কাপুরুষোচিত হামলায় ইরানিরা মাথা নত করবে না : আরাগচি

তেহরানে আল-কুদস দিবসের সমাবেশের কাছে বিস্ফোরণ ইসরায়েলে ইরান হেজবুল্লার যৌথ হামলা

আজাদী ডেস্ক | শনিবার , ১৪ মার্চ, ২০২৬ at ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়ে আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার জবাবে ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সংঘাত এখন শুধু ইরানইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং লেবানন, ইরাক, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। এই সংঘাত ইতোমধ্যে আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।

ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানও ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কয়েক হাজার সামরিক স্থাপনায় হামলা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি ঘোষণা দিয়েছেন, শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া হবে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তবে তিনি এখনও প্রকাশ্যে আসেননি। তিনি হামলায় আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন হামলায় জখম হলেও বেঁচে আছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনি। বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভিতে মুজতাবার প্রথম বিবৃতি সমপ্রচার হওয়ার পরই এই দাবি করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, আমার মনে হয় সম্ভবত তিনি (মুজতবা) বেঁচে আছেন। আমার ধারণা, তিনি ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু তিনি হয়ত কোনও না কোনওভাবে বেঁচে আছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, মুজতাবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সামান্য আহত হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফঙ নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের সাথে যুদ্ধ কখন শেষ হতে পারে?-এই প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, যখন আমি এটি অনুভব করব, ঠিক আছে, তখন।

এদিকে তেহরানে আলকুদস দিবসের সরকারসমর্থিত সমাবেশের কাছাকাছি এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, যা উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও ওই ঘটনায় বড় ধরনের হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তেহরানে আলকুদস দিবসের র‌্যালিতে অংশ নেওয়া ইরানিদের একটি ভিডিও ফুটেজ শেয়ার করেছেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে আশেপাশে বোমা বর্ষণ হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। কর্মসূচিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তারাও অংশ নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এঙে আরাগচি লিখেছেন, আন্তর্জাতিক কুদস দিবস পালন করতে ইরানের শক্তিশালী ও অটল জনগণের সঙ্গে থাকতে পেরে আমি গর্বিত ও সম্মানিত। ইরানিরা সর্বদাই অটল থাকবে এবং কাপুরুষোচিত হামলার সামনে কখনোই মাথা নত করবে না।

রোজার মাসের শেষ শুক্রবার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিশ্বজুড়ে পালন করা হয় কুদস দিবস। জেরুজালেমের আরবি নামে (আলকুদস) আন্তর্জাতিক এ প্রতিবাদ দিবস পালন করা হয়ে থাকে।

যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ইরানপন্থী আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয় হয়ে ওঠা। লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়ারা ইসরায়েল ও মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে হামলা বাড়িয়েছে। লেবানন সীমান্তে রকেট হামলা ও পাল্টা বিমান হামলার কারণে সেখানে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। এতে বহু মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

ইরান শুধু ইসরায়েল নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলেও হামলা চালিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় হতাহত ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে সৌদি আরব তেহরানকে সতর্ক করে বলেছে, তাদের ভূখণ্ডে হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। যদিও সৌদি সরকার কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এদিকে হেজবুল্লাহর সাথে যৌথভাবে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি এর বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসমিন। ইরানের সামরিক শাখা বলছে, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে মিলে এই হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি নৌবাহিনী এবং ড্রোন ইউনিট। এই হামলার ফলে ইসরায়েলের তেল আবিব, মধ্য ইসরায়েল এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিছু অংশে বিমান সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। যদিও সবশেষ চলানো এই হামলায় এখন পর্যন্ত হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির কোনও খবর পাওয়া যায়নি।

ইরাকেও একটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলার পর ব্রিটিশ কাউন্টারড্রোন ইউনিট ‘একাধিক ড্রোন’ ভূপাতিত করেছে বলে দাবি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের। গত বৃহস্পতিবার রাতে ইরাকের এরবিল অঞ্চলে ড্রোন হামলায় একজন ফরাসি সেনা নিহত হন এবং বুধবার ওই অঞ্চলে যুক্তরাজ্য ও মার্কিন বাহিনীর একটি ঘাঁটিতেও হামলার ঘটনা ঘটে। যার প্রেক্ষিতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাজ্য। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের টাইফুন জেটগুলো প্রথমবারের মতো বাহরাইনের আকাশে বিমান প্রতিরক্ষা অভিযান চালিয়েছে। কাতার, সাইপ্রাস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান এবং বাহরাইনে ব্রিটিশ স্বার্থ এবং মিত্রদের প্রতিরক্ষায় ব্রিটিশ টাইফুন এবং এফ৩৫ জেটগুলো এখন উড়ছে।

পশ্চিম ইরাকে কেসি১৩৫ মডেলের জ্বালানি সরবরাহকরী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। বিমানটি কিভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত করেনি মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড। যদিও তারা দাবি করেছে যে, এই ঘটনার সময় দুটি মার্কিন বিমান আকাশে ছিল, যার মধ্যে দ্বিতীয়টি নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং কোনও প্রতিকূল পরিবেশ বা গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেনি।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশটির ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ৯০ শতাংশ কমেছে এবং একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন হামলাও গত বৃহস্পতিবার ৯৫ শতাংশ কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইরানের এখন আর কোনও অস্ত্র উৎপাদনের ক্ষমতা নেই। যুদ্ধে ইরানের সামরিক বাহিনীকে ‘ধ্বংস’ করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন হেগসেথ। গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগনে ইরান যুদ্ধের সবশেষ অবস্থা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ এসব কথা বলেন।

এদিকে ইরানের ড্রোন হামলায় একজন ফরাসি সৈন্য নিহত হওয়ার পরও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ফ্রান্সের অবস্থান ‘সম্পূর্ণরূপে আত্মরক্ষামূলক’ থাকবে বলে জানিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাথে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেছেন তিনি। ম্যাক্রঁ বলেন, মিত্রদের সমর্থনে ফ্রান্সের অবস্থান সম্পূর্ণরূপে আত্মরক্ষামূলক এবং এই অবস্থানের কারণে আমাদের ওপর আক্রমণ করার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

এই সংঘাতের বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে সামরিক চাপ সৃষ্টি করায় বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং অনেক বিশেষজ্ঞ সম্ভাব্য বড় জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা করছেন। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। সেখানে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়া প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে হামলা বন্ধ করে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন দেশে ব্যাপক মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে লেবাননে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিমান চলাচল, বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উভয় পক্ষই পাল্টা হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। যদি সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এর গভীর প্রভাব পড়তে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএক বছর ধরে বন্ধ টেকনাফ স্থলবন্দর
পরবর্তী নিবন্ধচাইলেও হয়তো ইরান যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন না ট্রাম্প, কেন?