কলম ও নারী- অবদমিত কণ্ঠের উত্থান

রোকসানা বন্যা | শনিবার , ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ

ইতিহাসের পাতায় নারীর আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াই দীর্ঘদিনের। একসময় নারীর সৃজনশীলতা কেবল অন্দরের দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকলেও, উনিশ শতক থেকে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করে। নারীরা বুঝতে পারেন, সমাজ ও সংস্কৃতির মূলধারায় নিজেদের অধিকার সুনিশ্চিত করতে হলে লেখনীকে হাতিয়ার করার বিকল্প নেই। এই প্রেক্ষাপটে মেরি কার্পেন্টারের মতো অগ্রগামী নারীরা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিবর্তনে সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম। আর সেই সাহিত্যের পাতায় নারীর পদচারণা শুধু শব্দ বয়ান নয়, বরং এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। একটা সময় ছিল যখন নারীর সৃজনশীলতা অন্দরমহলের চার দেয়ালে বন্দী ছিল। কিন্তু সময়ের স্রোতে নারীরা সেই গণ্ডি ভেঙে কলমকে পেশা এবং প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মেরি কারপেন্টারের মতো স্বশিক্ষিত অগ্রগামীদের হাত ধরে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, আজ তা বিশ্বসাহিত্যের এক অপরিহার্য স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।

ঊনিশ শতকের দিকে তাকালে আমরা দেখি, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী নিজের চেষ্টায় জ্ঞানার্জন করেছেন। মেরি কারপেন্টার ছিলেন তেমনই একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি কেবল একজন সমাজসংস্কারক ছিলেন না, বরং তাঁর লেখনীর মাধ্যমে নারী শিক্ষা ও অধিকারের দাবিকে জোরালো করেছিলেন। তাঁর মতো নারীরা প্রমাণ করেছেন যে, শিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনে নয়, বরং চিন্তার মুক্তি ও তা প্রকাশের সাহসে নিহিত। তাঁরা লেখাকে কেবল শখ হিসেবে নয়, বরং পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেনযা সেই সময়ে ছিল এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

নারী লেখকদের সাহিত্যে আগমনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো নারীর নিজস্ব বয়ান তৈরি হওয়া। দীর্ঘকাল পুরুষ লেখকদের কলমে নারী চরিত্ররা চিত্রিত হয়েছে। সেখানে অধিকাংশ সময় নারী ছিল কেবল মায়া, মমতা বা ত্যাগের প্রতীক। কিন্তু নারীরা যখন নিজেরা লিখতে শুরু করলেন, তখন তাঁদের লেখায় উঠে এলো

নারীর অন্তর্জগতের জটিল মনস্তত্ত্ব।

সামাজিক বৈষম্য ও পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খলের স্বরূপ।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।

নারীরা লেখাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার ফলে নারী লেখকরা সমাজের মূলধারায় নিজেদের মতামত তুলে ধরার আইনি ও সামাজিক ভিত্তি খুঁজে পান। এটি তাঁদের কেবল অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করেনি, বরং সমাজের নীতিনির্ধারণী সংলাপে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।

সংস্কৃতি হলো একটি জাতির দর্পণ। নারী লেখকরা তাঁদের গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও প্রবন্ধের মাধ্যমে সংস্কৃতির সেই দর্পণকে পূর্ণতা দিয়েছেন। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন থেকে শুরু করে আধুনিক সময়ের লেখিকারা তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে, নারী কেবল সংস্কৃতির ভোক্তা নয়, বরং সংস্কৃতির প্রধান নির্মাতা।

আজকের বিশ্বে নারী লেখকরা কেবল সাহিত্যের একটি অংশ নন, তাঁরা সাহিত্যের গতিপথ নিয়ন্ত্রক। মেরি কারপেন্টারের সেই স্বশিক্ষিত লড়াই আজ প্রতিটি নারী লেখকের মধ্যে বহমান। লেখাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে তাঁরা যে সাহস দেখিয়েছেন, তা আগামী প্রজন্মের নারীদের জন্য এক অন্তহীন অনুপ্রেরণা। যতক্ষণ কলম সচল থাকবে, ততক্ষণ নারীর কণ্ঠস্বর উচ্চকিত হবে এবং সংস্কৃতি হবে আরও সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।

মেরি কার্পেন্টার প্রমাণ করেছিলেন যে, নারী যদি কলম ধরেন তবে তা রাষ্ট্রের আইনকেও নাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তাঁর গবেষণাপত্র ও প্রবন্ধ পেশ করে শিক্ষা আইনের সংস্কার ঘটিয়েছিলেন। তাঁর কাছে লেখা ছিল সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী পেশাদার হাতিয়ার। নারীরা কেবল নিজের কথা নয়, সমাজের প্রান্তিক শিশু এবং অবহেলিত নারীদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। আধুনিক নারী লেখকরা যখন সামাজিক সমস্যার কথা লেখেন, তখন তাঁরা পরোক্ষভাবে মেরির দেখানো পথেই হাঁটেন। তিনি শিখিয়েছেন, সাহিত্য কেবল বিনোদনের জন্য নয়, তা হওয়া উচিত মানবতার মুক্তির সোপান।

সীমাবদ্ধতা থাকলেও জ্ঞান ও সাহসের মাধ্যমে, সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারের সমন্বয়ে আজও নারীমুক্তির ইতিহাস এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসাইবার লিটারেসি ও সাইবার সিকিউরিটি
পরবর্তী নিবন্ধউখিয়ায় পাহাড় কাটার সময় মাটি চাপায় শ্রমিকের মৃত্যু