কর্মবিরতিতে দিনভর বন্দর অচল, গভীর রাতে কর্মসূচি স্থগিত

আজ সকাল থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত থাকবে । বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ ছিল, জাহাজজট, রমজানের খাদ্যপণ্যের জাহাজ ৪৬টি । কন্টেনার না নিয়ে বন্দর ছাড়ল ১১ জাহাজ । চেয়ারম্যান দাবি করেছেন বন্দর সচল

আজাদী প্রতিবেদন | সোমবার , ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ

দিনভর কর্মবিরতি, পক্ষবিপক্ষ বক্তব্য, ১৫ জন শ্রমিককর্মচারীকে বরখাস্ত, বাসার বরাদ্দ বাতিল, বিবৃতি, বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার চুক্তি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে না হওয়ার ঘোষণা আসার পর গভীর রাতে চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মবিরতি কর্মসূচি স্থগিত করেছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। নির্বাচন ও রমজানের পণ্য খালাসের স্বার্থে আজ সোমবার সকাল ৮টা থেকে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি বিষয়ে সমস্যা সমাধান না হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

দিনভর বন্দর অচল : বন্দরের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালএনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে শ্রমিককর্মচারীদের লাগাতার কর্মবিরতিতে প্রায় অচল হয়ে পড়ে চট্টগ্রাম বন্দর। বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। তবে চলমান কর্মবিরতির মাঝে চট্টগ্রাম বন্দরকে ‘সচল’ বলে দাবি করেন বন্দরের চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামান। গতকাল দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই দাবি করেন। অবশ্য গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরে ১৬টি জাহাজ আসাযাওয়া করেছে। এর মধ্যে ১১টি জাহাজ বন্দর ছেড়ে গেছে। বন্দর ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলো নির্দিষ্ট কন্টেনার না নিয়ে বন্দর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। বেসরকারি ডিপো থেকে কন্টেনার এসে না পৌঁছানোয় এসব জাহাজে কন্টেনার বোঝাই করা সম্ভব হয়নি। বহির্নোঙর থেকে মাতারবাড়িতেও কয়লা বোঝাই একটি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে। জাহাজ চলাচল করলেও চলমান কর্মবিরতির কারণে বন্দরের ভেতরেবাইরে কোথাও কাজ হয়নি।

এনসিটির অপারেটিং কার্যক্রম ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে ৩১ জানুয়ারি থেকে কর্মবিরতি পালন করে আসছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। প্রথম তিন দিন প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করলেও চতুর্থ দিন থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। লাগাতার কর্মবিরতিতে জাহাজ ও পণ্য হ্যান্ডলিং বন্ধ হয়ে গেলে আমদানিরপ্তানি বাণিজ্যসহ বন্দরের প্রায় সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

অচলাবস্থার মাঝে ৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে আসেন নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি দফায় দফায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে বিকালে শ্রমিকেরা দুদিনের জন্য আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দিলে বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়।

কিন্তু বন্দর চালু হওয়ার অল্পক্ষণের মধ্যে বন্দরের ১৬ জন শ্রমিককর্মচারীকে বিভিন্ন জায়গায় বদলির আদেশ দেওয়ার পাশাপাশি তারা যেন দেশের বাইরে যেতে না পারে সেজন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। একইসঙ্গে দুদকের মাধ্যমে এসব কর্মচারীর সম্পদের তল্লাশি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আন্দোলনকারীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। শনিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ রোববার আবারো লাগাতার কর্মবিরতির কর্মসূচি ঘোষণা করে। এতে করে গতকাল সকাল থেকে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম আবারো বন্ধ হয়ে যায়। এবার বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রমকেও কর্মবিরতির আওতায় আনা হয়। ফলে বহির্নোঙরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

কর্মবিরতি চলাকালে গতকাল দুপুর নাগাদ বন্দর ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, বন্দর সচল রয়েছে। তিনি যখন বন্দর সচল বলে সাংবাদিকদের জানান তখন সরেজমিনে দেখা যায়, শুধু ইয়ার্ড নয়, বন্দর ভবনের ভেতর সব দপ্তরের অফিসিয়াল কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন শ্রমিককর্মচারীরা। বন্ধ রয়েছে খোদ চেয়ারম্যান কার্যালয়ের কার্যক্রমও।

সংবাদ সম্মেলনে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, কিছু কিছু গণমাধ্যমে লেখা হচ্ছে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এ অভিযোগ মিথ্যা। এখানে আসার আগে আমি আমার কর্মকর্তাকর্মচারীদের সঙ্গে দুই ঘণ্টা মিটিং করেছি। সবার সঙ্গে কথা হয়েছে। সবাই আমাকে আশ্বস্ত করেছে, বন্দরের কাজ স্বাভাবিকভাবেই চলমান।

তিনি বলেন, সরকার ও জনগণকে জিম্মি করে কিছু বিপথগামী কর্মচারী এই পথ বেছে নিয়েছে। আমরা রাষ্ট্রের কর্মচারীকর্মকর্তা। আমাদের আনুগত্য থাকবে রাষ্ট্রের প্রতি, বন্দর যে আইনে চলে সেই আইনের প্রতি। প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। কেউ যদি বিপথগামী হয়ে অন্য কারো আনুগত্য বেছে নেয়, সেটা কর্মকর্তাকর্মচারী আচরণবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থি। তাদের শাস্তি হবে।

তিনি বলেন, সামনে নির্বাচন ও রমজান। যারা আন্দোলনের নামে এসব কর্ম করছে, তারা রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। রমজানের আগে এ ধরনের একটি কাজ করে জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে তারা। বন্দর সচল আছে। আমি দুই ঘণ্টা বন্দরের কর্মকর্তাকর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা সবাই কাজে যাবে। কেউ বাধা দেবে না। যারা পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গতকাল সকাল থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় ধাপের আন্দোলনে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে। ধর্মঘটের কারণে বিভিন্ন জেটি, টার্মিনাল, কন্টেনার ডিপো, বহির্নোঙরসহ বন্দরের সব স্থানে কাজ বন্ধ ছিল। বন্দরের বিভিন্ন গেটের সামনে মোতায়েন করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়তি সদস্য।

আন্দোলন চলাকালে গতকাল জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক ছিল। ওই সময় বন্দরের জেটি থেকে ১১টি জাহাজ জেটি ছেড়ে চলে গেছে, ভেতরে জেটিতে বার্থিং নিয়েছে ৬টি জাহাজ। তবে এসব জাহাজে কন্টেনার ওঠানামার কাজ হয়নি। বন্দর থেকে কন্টেনার নিতে না পেরে জাহাজ নোঙর তুলেছে। অপরদিকে বার্থিং নেয়া জাহাজগুলো জেটিতে অলস বসে থাকতে দেখা গেছে। সরেজমিনে সিসিটি, এনসিটি ও জেসিবি বার্থে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকতে দেখা গেছে।

এদিকে ৩১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ৯ দিনের কর্মবিরতিতে বন্দরের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি জাহাজজটের কবলে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। বহির্নোঙরে দেড় শতাধিক জাহাজের জট তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আটকে পড়া কন্টেনার জাহাজ, বন্দরের ইয়ার্ড এবং বেসরকারি ডিপোগুলোতে লাখখানেক কন্টেনার আটকা পড়েছে বলে উল্লেখ করে সূত্রগুলো বলেছে, এর মধ্যে আসন্ন রমজান উপলক্ষে আমদানি করা খাদ্যপণ্যের ৪৬টি জাহাজ রয়েছে। আটকা পড়েছে পোশাক শিল্পের আমদানি করা কাঁচামালও। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, বহির্নোঙরে অবস্থান করা জাহাজের সংখ্যা ১১৫টি। এর মধ্যে ৬৭টি জাহাজের পণ্য খালাসের কাজ চলমান এবং ৩১টি জাহাজের কাজ পুরোপুরি বন্ধ।

চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে পড়া জাহাজের মধ্যে খোলা পণ্যবাহী জেনারেল কার্গো রয়েছে ২৬টি জাহাজে। ২১টি জাহাজে রয়েছে নিত্যপণ্য। ৪টি জাহাজে রয়েছে সার তৈরির কাঁচামাল। চিনি রয়েছে ৫টি জাহাজে, লবণ নিয়ে অলস ভাসছে ২টি জাহাজ। ১৩টি তেলবাহী জাহাজও আটকা পড়ে রয়েছে।

কর্মসূচি স্থগিত : দিনভর কর্মবিরতির পর গতকাল গভীর রাতে কর্মসূচি স্থগিত করেছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। গত রাতে এক বিবৃতিতে পরিষদের সমন্বয়ক মোহাম্মদ হুমায়ূন কবীর ও মোহাম্মদ ইব্রাহীম খোকন বলেন, এনসিটি নিয়ে মাননীয় উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ও বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সাংবাদিকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের আমলে এনসিটি চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক চট্টগ্রাম বন্দরের ৫ জন কর্মচারীকে গ্রেপ্তার ও হয়রানিমূলক মামলা প্রদান, বন্দরের ১৫ জন কর্মচারীকে বাংলাদেশের বিভিন্ন বন্দরে হয়রানিমূলক বদলি, বন্দরের আন্দোলনরত কর্মচারীদের নানাবিধ শাস্তি প্রদান, আন্দোলনরত কর্মচারীদের বাসা বরাদ্দ বাতিল, আন্দোলনরত ১৬ জন কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্তসহ নানাবিধ শাস্তি প্রদান করা হয়।

নেতৃবৃন্দ বলেন, এসব বিষয়ে আমাদের নেতৃবৃন্দের সাথে সন্তোষজনক আলোচনার প্রেক্ষিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং রমজানের পণ্য রিলিজ করার স্বার্থে আমরা চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ধর্মঘটের কর্মসূচি ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করছি। তবে উক্ত তারিখের মধ্যে উপরোক্ত ৫টি সমস্যার সমাধান না হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

এর আগে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ আরেকটি বিবৃতি দিয়েছিল। ওখানে কর্মসূচি স্থগিত করার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে কর্তৃপক্ষের হয়রানিমূলক পদক্ষেপকে দায়ী করে বলা হয়েছিল, তাদের দাবিগুলো না মানা পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আমরা কোনোভাবেই চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে দেব না।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ৪ দফা দাবিতে আন্দোলন করছে। তাদের দাবিগুলো হলো, এনসিটি ইজারা চুক্তি থেকে সরে আসা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহার, আন্দোলনরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বদলির আদেশ প্রত্যাহার এবং শ্রমিককর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত পদক্ষেপ না নেয়া।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে না : আশিক চৌধুরী
পরবর্তী নিবন্ধবারইয়ারহাটে চলন্ত কাভার্ডভ্যানে আগুন