কর্মস্থলে যোগদানে দুই শিক্ষককে বাধা

টাইগারপাস বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় । এদের একজন শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, বের করে দেয়া হয় স্কুল থেকে

আজাদী প্রতিবেদন | সোমবার , ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ

নগরের একটি স্কুলের দুই শিক্ষককে কর্মস্থলে যোগদানে বাধা দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই দুই শিক্ষক হচ্ছেন নগরের টাইগারপাস বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হক ও সিনিয়র সহকারী শিক্ষক আমেনা বেগম। এর মধ্যে মোজাম্মেল হককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়। ওই দুই শিক্ষকের দাবি, ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট ‘মব’ করে তাদের স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়। সর্বশেষ চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের আপিল এন্ড আরবিট্রেশন কমিটির সিদ্ধান্ত মেনে গতকাল স্বীয় পদে যোগদান করতে গেলে বাধার শিকার হন। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদ ও তার সহযোগী বহিরাগতদের দায়ী করে বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ওই দুই শিক্ষক।

প্রত্যক্ষদর্শী এবং এ ঘটনার ভিডিও সূত্রে জানা গেছে, যোগদান করতে যাওয়ার পর মোজাম্মেল হক ও আমেনা বেগমকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবকরা। পরে এডহক কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদ উপস্থিত হয়ে দাবি করেন, তারা ২০২৪ সালেই পদত্যাগ করেছেন। এসময় মোজাম্মেল হককে উদ্দেশ্য করে তাকে (সভাপতি) বলতে শুনা যায়, আপনি জোর করে এসেছেন। এসময় মোজাম্মেল হক বলেন, ‘পরিপত্র অনুযায়ি আমি স্বপদে বহাল। এটা নীতিগত সিদ্ধান্ত। এখন আপনি আমাকে যোগদান করতে দেবেন না?’ তখন হারুন বলেন, ‘আপনি যোগদান করার মত অথরিটি পাননি। এসময় মোজাম্মেল হক পরিপত্র এবং বোর্ডের সিদ্ধান্ত পড়ে শুনান। এ বিষয়ে দুইজনের কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সেখানে লোকজন জড়ো হতে থাকে। একপর্যায়ে পেছন থেকে কয়েকজন ব্যক্তি এসে মো. মোজাম্মেল হককে ধাক্কা দিতে থাকেন। তারা তাকে টেনেহিঁচড়ে স্কুল থেকে বের করে দেয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মোজাম্মেল হককে হেনস্থাকারীদের কয়েকজন এলাকায় যুবদলের কর্মী পরিচয় দিলেও তাদের কোনো পদপদবী নেই।

জানা গেছে, ১৯৯০ সালে টাইগারপাস স্কুলে যোগ দেন মোজাম্মেল হক রনি। ২০১১ সাল থেকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তার স্ত্রী আমেনা বেগমও বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট মোজাম্মেল হক ও তাঁর স্ত্রী আমেনা বেগম পদত্যাগ করেছেন বলে দাবি বিদ্যালয়ের গভর্নিং কমিটির। তবে মোজাম্মেল হক ও আমেনা বেগমের দাবি তারা পদত্যাগ করেননি। ২০২৪ সালে তাদের পদত্যাগে জোর করানোর সময় উপস্থিত ছিলেন হারুন অর রশিদ। পরবর্তীতে তিনি এডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন।

জানা গেছে, গত ১৯ অক্টোবর বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর মোজাম্মেল হক ও আমেনা বেগমের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন হারুন অর রশিদ। এতে তিনি মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করেন, অডিটেও তার সত্যতা পাওয়ার দাবি করেন তিনি।

এদিকে মোজাম্মেল হক বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালন ও বকেয়া বেতনভাতাদি প্রদানের ব্যবস্থা নিতেও আবেদন করেন। এ বিষয়ে গত ১৭ ডিসেম্বর বোর্ডের আপিল এন্ড আরবিট্রেশন কমিটির ৪৯ তম সভায় আলোচনা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের পরিপত্রের আলোকে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। সেখানে বলা হয়েছে, স্বীকৃত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। না হলে ১৮০ দিন পরে তারা স্বপদে পুনর্বহাল হবেন এবং বেতন পাবেন। এই পরিপত্রের আলোকে মোজাম্মেল হক এবং তাঁর স্ত্রী আমেনা বেগমকে পুনরায় কর্মস্থলে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়। একইসঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য গত ৮ জানুয়ারি স্কুলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতিকে চিঠি দেয় বোর্ড। যার কপি দেয়া হয় মোজাম্মেল হককেও। এ চিঠি পেয়ে স্কুলে যোগদান করতে যান তিনি।

চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব এ কে এম সামছু উদ্দিন আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, আপিল ও আরবিট্রেশন কমিটি ৪৯তম সভায় মো. মোজাম্মেল হক ও তাঁর স্ত্রীর পক্ষে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এটি যেহেতু আদালতের রায়ের মতো, এ সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করতে হলে হাইকোর্টে যেতে হবে। সিদ্ধান্ত পেয়েই তিনি গিয়েছিলেন। তবে যোগ দিতে পারেননি বলে শুনেছি।

এদিকে যোগদান করতে না দেয়ার বিষয়ে গতকাল বোর্ডের চেয়ারমানকে লিখিত অভিযোগ দেন মোজাম্মেল হক ও আমেনা বেগম। এতে বলা হয়, ‘আইনানুগভাবে বিদ্যালয়ে যোগদান ও স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে তারা একই সময়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন। কিন্তু বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি জনাব হারুন অর রশীদ ও তাঁর সহযোগী বহিরাগত কতিপয় ব্যক্তির দ্বারা যোগদানে ইচ্ছাকৃত ও বেআইনি বাধা প্রদান করা হয়, সরকারি আদেশকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করা হয়।’ লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ‘একপর্যায়ে আমাদের প্রতি শারীরিক হেনস্তা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়যার ফলে গুরুতর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।’

এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি মাধ্যমিক১ শাখা কর্তৃক ইতোপূর্বে দেয়া আদেশ প্রতিপালন না করায় এবং কারণ দর্শানের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বোর্ডকে নির্দেশনা প্রদান করা হয় বলেও লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়। এতে বলা হয়, ‘সরকারি আদেশ অমান্যকারী ও সহিংস ঘটনার উস্কানি দাতা হারুন অর রশীদ এর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। আমরা বিশ্বাস করি, আপনার সদয় হস্তক্ষেপে আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে’।

মোজাম্মেল হক আজাদীকে বলেন, যারা আমাকে হেনস্তা করেছে তাদের সন্তানেরা একসময় বিদ্যালয়ে পড়ত। এর আগে যারা মব করেছিল তারাই আজকের ঘটনার সময় ছিল। আমি বোর্ডের চিঠি পেয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। তারা শারীরিক লাঞ্ছিত করেছে। আমি এ ঘটনার ন্যায় বিচার চাই।

বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদ আজাদীকে বলেন, তাদের যোগদান করতে দিইনি, বিষয়টি এমন না। তারা আগেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, কাজেই নতুন করে যোগদানের বিষয় নেই। এ বিষয়ে বোর্ডের কোনো চিঠি পাইনি। তারা যে চিঠি দেখাচ্ছে সেগুলো ফেইক। তারা বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত। ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেন, এলাকার লোকজনকে ওই দুই শিক্ষক অত্যাচার করেছিল। তাদের আসার খবর পেয়ে তারা স্কুলে উপস্থিত হয়ে বের করে দেয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাংলাদেশের সমর্থনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে যেতে পারে পাকিস্তানও
পরবর্তী নিবন্ধবাইরের ভোটার রাজধানীতে আনছে একটি দল : ফখরুল