চিৎকার করে কাঁদছিলেন মা। কখনো ফেটে পড়ছিলেন ক্ষোভে, কখনো অসহায় হয়ে আকুতি জানাচ্ছিলেন। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে প্রাইভেট কার দুর্ঘটনায় লাশ হওয়া হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সামিয়া জাহান তানিশার মা নাসিমা সুলতানা। তিনি বলেন, ‘মেয়েটা আমার কলিজার টুকরা ছিল। ছিল আমার মুখের হাসি। কিন্তু এখন সব শেষ।’ আমার মেয়েটা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো, তাহাজ্জুদের নামাজও পড়তো। আগের রাতেও সে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েছে। আমার মেয়েটা সেজদায় গেলে অনেকক্ষণ থাকতো।’
পুলিশের কাছে ঘটনার বিচার চেয়ে তিনি বলেন, আপনাদেরও মেয়ে আছে, মা আছে, বোন আছে। ঘটনার সময় গাড়ির চালক সাইদুল আলমকে দেখিয়ে তিনি পুলিশকে বলেন, একে ছেড়ে দিলে আল্লাহ শেষ বিচারের দিন আপনাদের ছাড়বে না। কথাগুলো বলতে বলতেই বারবার ভেঙে পড়ছিলেন নাসিমা সুলতানা। চোখের পানি মুছতে মুছতে কখনো থেমে যাচ্ছেন, আবার কাঁপা কণ্ঠে বলার চেষ্টা করছেন। মেয়ে সামিয়া জাহান আর নেই, এই নির্মম সত্য তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না।
পুলিশ বলেছে, ঘটনার ব্যাপারে বন্দর থানায় একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। সামিয়ার বন্ধু এবং গাড়ির চালক সাইদুল আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরদিকে ময়নাতদন্তের পর সামিয়ার লাশ পরিবারকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। গতরাতে জানাজা শেষে সামিয়ার লাশ রাহাত্তারপুলে দাফন করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বারিক বিল্ডিং মোড় এলাকায় ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান সামিয়া। একটি প্রাইভেট কারে করে পতেঙ্গা থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনাটি ঘটে। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন সাইদুল আলম (২৩) নামে এক তরুণ। পুলিশের দাবি, গাড়িটি বেপরোয়া গতিতে ছিল এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক বিভাজক ও রেলিংয়ে ধাক্কা খায়। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত পান সামিয়া, পরে তার মৃত্যু হয়। তবে পরিবারের কাছে এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের সন্দেহ, ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা নয়। মেয়েকে যে তরুণ নিয়ে গিয়েছিলেন তাকে ভালোভাবে চিনতেন না বলে জানান সামিয়ার মা। কলেজে ভর্তি করানোর সময় একবার দেখেছিলেন, এরপর আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। তার ভাষায়, ‘কারও কিছু হলো না, কিন্তু আমার মেয়েটা মারা গেল’–এটা কীভাবে সম্ভব?
মেয়ের সাম্প্রতিক দিনগুলোর স্মৃতি যেন আরও বেশি করে ভেঙে দিচ্ছে পরিবারটিকে। বড় ছেলে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছে, আগামী ৩০ এপ্রিল তার বিয়ে। ঘরজুড়ে ছিল আনন্দের প্রস্তুতি। গত তিন চারদিন ধরে সামিয়া নিজেও ভাইয়ের গায়ে হলুদে কিভাবে নাচবে তার প্র্যাকটিস করছিল। পরিবারের আনন্দের কেন্দ্রই ছিল সামিয়া। দাওয়াত কার্ডে নিজের হাতে নাম লিখেছে–সবকিছুতেই ছিল তার উচ্ছ্বাস। সেই প্রাণচঞ্চল মেয়েটি হঠাৎই নিথর হয়ে গেছে, বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা। গতকাল পরিবারের সদস্যরা দৈনিক আজাদীকে বলেন, পড়াশোনায় মনোযোগী ও মেধাবী ছিল সামিয়া। তাকে ঘিরে ছিল অনেক স্বপ্ন, যা এক মুহূর্তে ভেঙে গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে দুজনই ছিলেন। সংঘর্ষের পর স্থানীয় লোকজন সামিয়াকে গাড়ি থেকে বের করে সড়কের ওপর শুইয়ে দেন এবং পরে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। চালক সাইদুল আলমের বক্তব্য নিয়ে পুলিশের কিছুটা সন্দেহ হচ্ছে। বিশেষ করে কাতার প্রবাসী এই যুবক কখনো বলছেন, দুই মাস আগে দেশে এসেছেন, আবার কখনো বলছেন তিন মাস আগে। মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রহিম দৈনিক আজাদীকে জানান।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সাইদুল আলম জানিয়েছেন, একটি দ্রুতগতির গাড়ি তাকে অতিক্রম করার সময় তিনি ভয় পেয়ে যান এবং গাড়ির নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি। তবে পরিবার এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। তাদের দাবি, পুরো ঘটনার সঠিক তদন্ত হোক এবং প্রকৃত সত্য সামনে আসুক।














