কর্ণফুলী পাচ্ছে দেশের প্রথম ক্যাবল-স্টেইড সেতু

চন্দ্রঘোনা ফেরিঘাটে ১৬৫৯ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প

জগলুল হুদা, রাঙ্গুনিয়া | মঙ্গলবার , ৩১ মার্চ, ২০২৬ at ৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ

কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম দৃষ্টিনন্দন ও অত্যাধুনিক ক্যাবলস্টেইড (ঈধনষবংঃধুবফ) সেতু। রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই ও চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সংযোগস্থল চন্দ্রঘোনারাইখালী ফেরিঘাটে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। প্রায় ১৬৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগ ও পর্যটন শিল্পে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই সেতুর চূড়ান্ত নকশা প্রণয়ন শেষে প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬৫৮ কোটি ৭১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০৩১ পর্যন্ত এই প্রকল্পের নির্মাণকাল নির্ধারণ করা হয়েছে। সওজ রাঙামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, এই সেতুটি হবে স্টিলকংক্রিট কম্পোজিট ডেক বিশিষ্ট আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর এক নিদর্শন। মূল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ৫৩২ মিটার (ক্যাবলস্টেইড)। এটি হবে ৪৫৫ মিটার ভায়াডাক্ট এবং ১২৪৯.৮ মিটার এলিভেটেড সড়ক এবং এটিতে ৪ লেনের প্রশস্ত যাতায়াত ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া সেতুর স্থায়িত্ব রক্ষায় থাকবে ‘ব্রিজ স্মার্ট হেলথ মনিটরিং সিস্টেম’ এবং আধুনিক ‘টোল প্লাজা’। ভূমি অধিগ্রহণ করতে ৭.৫২ হেক্টর ভূমির জন্য ২৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

জানা যায়, রাঙামাটিবান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কের (আর১৬১) ২১তম কিলোমিটারে এই সেতুটি নির্মিত হলে দুই জেলার মধ্যে ফেরিমুক্ত বাধাহীন সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। বর্তমানে ফেরি পারাপারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে পর্যটক ও সাধারণ মানুষ যে ভোগান্তির শিকার হন, সেতুটি চালু হলে তার অবসান ঘটবে।

এদিকে সেতু নির্মাণের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। তবে আনন্দের পাশাপাশি উঠে আসছে বছরের পর বছর ধরে চলা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র। স্থানীয় বাসিন্দা কামরুল হাসান বলেন, বছরের পর বছর আমরা শুধু সেতুর আশ্বাসই শুনে এসেছি। বর্ষাকালে যখন পাহাড়ি ঢলে কর্ণফুলীর পানি বাড়ে, তখন ফেরির গ্যাংওয়ে আর পন্টুন ডুবে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার সময় যে কী ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা ভুক্তভোগীরাই জানেন।

রাইখালী বাজারের ব্যবসায়ী তনয় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, পাহাড়ি কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে নিতে পারি না ফেরির ঝামেলার কারণে। অনেক সময় ফেরি বিকল হয়ে মাঝ নদীতে আটকে থাকে। দেশের প্রথম ক্যাবল স্টেইড সেতু হলে পুরো বান্দরবানরাঙ্গামাটির সাথে আমাদের ব্যবসাবাণিজ্যের চেহারা বদলে যাবে।

সওজ রাঙামাটির উপসহকারী প্রকৌশলী কীর্তি নিশান চাকমা বলেন, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো নিরাপদ, টেকসই ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এটি শুধু যাতায়াত সহজ করবে না, বরং রাঙামাটি ও বান্দরবানের পর্যটন শিল্পের বিকাশকে কয়েক গুণ ত্বরান্বিত করবে। তিনি বলেন, এই মেগা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো রাঙামাটিঘাগড়াবাঙালহালিয়াবান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কের (আর১৬১) ২১তম কিলোমিটারে কর্ণফুলী নদীর ওপর একটি দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক সেতু নির্মাণ করা। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ফেরি পারাপারের ভোগান্তি নিরসন করে রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার মধ্যে একটি বাধাহীন, নিরাপদ এবং সময়সাশ্রয়ী সড়ক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে। এই সেতুটি শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই নয়, বরং দুই পার্বত্য জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের বিকাশেও মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। পাশাপাশি যানবাহন ও কৃষিপণ্য পরিবহনে একটি টেকসই এবং নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য।

কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল চন্দ্রঘোনা ফেরিঘাটে একটি সেতু। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপটিয়ায় জমির বিরোধে ছুরিকাহত, চার দিন পর যুবকের মৃত্যু
পরবর্তী নিবন্ধচাকসুর পাঠাগার সম্পাদকের ওপর হামলা