কিশোর অপরাধীদের তৎপরতা রোধে ব্যবস্থা নিতে হবে

| বুধবার , ১১ মার্চ, ২০২৬ at ৮:৪৮ পূর্বাহ্ণ

সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান এলাকার মানুষের জীবনকে সহজ করা এবং চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলাই নিজের প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন। গত ৭ মার্চ দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায়, তিনি এ বিষয়ে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন, এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য যেন না থাকে, সেজন্য সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। আমাদের সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে, তাহলে সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। তিনি গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরের দক্ষিণ কাট্টলী জেলে পল্লীতে ঝাটকা আহরণ থেকে বিরত থাকা ৬০০ জন জেলে পরিবারের মাঝে চাল বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। এলাকার উন্নয়ন এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাঈদ আল নোমান বলেন, আমি চাই আপনাদের জীবনটা যেন আরেকটু সহজ হয়। আপনাদের সন্তানরা যেন নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে। এ সময় তিনি এলাকার রাস্তাঘাট উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তিনি।

আসলে সমাজের বড় বড় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে আমাদের শিশুকিশোররা। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যানিটিজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা উল্লেখযোগ্যহারে বাড়ছে। ছয় বছরে এই হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৬ শতাংশ। ২০২০ সালে অপরাধে জড়িত শিশুদের ৬১ শতাংশই ছিল ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সের মধ্যে। যা ২০১৪ সালে ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৩ সালে জার্নাল অব এমার্জিং টেকনোলজিস অ্যান্ড ইনোভেশন রিসার্চে প্রকাশিত ‘স্টাডি অব চিলড্রেন ক্রাইমস এট আরবান এরিয়াজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা মতে, বর্তমান সময়কালে অপরাধে শিশুদের সম্পৃক্ততা বেশ উদ্বেগজনক। তাদের মুষ্ঠিমেয়দের কর্মকান্ডে সমাজ আক্রান্ত হচ্ছে, যা অদূর ভবিষ্যতের জন্য ভয়ংকর। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শিশুদের ৭৫ শতাংশই অপরাধের সঙ্গে জড়িত। মাদকাসক্তি, মাদক ব্যবসা, চুরি, ডাকাতি, আগ্নেয়াস্ত্র বহন, ধর্ষণ, হত্যাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে এসব শিশু। অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হলো দারিদ্র্য ও শিক্ষার অভাব। অধিকাংশ শিশু ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সে অপরাধে যুক্ত হয়। ২০২১ সালে এশিয়ান জার্নাল অব সোশিয়লজিক্যাল রিসার্চে প্রকাশিত ‘প্রসেস অব ক্রিমিনালাইজিং স্ট্রিট চিল্ড্রেন ইন বাংলাদেশ : এন এমপায়রিকাল স্টাডি ইন দ্য সিটি অব ঢাকা’ গবেষণা পত্র অনুযায়ী, অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের ৯০ দশমিক ৫ শতাংশই মাদক ব্যবসা এবং ৩০ দশমিক ১ শতাংশ হত্যার সঙ্গে জড়িত। তাছাড়া ছিনতাইয়ে ৬৬ শতাংশ ও চুরির সঙ্গে জড়িত শতভাগ গ্যাংয়ের সদস্য। নামে কিশোর গ্যাং হলেও তারা ছিনতাইচাঁদাবাজিমাদক ব্যবসাজমি দখলে সহায়তাইন্টারনেট সংযোগকেবল টিভি ও ময়লা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণউত্ত্যক্ত করাযৌন হয়রানিহামলামারধরসহ নানা অপরাধে জড়িত। বাহিনীগুলো শুধু অপরাধই করে না, অধিপত্য বজায় রাখতে পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ে।

অপরাধবিজ্ঞানীরা বলেন, মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা ও আইনের দুর্বল শাসন কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির কারণ। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়প্রশ্রয়ে গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির তুলনায় কিশোরদের আইন ভাঙার শাস্তি কম হওয়ায় একদল অসাধু ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের আশ্রয়ে গড়ে তুলছে কিশোর গ্যাং এবং তাদের দিয়ে সংঘটিত করাচ্ছে মাদক ব্যবসা, খুন, এমনকি মানব পাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধ। সাধারণ মানুষের কাছে এখন আতঙ্কের নাম কিশোর অপরাধ। শহরে বা গ্রামে কিশোররা শিক্ষক কিংবা বয়স্ক কাউকেই তোয়াক্কা করে না। তামাক দ্রব্যের সহজপ্রাপ্যতা কিশোরদের অপরাধ জগতে শুরুটা করে দিচ্ছে। স্থানীয় রাজনীতি, পদ পদবির জন্য কিশোররা রাজনৈতিক নেতাদের অনুসারী হয়ে থাকে। এলাকাভিত্তিক দ্বন্দ্বে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। যেখানে কিশোররাই হবে মানবতার অগ্রদূত, আমাদের দুঃখ, সেখানে তারা হয়ে উঠছে যমদূত। এদের নির্মূলে খুব দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে মানুষের মনে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, হত্যা, ধর্ষণ ভীতি বাড়তেই থাকবে।

আমরা জানি, পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কিশোর অপরাধ দমনে তৎপর রয়েছেন। রয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারি। তবে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না বললেই চলে। কিশোর অপরাধীদের তৎপরতা রোধে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে