয়াদুদ ভুইয়া। এ নিয়ে রোববার বিকালে ফেসবুকে এক পোস্টে ওয়াদুদ ভুইয়া নিজেই লিখেছেন, ‘অনেকে না জেনে পোস্ট করছেন, পার্বত্য মন্ত্রণালয় পাহাড়ি ভাইদের জন্যে সংরক্ষিত। এখানে কোনো বাঙালিকে মন্ত্রী করার আইন নাই।’ এখন মূলত আলোচনা কার হাতে উঠছে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের ‘ভার’। দীপেন দেওয়ান, সাচিং প্রু নাকি টেকনোক্র্যাটে অন্য কেউ?
জানা গেছে, দীপেন দেওয়ান কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ–ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ছাড়াও এক সময় রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মূলত ২০০১ সালে রাঙামাটি বিএনপিতে ‘নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে’ দলের চেয়ারপারসান বেগম খালেদা জিয়ার ‘ডাকে’ যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজের চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন দীপেন। যদিও তার বাবা সুবিমল দেওয়ানও এক সময় বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা ছিলেন। সাচিং প্রু’র বাবা অং শৈ প্রু চৌধুরীর ছিলেন জিয়াউর রহমানের আমলে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী ও বান্দরবানের বোমাং সার্কেলের চিফ (রাজা)। পারিবারিকভাবেই দীপেন–সাচিং দুজনই রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান।
এবার ২৯৮ নম্বর পার্বত্য রাঙামাটি আসনে বিএনপির দীপেন দেওয়ান ছাড়াও ছয়জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ২ লাখ ১ হাজার ৮৪৪ ভোট পাওয়া বিজয়ী দীপেন দেওয়ানের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা ফুটবল প্রতীকে পেলেন ৩১ হাজার ১৪২ ভোট। সারাদেশের মধ্যে দীপেন দেওয়ানই সবচেয়ে বড় ব্যবধানে ভোটের মাঠে জিতে আসলেও বেশি ভোট প্রাপ্তির চেয়েও বিভিন্ন পক্ষকে ‘এক ঘাটে’ আনার পেছনে তাঁর নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির নেতাকর্মী–সমর্থক ছাড়াও দীপেন দেওয়ান পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ ব্যতিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) এবং আওয়ামী লীগের ভোটারদের একটি অংশ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভোট পেয়ে জয়ের ক্ষেত্রে বড় ব্যবধান গড়েছেন। বেশি ভোট প্রাপ্তির চেয়েও পাহাড়ের রাজনীতির নানা মেরুকে এক জায়গায় আনার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উদ্যোগ রাখতে পারে।
অন্যদিকে, ৩০০ নম্বর বান্দরবান আসনে সাচিং প্রু ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টি–এনসিপি মনোনীত শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী আবু সাঈদ মো. সুজা উদ্দীন পেয়েছেন ২৬ হাজার ১৬২ ভোট। জয়ের ক্ষেত্রে সাচিং প্রু’র ভোটের ব্যবধানও কম নয়। তিনি পেয়েছেন জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলে সমর্থন। তবে খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপির প্রার্থী থাকলেও জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) সমর্থন পেয়েছেন বিএনপির ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ সমীরণ দেওয়ান। এক্ষেত্রে ‘অন্যের ভোট’ ঘরে আনতে দীপেন নৈপুণ্য দেখিয়েছেন।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর পার্বত্য রাঙামাটি আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনেও তিনি জনসংহতি সমিতি সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ঊষাতন তালুকদারের কাছে হেরে যাওয়ায় প্রতিমন্ত্রী হন বান্দরবানের আওয়ামী লীগের মনোনীত সংসদ সদস্য বীর বাহাদুর উশৈসিং। এরপর দুই মেয়াদে প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী থাকার পর ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী হন খাগড়াছড়ির কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। প্রায় দুই দশক ধরে তিন পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত রাঙামাটির কেউ মন্ত্রী সভায় না গেলেও এবার স্থানীয়দের প্রত্যাশা মন্ত্রী পাওয়ার। ভোঠের মাঠে ‘আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমর্থন’, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও ভৌগলিক গুরুত্ব বিবেচনা এবং সাচিং প্রুর বার্ধ্যকজনিত কারণে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে দীপেন দেওয়ানের দিকে ভার বেশি মনে করছেন স্থানীয়রা। তবে টেকনোক্র্যাট কোটায় খাগড়াছড়ি থেকে বিএনপির জাতীয় পরিষদের সদ্য বহিষ্কৃত সদস্য সমীরণ দেওয়ানের সম্ভাবনা থাকলেও ভোঠের মাঠে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে দলীয় পদ হারানো সমীরণের সেই সম্ভাবনাও ফিকে হয়েছে।
এদিকে, দীপেন দেওয়ান ও সাচিং প্রু জেরির ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, বর্তমানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণ উপলক্ষে দীপেন দেওয়ান ও সাচিং প্রু জেরি দুজনই রাজধানীতে অবস্থান করছেন। পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের ভার নিতে দুজন ‘নিজস্ব রাজনৈতিক বলয়ে’ তদবির করছেন। তবে এখনো পর্যন্ত কাউকেই দলের ‘হাইকমান্ড’ থেকে গ্রিন সিগনাল (সবুজ সংকেত) দেওয়া হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের লেখক ও গবেষক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ‘খাগড়াছড়ি থেকে এবার পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা কম দেখি। সমীরণ দেওয়ান ভোট না করলেও টেকনোক্র্যাট হিসেবে হয়তোবা আলোচনায় থাকতেন কিন্তু এখন সেই সুযোগ নেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিশেষ কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর নেতা হিসেবে অভিহিত করে বিভাজন না করে জনগণের নেতা হিসেবে ভাবা উচিত এবং নেতাদের ক্ষেত্রেও একই নীতির অনুসরণ প্রয়োজন। যিনি জনপ্রতিনিধি তিনি সবারই নেতা। তাঁকে সবার সুখ–দুঃখ বিপদ–আপদে পাশে থাকতে হবে।’
মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচিত এমপিদের শুধু পার্বত্য মন্ত্রণায়ের দায়িত্ব দেওয়া হবে– এমন হওয়া উচিত নয়। পার্বত্য মন্ত্রণালয় ছাড়াও এখান থেকে নির্বাচিত নেতাদের যোগ্যতা অনুসারে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। পাহাড় থেকে জাতীয় নেতৃত্ব উঠবে।’












