চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) বর্তমান পর্ষদের (ষষ্ঠ) মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী রোববার। বর্তমান পর্ষদে আছেন কেবল মেয়র। অর্থাৎ আজ বৃহস্পতিবারসহ আর মাত্র চারদিন দায়িত্ব পালন করতে পারবেন এ পর্ষদের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এদিকে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯–এর ৩৪ নং ধারা (২০১১ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববতী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। যা এ মুহূর্তে অসম্ভব। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বর্তমান পর্ষদের মেয়াদ শেষে কিভাবে চলবে চসিক?
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার আইন পর্যালোচনা করে জানা গেছে, বর্তমান পর্ষদের মেয়াদ শেষ হলেও চসিক পরিচালনায় দুটো পথ খোলা আছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে– স্থানীয় সরকার আইন ২০০৯–এর ৩৪ নং ধারা (২০১১ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী চসিকে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া। এছাড়া একই আইনের ৬নং ধারা অনুযায়ী নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত নতুন পর্ষদের (৭ম) প্রথম সভা না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান মেয়রের দায়িত্ব পালন করার সুযোগ রয়েছে। তবে সরকার কোন পথে হাঁটছে তা গতকাল বুধবার পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করেনি।
তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজাদীকে জানিয়েছেন, চসিকের পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সময়ের জন্য ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র পদে বহাল রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এখন সরকারের উচ্চ মহল থেকে নির্দেশনা আসলে প্রজ্ঞাপন বা অফিস আদেশ জারি করা হবে।
এ বিষয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব দুইজনের সঙ্গেই আমার কথা হয়েছে। আমি নির্বাচন দেয়ার জন্য বলেছি। মন্ত্রীও বলেছেন, দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা হবে। মেয়র বলেন, নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আমার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার আইনের ৬ নম্বর ধারা প্রযোজ্য হবে। যেহেতু নির্বাচিত মেয়র তাই প্রশাসক দেয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে অফিসিয়াল অর্ডার দেয়া হবে। এটা নিয়েও কথা হয়েছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য পৃথক দুটি চিঠি দেয়া হয়েছে নিবাচন কমিশনে। এছাড়া গতকাল বুধবার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সিটি কর্পোরেশনসহ স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্বাচন আয়োজন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, যত দ্রুত সম্ভব আমরা নির্বাচনের ব্যবস্থা করবো। যত দ্রুত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব’।
আইনে কী আছে : স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯–এর ৬ নম্বর ধারা (সংশোধন ২০১১) বলা আছে, ‘কর্পোরেশনের মেয়াদ হবে কর্পোরেশন গঠিত হওয়ার পর অনুষ্ঠিত প্রথম সভার তারিখ থেকে পাঁচ বছর। তবে শর্ত থাকে যে, সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও, তা পুনর্গঠিত সিটি কর্পোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে যাবে’। জানা গেছে, চসিকের বর্তমান পর্ষদের প্রথম সভা হয়েছে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। ওই হিসেবে এ পর্ষদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি। আজ বৃহস্পতিবার ১৯ ফেব্রুয়ারি। ওই হিসেবে আজকেসহ বর্তমান পর্ষদের মেয়াদ আছে চারদিন।
এদিকে স্থানীয় সরকার আইন ২০০৯–এর ৩৪ নং ধারায় (২০১১ সালে সংশোধিত) বলা আছে, ‘কোনো নূতন সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করা হলে অথবা কোনো সিটি কর্পোরেশন বিভক্ত করা হলে অথবা কোনো সিটি কর্পোরেশন মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সরকার, সিটি কর্পোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত ওই কর্পোরেশনের কার্যাবলী সম্পাদনের উদ্দেশ্যে, একজন উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ প্রদান করিতে পারবে’। এই ধারা অনুযায়ী, চসিকের পঞ্চম পর্ষদের মেয়াদ শেষে ২০২০ সালের আগস্ট মাসে খোরশেদ আলম সুজনকে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। যদিও আইন অনুযায়ী তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছিরকে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বহাল রাখার সুযোগ ছিল।
এদিকে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯ এর ৩৪ নং ধারার ‘খ’ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববতী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। ওই হিসেবে ২০২৫ সালের ২২ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে চসিকের নির্বাচন আয়োজন করার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার।
প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ নেই : বর্তমান প্রেক্ষাপটে চসিকে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ নেই বলে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবীর আইনগত মতামতও তুলে ধরেন। যেখানে ডা. শাহাদাত হোসেন–এর মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়।
জানা গেছে, ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় চসিকের ষষ্ঠ পরিষদের নির্বাচন। এ নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৬ জন। নির্বাচনে ভোট পড়ে মাত্র ২২ দশমিক ৫২ শতাংশ। নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ডা. শাহাদাত। তিনি ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট পান। তবে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরীকে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৪৮ ভোট দোখিয়ে নির্বাচিত ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। একই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বগ্রহণ করেন রেজাউল করিম।
পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ডা. শাহাদাত ৯ জনকে বিবাদী করে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করেন। এজাহারে তিনি নির্বাচন পরবর্তী ফলাফল সংক্রান্ত প্রকাশিত গেজেট (রেজাউল করিমকে মেয়র ঘোষণা করে) বেআইনি, অবৈধ ও ন্যায় নীতির পরিপন্থী বলে দাবি করেন। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রামের প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক খাইরুল আমিন ডা. শাহাদাতকে মেয়র ঘোষণা করে এ মামলার রায় দেন। রেজাউল করিম চৌধুরীর মেয়র নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করেন। পাশাপাশি ১০ দিনের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবকে নির্দেশ দেন। এরপর ৮ অক্টোবর ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন। ৩ নভেম্বর শপথ গ্রহণ শেষে ৫ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বগ্রহণ করেন শাহাদাত। এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামসহ দেশের ১২ সিটি কর্পোরশনের মেয়রদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। পরবতীতে প্রজ্ঞাপন সংশোধন করে ১৭ অক্টোবর চসিক থেকে প্রশাসক বাদ দেয়া হয়। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে দেয়া ডা. শাহাদাত–এর আইনগত মতামতে বলা হয়, মামলা চলমান অবস্থায় স্থানীয় সরকার আইনে সংশোধনী এনে মেয়রের পদ শূন্য ঘোষণাপূর্বক চসিকে প্রশাসক নিয়োগ করেন। পরবর্তীতে রায়ের আলোকে ডা. শাহাদাতকে শপথ পাঠের মাধ্যমে মেয়র পদের প্রতিস্থাপন করেন। তিনি ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম সভা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম শুরু করেন। এই অবস্থায় বর্তমান মেয়রের কার্যকাল কখন শেষ হবে’?
এতে আরো বলা হয়, বিশেষ পরিস্থিতিতে একজন প্রশাসক নিয়োগ করা হলেও ট্রাইব্যুনালের আদেশে, পূর্বের মেয়রের নির্বাচন এবং প্রশাসক নিয়োগের সার্বিক কার্যক্রম পরিত্যক্ত হয়ে বর্তমান মেয়রের কার্যক্রম শুরু হয়। পূর্বের মেয়র এবং প্রশাসকের কার্যক্রম ‘ফাস্ট অ্যান্ড ক্লোজ ট্রানজেকশন’ হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে পরবর্তী মেয়র দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বর্তমান মেয়র যদি না আদালত কর্তৃক অযোগ্য বিবেচিত হন, ততোদিন স্থানীয় সরকার আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী মেয়রের দায়িত্ব পালন করবেন। প্রশাসক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নির্বাচন ট্রাইব্যুনালের রায় ও আদেশ দ্বারা সংরক্ষিত না হওয়ায় এবং উক্ত রায় বহাল থাকা অবস্থায় পুনরায় প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য, চসিকে বর্তমানে কোনো কাউন্সিলর নেই। ষষ্ঠ পর্ষদের নির্বাচিত কাউন্সিলরদের ২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অপসারণ করা হয়। পরবর্তীতে ২৯ সেপ্টেম্বর চসিকের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ২১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।












