স্বপ্নের সাথে সংকল্প যখন এক হয়ে যায় সাফল্য তখন থাকে হাতের মুঠোয়। এমন আত্মপ্রত্যয়ী স্বপ্ন আর সংকল্প পাল্টে দিয়েছে কৃষক হাসান আলীর জীবন। ঢাকার লালবাগ মেট্রোপলিটন কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে হাসান আলী বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের লাইব্রেরিয়ান হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বন্দরের ইংল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি কৃষিকাজে মনোনিবেশ শুরু করেন। আগ্রহ থেকে অতি কম সময়ে স্ত্রী শামীর আরার পরামর্শ ও সহযোগিতায় আত্মনির্ভরশীল সফল কৃষক হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন হাসান। ২০১৮ সাল থেকে সব পেশা ছেড়ে কৃষিতে নিজেকে উজাড় করে দেন হাসান আলী।
বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কৃষি বিভাগের তথ্য প্রযুক্তি ভান্ডার যাচাই–বাছাই করে গত বছর থেকে হাসান আলি তার এক পরিচিত বন্ধুর মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া থেকে ব্ল্যাক সীড (কালো ধানের) বীজ আমদানী করে এক কানি জমিতে চাষ করে প্রথম চেষ্টায় এক হাজার কেজি ধান উৎপাদন করেন। আর চলতি আউষ মৌসুমে ১ কানি জমিতে এ ধানের বীজ রোপন করেছেন। এ মৌসুমে এক একর জমি চাষের পরিকল্পনা হাসান আলীর। তার স্বপ্ন এবার পুরো আনোয়ারায় কালো ধানের চাষ ছড়িয়ে দিবেন এবং বাণিজ্যিকভাবে বিদেশে রপ্তানি করবেন এই চাল। ইতিমধ্যে তিনি থাইল্যান্ড ও চীনে এ চাল রপ্তানি করার চেষ্টা করছেন বলেও জানান।
হাসান আলী বলেন, ইউটিউবের মাধ্যমে কালো ধানের চাষে আমার আগ্রহ জন্মে। যার কারণে ইন্দোনেশিয়ায় উৎপাদিত এ ধানের বীজ সংগ্রহ করি। বর্তমানে দেশে প্রতি কেজি ধানের মূল্য ৩০০ টাকা আর চালের মূল্য ৪০০ টাকা কিন্তু চীন আর থাইল্যান্ডে এই চালের বাজার মূল্য এক হাজার থেকে ৮০০ টাকা। কালো ধানের চাষ করে প্রথমবার আমি আর্থিকভাবে অনেক লাভবান হয়েছি। আগামীতে আমি বাণিজ্যিকভাবে এই ধানের উৎপাদন বাড়াতে চাই। হাসান আলী আনোয়ারা উপজেলার বারশত ইউনিয়নে গুন্দীপ গ্রামের মৃত আযুব আলীর পুত্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কালো চালে সাধারণ চালের চাইতে তিনগুণ পুষ্টি ও ওষুধি গুণ রয়েছে। এ চালের ভাত শরীরে গ্লুকোজ তৈরি করে খুব ধীর গতিতে। ফলে মানবদেহে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। যার কারণে এ চালকে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুব কার্যকর বলা হয়। এছাড়া আমিষ, ভিটামিন, জিংক, খনিজ পদার্থসহ অন্য উপাদানগুলো সাধারণ চালের চেয়ে অন্তত তিনগুণ বেশি থাকে। শুধু তাই নয় এ চালে অ্যান্থসায়ানিন বেশি থাকার কারনে এ চাল ক্যান্সার প্রতিরোধী অ্যান্টি–অঙিডেন্ট নামেও পরিচিতি লাভ করেছে। যার কারনে মানব দেহের পুষ্টি ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে ঔষধি ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এ চাল অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই সাথে এ চাল হৃদযন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখা, মস্তিস্কের কার্যকারিতা বাড়ানো ও শারীরিক ব্যথা নিরাময়েও অ্যান্টি–অঙিডেন্ট বিশেষ কার্যকর ভূমিকা রাখে। বর্তমানে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভারত, জাপান, চীন ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে এ ধানের চাহিদার কারনে ব্যাপক উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
আনোয়ারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রমজান আলী জানান, সরকারিভাবে আমাদের এই ধানের বিজ এখনও সরবরাহ করা হয়নি। তবে হাসান আলী নামে এক কৃষক এই ধানের চাষ শুরু করেছেন। তাকে আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) আরআরআই ফেনী সোনাগাজীর সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আদিল জানান, কালো চালে বাংলাদেশ অ্যান্টি–অঙিডেন্ট থাকার কারনে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের উপাদান রয়েছে। এ চাল সাধারণ চালের চেয়ে ব্যতিক্রম। এ চালে মানব দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ নানান পুষ্টিগুণ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের গবেষণাগারে এ ধরনের দুটি কালো ধানের বীজের গবেষণার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে আমরা পুরোপুরি সফল হলে এ ধান কৃষকের হাত ধরে উৎপাদনে যাবে ইনশাল্লাহ।












