কালের সাক্ষী চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতাল

জিয়া হাবীব আহসান | সোমবার , ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ at ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ

আমার শৈশব কৌশরের সূন্দর সময়গুলো আন্দরকিল্লা এলাকায় কেটেছে। ঐতিহ্যবাহী এমইএস হাইস্কুলে লেখাপড়া, স্কাউটিং, নবীন মেলায়, জেএমসেন হল মাঠে খেলাধুলা, জামাল খানের খ্রিস্টান পাড়া, জেনারেল হাসপাতালের পাহাড় শীর্ষে বৈকালিন ভ্রমণ, রাজাপুকুর লেইন রাজার বাড়ি, কদম মোবারক, টিএন্ডটি পাহাড়, ডিসির পাহাড়, আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ, টেরী বাজার, বদরপাতি, হাজারী লেনসহ আশে পাশের এলাকায় ঘুরাঘুরি আর বেড়ে উঠার নানা স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো আজো মনে পড়ে বার বার। আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালের পাহাড় শীর্ষে জেনারেল হাসপাতালের মাঠে বাল্য বন্ধু শরীফ, তপন, সুনীল, রফিক, কাজী শোয়েব প্রমূখ সহ ঘাটফরহাদ বেগের বন্ধুদের খেলা দেখতে যেতাম। একটা স্মৃতি মনে পড়ে ১৯৮১ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিয়াউর রহমান সাহেবকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে গুলি করে বিপথগামী সৈনিকরা হত্যা করলে তাঁর দেহরক্ষীদের অনেকের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ জেনারেল হাসপাতালের পাহাড়ে গাড়িসহ ফেলে রাখা হয়েছিল। আমি ও বন্ধু শরীফ, শোয়েব সহ কয়েকজন লাশগুলো জেনারেল হাসপাতালে উৎসুক জনতার সাথে কৌতুহলবশত দেখতে গিয়েছিলাম। তখন লাশের মর্গ ছিল জেনারেল হাসপাতালে। বর্তমানে তা চ.মে.ক হাসপাতালে (প্রবর্তক মোড়) স্থানান্তর করা হয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ১৯১৫ সালে পুলিশ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়, ১৯২৫ সালে রেলওয়ে বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রাম বন্দর হাসপাতাল স্থাপিত, ১৯৬৩ সালে লায়ন্স দাতব্য চক্ষু হাসপাতাল স্থাপিত, ১৯৬৫সালে ফৌজদারহাট যক্ষ্মা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ৬ই আগস্ট ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের উদ্বোধন করেন। ডা. আলতাফ উদ্দীন আহমেদ এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালই চট্টগ্রাম মেডিকেল হিসেবে সেবা প্রদান করতো। ১৯৬০ সালে এটি বর্তমান চ.মে.ক ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। বৃহত্তর চট্টগ্রামের আপামর জনসাধারণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ১৯০১ সালে আন্দরকিল্লায় প্রতিষ্ঠিত জেনারেল হাসপাতাল এখনো স্বাস্থ্য সেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল চট্টগ্রামের একমাত্র প্রথম পাবলিক হাসপাতাল হয়। শতবর্ষেরও প্রাচীন কোর্ট হিল আদালত ভবন, সিআরবি রেলওয়ে ভবন, আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতাল ভবন ভেঙে ফেলার কথা উঠলে ঐতিহ্যের স্মারক এসব ভবন সংস্কার ও রক্ষা করতে বহু আন্দোলন সংগ্রাম ও লেখালেখি করেছি। ইতিহাসের পাতায় আরো জানা যায় ১৯২৭ সালে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল প্রাঙ্গণে চট্টগ্রাম মেডিকেল স্কুলের কার্যক্রম শুরু হয়। এটি চার বছর মেয়াদী এলএমএফ সনদ প্রদান করতো। জেনারেল হাসপাতালও সংস্কার করে একে আধুনিক করা হয়। চমেক হাসপাতালেরও বহু আগে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি চট্টগ্রাম সহ আশেপাশের জন্যে একটা নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করতো। সম্প্রতি করোনাকালে এর ভূমিকা অতুলনীয়। ১৮৪০ সালে এটি একটি ডিসপেনসারি হিসাবে কার্যক্রম শুরু করে এবং পরে ১৯০১ সালে তা উন্নয়ন করে চট্টগ্রাম মহানগরের আন্দরকিল্লা মৌজার রঙমহল পাহাড়ের শীর্ষে এটিকে একটি হাসপাতাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ১৯৫৯ সাল থেকে এটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ অনুমোদিত একটি হাসপাতাল। এই হাসপাতালের রঙমহল পাহাড়ে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের কার্যালয় অবস্থিত। রঙমহল পাহাড়টি ঐতিহাসিকভাবে আরাকানী দুর্গের অংশ হিসাবে খ্যাতিযুক্ত ছিল, যা ১৬৬৬ সালে মোঘল নৌবাহিনীর আক্রমণে পুড়ে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। ১৯০৪ সালের জুলাই মাসের ২০ তারিখ একটি ধ্যানী বুদ্ধ ভাস্কর্য শিমুল গাছের নিচে পাওয়া যায় যা বর্তমানে চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারে সংরক্ষিত আছে। শুরুতে সদর হাসপাতাল নামে পরিচিত এ হাসপাতালটি ১৯৮৬ সালে নতুন ভবন নির্মাণের মাধ্যমে ৮০ শয্যার কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে এটিকে দেড়শ শয্যায় উন্নীত করার জন্য নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। জেনারেল হাসপাতালের ১০ একর জায়গা আছে। ১৯৯৪ সালে শুরু হওয়া নতুন ভবন তৈরির কাজ শেষ হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। ১৯৯৪ সালের ৫০ শয্যা বিশিষ্ট রেলওয়ে হাসপাতাল চালু হয়, ২০০৩ সালে দেড়শ শয্যায় উন্নীত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সেই পুরনো জনবল কাঠামোতেই সর্বশেষ ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালটিতে আড়াইশ শয্যার সেবা শুরু হয়। নানামুখী সংকটে জোড়াতালি দিয়ে চলা চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবায় দেখা দিয়েছে বেহাল অবস্থা।

সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য জেনারেল হাসপাতালকে দেড়শ থেকে আড়াইশ শয্যায় উন্নিত করেছে সরকার। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি করা হয়নি। কর্মকর্তা ও কর্মচারী সংকট। প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধি না হওয়ায় হাসপাতাল যেন নিজেই রোগী। ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে আরো একটি অপারেশন থিয়েটার প্রয়োজন, হাসপাতালটিতে নবজাতক শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত ইনকিউবেটরের ব্যবস্থা নেই, পয়ঃনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা মানসম্মত নয়।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপের মোকাবেলায় এসব প্রাচীন ঐতিহ্য মণ্ডিত হাসপাতালগুলোকে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ছোঁয়া দেয়া দরকার। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশাল জনগোষ্ঠীর সর্বস্ব বিক্রি করে বিদেশ পাড়ি জমানোর কাহিনি আমাদের জন্যে কোনোক্রমেই সুখকর নয়। জেনারেল হাসপাতালের মতো প্রাচীন ঐতিহ্য মণ্ডিত হাসপাতালগুলোকে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারলে আমাদের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অর্থনীতি হবে সূদৃঢ়। আমাদের স্বাস্থ্যনীতির সকল দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এ বিষয়ে একটি যুগোপযোগী বাস্তবমুখী মাস্টার প্ল্যান ঠিক করতে হবে। আসুন ইতিহাসের সাক্ষী শতাব্দীর প্রাচীন চট্টগ্রামের প্রথম পাবলিক হাসপাতাল এ প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করি ও জনস্বার্থে একে একটি এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতালে পরিনত করি। আল্লাহ পাক রহমান রহিম আমাদের সহায় হোন, আমিন।

লেখক: আইনবিদ, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসন কর্মী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধভোরের পাখি
পরবর্তী নিবন্ধবিবেকানন্দের শিকাগো বক্তৃতা ও বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ