৭২ বছরের পুরাতন জরাজীর্ণ যন্ত্রপাতিসহ নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও কাগজ উৎপাদন করে চলেছে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম)। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ইতোমধ্যে এই মিল থেকে ৯১৪ টন কাগজ উৎপাদন শেষে ইসিতে পাঠানো হয়েছে। প্রায় ১১ কোটি টাকার বেশি মূল্যের কাগজ বাংলাদেশ স্টেশনারি অফিসের (বিএসও) মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের আগে পাঠানো সম্ভব হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া এই মিলের হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে নতুন একটি কারখানা এবং ৬টি কেমিক্যাল প্লান্ট স্থাপনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। যা ২০২৫–২৬ অর্থ বছরে সবুজ পাতাভুক্ত আছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বছরে এক লাখ মেট্টিক টন কাগজ উৎপাদন সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবে। দেশের কাগজের চাহিদা পূরণ হবে এবং বিদেশ থেকে আর কাগজ আমদানি করতে হবে না বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা। গতকাল রোববার (১১ জানুয়ারি) সকালে কেপিএমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ গণমাধ্যমকে এসব বিষয় নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালট ছাপানো এবং অন্যান্য কাজ সম্পাদনের জন্য কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেড থেকে চলতি অর্থ বছরে ৯১৪ টন কাগজের চাহিদাপত্র দিয়েছিল বাংলাদেশ স্টেশনারি অফিস (বিএসও)। যার বর্তমান বাজার মূল্য ১১ কোটি ৮ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮১ টাকা। চাহিদা পত্রের বিপরীতে আগামী ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারিত সময় থাকলেও, তার আগেই ১১ জানুয়ারির মধ্যেই কেপিএম কর্তৃপক্ষ পর্যায়ক্রমে এই কাগজ সরবরাহ করেছে।
শহীদ উল্লাহ আরও বলেন, ২০২৫–২০২৬ অর্থ বছরে সাড়ে ৩ হাজার টন কাগজ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছিলাম। এরমধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালট পেপার ছাপানোর জন্য নির্বাচন কমিশন বিএসও এর মাধ্যমে কেপিএম মিল থেকে ব্রাউন, সবুজ ও গোলাপি কালার কাগজের চাহিদাপত্র দিয়েছে। আমরা তা সফলতার সাথে পূরণ করে সরবরাহ করেছি। নির্বাচন কমিশন ছাড়াও বিএসও এর মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১১টি প্রতিষ্ঠানে আরও ১২০০ টন কাগজ পর্যায়ক্রমে সরবরাহ করা হবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরাতন জরাজীর্ণ কারখানায় চলছে কাগজ উৎপাদনের বৃহৎ কার্যক্রম। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পরিত্যক্ত মেশিনারি। কারখানার দেয়াল থেকে শুরু করে প্রতিটি স্থাপনা অত্যন্ত নাজুক। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে গত অর্থ বছরে ৩০০০ টন কাগজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও মাত্র ১৬০০ টন কাগজ উৎপাদন করা গেছে। তবে চলতি অর্থ বছরে ৩৫০০ টন কাগজ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ১৯৩০ টন কাগজ উৎপাদন হয়ে গেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে ৭২ বছরের পুরাতন এই মিলকে চাঙা করতে নতুন মিল স্থাপন করা জরুরি। কারণ বাজারে এই মিলের কাগজের চাহিদা আছে, যা উৎপাদনের আগেই অর্ডার হয়ে যায় বলে জানান তারা। জানা যায়, কর্ণফুলী পেপার মিলে (কেপিএম) আগে বাঁশ কাঠ দিয়ে উৎপাদন করা হতো। ২০১৭ সাল থেকে এই প্ল্যান্টটি বন্ধ আছে। তাই পুরাতন এই কারখানাকে একটি ইন্টিগ্রেটেড পেপারমিল এবং ৬টি নতুন কেমিক্যাল প্লান্টের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করার জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে প্রস্তাবনা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ। এটি ২০২৫–২৬ অর্থ বছরে সবুজ পাতাভুক্ত আছে। এটি অনুমোদিত হলে অদূর ভবিষ্যতে এখানে পুরনো কারখানার জায়গায় নতুন একটা পেপারমিল এবং ৬টি কেমিক্যাল প্লান্ট হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের যারা এই কর্মকান্ডের সাথে সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত তারা উপকৃত হবেন। এতদ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবার চাঙা হবে এবং মানুষজন কর্মব্যস্ততার মধ্যে মগ্ন থাকবে। পেপার মিল তার হারানো ঐতিহ্য ফেরত পাবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
এই ব্যাপারে পেপারমিলের এমডি মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ বলেন, ‘নতুন কাগজকল স্থাপন হলে সেটার মাধ্যমে আমাদের পরিকল্পিত লক্ষ্যমাত্রা প্রতি বছর এক লক্ষ মেট্টিক টন। এটা উৎপাদন করা গেলে বিক্রি করতে কোনো অসুবিধা হবে বলে আমরা মনে করি না। কারণ আমাদের দেশে কাগজের বার্ষিক চাহিদা ১৩ থেকে ১৪ লাখ মেট্টিক টন। তারমধ্যে ন্যাশনাল টেঙটবুকের বার্ষিক ডিমান্ড হচ্ছে এক লক্ষ্য মেট্টিক টন। তাই উৎপাদন করলে বিক্রির করতে কোনো সমস্যা হবে না। এই কারখানাটি যেহেতু পুরনো হয়ে গেছে, তাই সমস্যা অনেক। এই সমস্যা দূর করতেই নতুন মিলের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। এতে দেশের কাগজের চাহিদা পূরণ হবে এবং বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে না। সেই হিসেবে এই কারখানার অনেক সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাচ্ছি।’ গণমাধ্যমের সাথে মতবিনিময়কালে কেপিএমের জিএম (কমার্শিয়াল) আবদুল্লা আল মামুন, কেপিএম উৎপাদন বিভাগের প্রধান মঈদুল ইসলাম, জিএম (এডমিন) আবদুল্লাহ আল মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন।












