জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, করদাতারা যাতে উৎসবমুখর পরিবেশে সারাবছর রিটার্ন দাখিল করতে পারেন সেই ব্যবস্থা নিচ্ছে এনবিআর। এছাড়া ব্যবসায়ীরা যাতে এনবিআর অফিসে ঘুরতে না হয় সেজন্য সবকিছু অটোমেশন করা হয়েছে। ফলে সিঙ্গেল উইন্ডোর মাধ্যমে সার্টিফিকেট অনলাইনে প্রদান করা হচ্ছে।
গতকাল বিকেলে নগরীর আগ্রাবাদ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কনফারেন্স হলে আগামী ২০২৬–২০২৭ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্রাক্কালে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ব্যবসায়ী নেতাদের সাথে প্রাক–বাজেট মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের জন্য রাজস্ব সংগ্রহের চাপ থাকে। কিন্তু সবাইকে চাপে ফেলে আমরা রাজস্ব সংগ্রহ না করে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য করহার যৌক্তিক করা হবে। যারা ভ্যাট ও ট্যাঙ নিয়ে দ্বিধায় আছেন, তাদেরকে উৎসাহিত করার জন্য সিস্টেম আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। যারা অগ্রিম কর বা অতিরিক্ত ভ্যাট কিংবা অগ্রিম আয়কর প্রদান করেন, তা সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত রিফান্ডের জন্য সরাসরি ব্যাংক একাউন্টে পাঠানো হবে।
মো. আবদুর রহমান খান বলেন, সরকার বন্ড ম্যানেজমেন্ট ট্যাক্স, ভ্যাট ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনা কিভাবে আধুনিক ও পেপারলেস করা যায় সে লক্ষ্যে কাজ করছে। এজন্য বর্তমান সরকার ট্যাক্স, ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটি দিতে যাতে কেউ কার্পন্য না করে, সেজন্য নিয়মগুলোকে ডিরেগুলেট করার উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া নন–কমপ্লায়েন্স করদাতাদের ক্ষেত্রে ম্যানুয়েল পদ্ধতি বন্ধ, কাস্টমস এর ক্ষেত্রে ইচ্ছামাফিক কায়িক পরীক্ষা বন্ধ এবং বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত পণ্য পুনরায় রপ্তানির সাথে সমন্বয় হলে ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেজন্য বন্ড ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা হবে।
সভাপতির বক্তব্যে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রশাসক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, আমদানি পর্যায়ে করহার পুনর্বিন্যাস ও দেশীয় শিল্প সুরক্ষার জন্য নানাবিধ প্রণোদনার বিকল্প উপায় বের করতে হবে। ট্যাক্স সিস্টেমের সময়োপযোগী সংস্কারের মাধ্যমে ট্যাক্স জিডিপি অনুপাতও কাঙ্খিত মাত্রায় উন্নীত করতে হবে। চেম্বার প্রশাসক বর্তমানে মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনায় সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করেন। এক্ষেত্রে অধিকাংশ করদাতা প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের মধ্যবর্তী শ্রেণীর, তাই তাদের কথা বিবেচনায় রেখে প্রথম ধাপে ৫ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধাপে ১০ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন। পরবর্তী ধাপগুলো যৌক্তিকহারে নির্ধারণ করার জন্যও এনবিআরের প্রতি প্রস্তাব করেন। চেম্বার প্রশাসক বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় পরিবেশবান্ধব ইলেক্ট্রিক্যাল ভেহিক্যাল আমদানিতে শুল্ক সাশ্রয়সহ জ্বালানি উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন রিফাইনারি স্থাপন এবং বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি করার অনুমতি প্রদানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সভায় চিটাগাং চেম্বারের পক্ষ থেকে আয়কর বিষয়ক ৩৩টি, ভ্যাট বিষয়ক ৩৬টি ও শুল্ক বিষয়ক ৬৭টি মোট ১৩৬ প্রস্তাবনা এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে হস্তান্তর করেন চেম্বার প্রশাসক।
মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী ও ফরিদ আহমেদ চৌধুরী, উইমেন চেম্বারের সভাপতি আবিদা মোস্তফা, এফবিসিসিআই’র সাবেক পরিচালক মো. আমিরুল হক, চিটাগাং চেম্বারের প্রাক্তন সহ–সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর, সাবেক পরিচালক ডা. মঈনুল ইসলাম মাহমুদ, নাসির উদ্দিন চৌধুরী ও এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম গার্মেন্টস এঙেসরিজ গ্রুপের সভাপতি জসিম উদ্দিন চৌধুরী, রাঙামাটি চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ মামুন, সিএন্ডএফ এসোসিয়েশনের সভাপতি এস.এম. সাইফুল আলম, জিপিএইচ ইস্পাতের ডিএমডি আলমাস শিমুল, প্রান্তিক গ্রুপের এমডি ইঞ্জিনিয়ার গোলাম সরওয়ার, বিএসএম গ্রুপের আবুল বাশার চৌধুরী, শিপ ব্রেকিং এসোসিয়েশনের মাস্টার আবুল কাশেম, বারভিডার মহাসচিব রিয়াজ রহমান, ক্যাবের ইকবাল বাহার ছাবেরী, টায়ার টিউব এসোসিয়েশনের সভাপতি মাঈন উদ্দিন আহমেদ, বন্দর ট্রাক মালিক কন্ট্রাক্টর এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির সোহেল, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সালামত আলী, পার্ক শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী, বিজিএপিএমইএ’র প্রথম সহ–সভাপতি মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ চৌধুরী, সাহির ট্রেডের সরোয়ার আলম খান ও টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নানসহ বিভিন্ন সেক্টরের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। মতবিনিময় অন্যান্য বক্তারা চট্টগ্রাম বন্দরে স্ক্যানার সংখ্যা বাড়ানো, কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস কমানোর লক্ষ্যে চট্টগ্রামের সকল সংস্থার ল্যাব আধুনিকায়ন করা, গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিগুলোর জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সোলার প্যানেল ও সোলার লিথিয়াম ব্যাটারি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কমানো, আগাম করের ক্ষেত্রে দ্রুত রিফান্ড, অডিট সহজীকরণ, সর্বোচ্চ ভ্যাট হার সিঙ্গেল ডিজিটে নিয়ে আসা, দেশীয় উৎপাদনমুখী শিল্পকে সুরক্ষা ও প্রণোদনা, চট্টগ্রাম কাস্টমসের জনবল ও ল্যাব এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডাবল ট্যাঙেশন কমানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ভ্যাট সংস্কার ও যৌক্তিক করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
অন্যদিকে মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার পরিচালক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর চৌধুরী এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের হাতে মেট্রোপলিটন চেম্বারের পক্ষে একগুচ্ছ বাজেট প্রস্তাবনা তুলে দেন। এরমধ্যে রয়েছে– তৈরি পোষাক শিল্পের রপ্তানি আয়ের উপর প্রযোজ্য অগ্রিম আয়করের হার ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূণ্য দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা, বস্ত্র খাতের উপর বিদ্যমান ন্যূনতম কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে মোট রপ্তানি আয়ের উপর শূণ্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে কর কর্তনের এবং উক্ত করকে চূড়ান্ত করদায় হিসাবে পণ্য করার বিধান করা, ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপো (আইসিডি) খাতে বিদ্যমান ন্যূনতম কর হারে বিশেষ ছাড় বা হ্রাস প্রদান করা, বর্তমানে প্রযোজ্য অগ্রিম আয়কর ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা, তৈরি পোষাক শিল্পসহ শতভাগ রপ্তানিমুখী যাবতীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসে ভ্যাটের আওতা বহির্ভূত রাখা, তৈরি পোষাক শিল্পসহ শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাট নিরীক্ষার নামে অহেতুক হয়রানি বন্ধের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, দেশের ইস্পাত শিল্পে বিদ্যমান উৎসে অগ্রিম ভ্যাট হার ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০ শতাংশ হারে উন্নীত করা। ভ্যাট একটি কনজাম্পশন বেইজড ট্যাঙ, যা বিক্রয়ের সময় প্রযোজ্য হওয়া উচিত। আমদানির সময় অগ্রিম ভ্যাট আদায় করা হলে তা ব্যবসার উপর অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। ভ্যাট প্রত্যার্পনকে (রিফান্ড) সহজ ও করদাতা বান্ধব করা। ভ্যাট আপীলেত ট্রাইবুনালে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ হারে কর পরিশোধের বিদ্যমান বিধান কমিয়ে ৫ শতাংশে নির্ধারণ করা, বর্তমানে ভ্যাট আইনকে আরো সহজ, করদাতা বান্ধব ও গতিশীল করার লক্ষ্যে নিয়মিত সমন্বয় সভার আয়োজন করা। অন্যদিকে সময়ে সময়ে বিভিন্ন এস.আর.ও এর বিপরীতে কাস্টমস্ কর্তৃপক্ষের চাহিদা মোতাবেক ভ্যাটের বিভাগীয় কর্মকতা হতে প্রত্যয়ন পত্র ইস্যু করার নামে হয়রানি মূলক কার্যক্রম কমিয়ে আনা ও হোম কমজাম্পশন বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বন্ডের আমদানি প্রাপ্যতা থাকা সত্ত্বেও বন্ডেড সুবিধা ব্যতিরেকে কাস্টম্স কমিশনারের অধীনে ক্যাশ ডিউটি দিয়ে পণ্য আমদানি করার প্রক্রিয়া বন্ধ করা।
মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এনবিআরের সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী, মুহাম্মদ মুবিনুল কবীর, মো. আজিজুর রহমান, পান রপ্তানিকারক এসোসিয়েশনের সভাপতি মো. একরামুল করিম চৌধুরী, খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম, কনফিডেন্স সিমেন্টের পরিচালক জহির উদ্দিন আহমেদ, পিএইচপি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ পরিচালক মোহাম্মদ আলী হোসেন চৌধুরী (সোহাগ), লুব–রেফ’র এমডি মোহাম্মদ ইউসুফ প্রমুখ।














