মানুষ যখন একটু শান্তিতে ও স্বস্তিতে ছিল, সেই সময়ে কিছু লোক লাশের ওপর দিয়ে ক্ষমতা দখলের কথা ভাবছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যা খুবই অমানবিক। এমন ধ্বংসাত্মক কাজ যারা করছে তাদের বোধোদয় হবে বলে আশা করছেন তিনি। নাশকতা বাদ দিয়ে তাদের গণতান্ত্রিক ধারায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখুক।
শেখ হাসিনা বলেন, যারা জনগণকে হত্যা করে লাশের ওপরে পাড়া দিয়ে ক্ষমতায় যাবার চিন্তা করে তাদের মতো অমানবিকতা আমি আর কোথাও দেখি না। এটা আমাদের কাছে ভাবতেও অবাক লাগে। কাজেই আমরা শান্তি চাই। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে সশস্ত্র বাহিনী দিবস ২০২৩ উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন। দেশের মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার মতো সন্ত্রাস–নৈরাজ্য চালিয়ে কোনো কিছু অর্জন করা যায় না মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসের পথ ছেড়ে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত হতে অগ্নিসন্ত্রাসীদের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, দেশের মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে কিছুই অর্জন করা যায় না। এটা অন্যায়। কোনো কিছু অর্জন করতে হলে জনগণের শক্তির প্রয়োজন। আমি চাই তাদের (অগ্নিসন্ত্রাসী) চেতনা জাগ্রত হোক। সে জন্য অগ্নিসন্ত্রাসের পথ পরিহার করে জনগণের কল্যাণে কাজ করার এবং তাদের পাশে থাকা প্রয়োজন। খবর বিডিনিউজের।
সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির গত ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর থেকে যে হরতাল–অবরোধের কর্মসূচি চলছে, তাতে চোরাগোপ্তা হামলা চলছে শুরু থেকে। হরতাল বা অবরোধ দুই ধরনের কর্মসূচিতে প্রায় প্রতিদিনই যানবাহনে আগুন দেওয়া হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের নানা জায়গায়। এই পরিস্থিতির সঙ্গে একাত্তরের যুদ্ধ পরিস্থিতির সাদৃশ্য খুঁজে পাচ্ছেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, অগ্নিসন্ত্রাস, জ্বালাও–পোড়াও মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে। আমি জানি না, একজন মানুষ কীভাবে আরেকটা জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারে। এমনটি দেখেছিলাম ৭১ সালে। তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বস্তিতে আগুন দিত। আর মানুষ বেরিয়ে এলে সঙ্গে সঙ্গে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারত। দুঃখের বিষয়, এরপর ২০১৩–১৪ সালে এবং এখন ইদানীং সেই অগ্নিসন্ত্রাস শুরু করেছে। পোড়া মানুষগুলোর ক্ষতবিক্ষত দেহ এবং তাদের আত্মচিৎকার ও পরিবারগুলো কী অবস্থায় আছে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ এ দেশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল। সেই ভাষণও নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু আজ সেই ভাষণ আন্তর্জাতিক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্থান পেয়েছে।
জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী ‘জয় বাংলা’ স্লোগানও হারিয়ে গিয়েছিল, সে কথাও বলেন বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, পঁচাত্তরের পর হারাতে বসা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার আবার ফিরিয়ে আনতে পেরেছে।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় দেশের আনাচে কানাচে থাকা গণকবর সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলায় সরকারি উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেঙ তৈরি করা হয়েছে বলে জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেঙগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতি ধরে রাখার জন্য জাদুঘর তৈরি করা হবে।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে দেশের স্বাধীনতা সংগামের ইতিহাস চর্চার তাগিদ দেন সরকারপ্রধান। প্রধানমন্ত্রী এ অনুষ্ঠানে ২০২২–২৩ সালে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ শান্তিকালীন পদকপ্রাপ্ত সদস্যদের হাতে পদক তুলে দেন। এর আগে সকালে ঢাকা সেনানিবাসে শিখা অনির্বাণে ফুল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী শিখা অনির্বাণে পৌঁছলে সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম. নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আবদুল হান্নান এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার–উজ–জামান তাকে স্বাগত জানান।
ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে যান। সেখানে তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তিন বাহিনীর প্রধান তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।











