প্রথমবারের মতো এএফসি নারী এশিয়ান কাপ খেলতে গতকাল বৃস্পতিবার রাতে অস্ট্রেলিয়া রওনা দিয়েছে বাংলাদেশ দল। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ শুক্রবার অস্ট্রেলিয়া পৌঁছে যাবে তারা। রোমাঞ্চকর এ সফর পুরোপুরি উপভোগ করতে হলে আলো ছড়াতে হবে বাংলাদেশকে উত্তর কোরিয়া, চীন ও উজবেকিস্তানের মতো দলের বিপক্ষে। আশাবাদী বাংলাদেশ অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার। বাফুফে ভবনে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অধিনায়ক জানান, ভালো কিছুর স্বপ্নই দেখছেন তারা। অস্ট্রেলিয়ায় আগামী ১ মার্চ শুরু হবে নারী এশিয়ান কাপ। ‘বি’ গ্রুপে বাংলাদেশের সাথে থাকা তিন দলের মধ্যে চীন প্রতিযোগিতার নয়বারের চ্যাম্পিয়ন, তিনবারের চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়া। গ্রুপের অন্য দল উজবেকিস্তান। এই আসর সামনে রেখে কখনও মালয়েশিয়ায়, কখনও থাইল্যান্ড, জাপানে ক্যাম্প ও প্রস্তুতি নেওয়ার কথা শুনিয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। কিন্তু কোনো আয়োজনই শেষ পর্যন্ত দেখেনি আলোর মুখ। থাইল্যান্ড হয়ে সরাসরি অস্ট্রেলিয়া পৌঁছে সেখানেই শুরু হবে বাংলাদেশের ক্যাম্প। ৩ মার্চ চীনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু করবে তারা। প্রস্তুতির কমতির প্রশ্নে অকপট স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বাফুফের নারী উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ। চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি বলেও দাবি তার। ‘আমি হতাশ বলব না, তবে আরও বেশি, আরও ভালো ট্রেনিং হলে দল আরও শক্তিশালী হতে পারত। ওই লেভেল থেকে যদি মেয়েদের বাইরে রেখে ট্রেনিং করাতে পারতাম, আরও কিছু প্রস্তুতি ম্যাচ খেলাতে পারতাম, তাহলে আমার তৃপ্তিটা আরও বেশি থাকত। এখন ওই তৃপ্তিটা অবশ্যই নেই। এ জায়গাতে ঘাটতি থেকে গেল।’ ঘাটতিটুকু নিয়ে এখন আর হা–পিত্যেশ করতে চান না আফঈদা। সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশ ফুটবল লিগে সবার খেলার মধ্যে থাকাটা ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন নারী সাফ জয়ী অধিনায়ক। গ্রুপে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচের প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তানকে ঘিরেই যে মূল পরিকল্পনা, সেটাও বুঝিয়ে দিলেন তিনি।
‘আপনারা জানেন যে, আমরা কয়েকদিন আগে উইমেন’স লিগ শেষ করেছি। তারপরে যে কয়দিন সময় পেয়েছি, আমরা কোচের কাছে প্র্যাকটিস করেছি। কোচ আমাদেরকে দেখাচ্ছেন আমরা কীভাবে খেলব। যেহেতু আমাদের প্রতিপক্ষ অনেক শক্তিশালী–চীন, উত্তর কোরিয়া, উজবেকিস্তান ওরা অনেক শক্তিশালী দল। তো আমরা প্রস্তুতিতে ওভাবেই কাজ করতেছি। ইনশাআল্লাহ আমরা ভালো কিছু করব। আপনারা সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন যেন আমরা ভালোভাবে ফিরে আসতে পারি এবং আমাদের সেরা খেলাটা আমরা খেলতে পারি। আমরা অবশ্যই সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব। আমাদের প্রথম দুটি ম্যাচ খুব শক্তিশালী দলের সাথে, তবে আমরা উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ভালো কিছু করার আশা রাখছি।’ ২৬ জনের দলে তিন নতুন মুখের মধ্যে আছেন আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী। সুইডেন প্রবাসী এই মিডফিল্ডার দলে অবদান রাখতে পারবে বলেই বিশ্বাস আফঈদা। নির্ভার থেকে অস্ট্রেলিয়ার আসর খেলার লক্ষ্যও জানালেন তিনি। ‘এশিয়ান পর্যায়ের লিগে ও খেলেছে। তাই আমাদের সাথে মানিয়ে নিতে ওর কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আর এশিয়া কাপের চাপ আমরা ওভাবে নিচ্ছি না। আমরা সব সময় যেভাবে খেলি, মাঠের ভেতর সেভাবেই স্বাভাবিক খেলা খেলার চেষ্টা করব।’ এদিকে প্রস্তুতির কমতি, প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে না পারা, প্রস্তুতি নিয়ে অনেক ‘মিথ্যাচার’ করাসহ নানা কারণে সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ উগরে দেন বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের কোচ পিটার জেমস বাটলার। ‘বেশি বিস্তারিত না বলে আমি শুধু এটাই বলব যে, যেকোনো টুর্নামেন্টে খেলার আগে আপনাকে প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রস্তুতিই সব। প্রস্তুতির চেয়ে লিগ বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছিল। ফিলিপাইনের বিপক্ষে ১৯ ফেব্রুয়ারি খেলার কথা ছিল এবং ১৪ তারিখে আমাদের দেশ ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু লিগের তারিখ পেছানোর ফলে আমাদের ১০ এবং ১৩ তারিখে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচের আদলে নিজেদের মধ্যে ম্যাচ খেলতে হয়েছে। আপনি ১০ এবং ১৩ তারিখে ম্যাচ খেলে কীভাবে ১৯ তারিখে ফিলিপাইনের বিপক্ষে খেলতে পারেন? মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও তাই, তারিখগুলো ভুল ছিল এবং লিগের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে অনেক মিথ্যাচার করা হয়েছে। আমি খুব বেশি কিছু বলব না, তবে বাস্তবতা হলো–প্রস্তুতি আদর্শ মানের হয়নি। আমি কাউকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দোষারোপ করছি না। আমাদের একটি পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সেটি কাজে লাগেনি। আমি একজন বাস্তববাদী মানুষ এবং এই দলের জন্য আমিই দায়বদ্ধ। আমি কারো হাতের পুতুল নই। আমি সবসময় সংবাদমাধ্যম এবং খেলোয়াড়দের সাথে সত্য ও সততার পথে চলব। তবে এখনকার বাস্তবতায় সময়ের সঠিক ব্যবহার করাটাই সবচেয়ে জরুরি এবং আমাদের হাতে থাকা সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হবে।’ গ্রুপ পর্বের তিন শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষের কৌশল সাজানো নিয়েও সাবধানী বাটলার। তরুণদের ওপর তিনি আস্থা রাখছেন। তবে, বাস্তবের জমিনে থেকে, পরিস্থিতি বুঝে খেলার পরিকল্পনার কথাও বললেন তিনি। ‘দলের প্রায় ৪৮ শতাংশ খেলোয়াড়ের বয়স ২০ বছরের নিচে এবং তাদের মানসিকতা বেশ আক্রমণাত্মক; আমি চাই না তারা সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসুক। তবে একই সঙ্গে, আমাদের দায়িত্ব এবং বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কেও আমি সচেতন। আমাদের লক্ষ্য হলো বিধ্বস্ত না হয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পারফরম্যান্স উপহার দেওয়া। আপনি যদি কোনো বাছবিচারহীন বা ঢিলে মানসিকতা নিয়ে শীর্ষ দলগুলোকে আক্রমণ করতে যান, তবে বড় ধরনের ধাক্কা খাবেন। কারণ বড় দলগুলোর বিপক্ষে ভুল করলেই তারা কঠোর শাস্তি দেবে। আমরা অত্যন্ত মানসম্পন্ন কিছু দলের বিপক্ষে খেলতে যাচ্ছি। তাই ম্যাচ বাই ম্যাচ, পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলতে হবে আমাদের।’ গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য উজবেকিস্তান ম্যাচ। এই ম্যাচটির ফল অনুকূলে এলে সরাসরি অলিম্পিকসে খেলার সুযোগ পাবে দল। প্রতিযোগিতার সেরা ছয় দলের মধ্যে থাকলে খোলা থাকবে পরের নারী বিশ্বকাপে খেলার দুয়ার। বাটলার অবশ্য উজবেকিস্তানকে নিয়েও ভীষণ সতর্ক। ২৬ জনের দলে নতুন মুখ তিন জন– সুইডেন প্রবাসী আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী, সবশেষ বাংলাদেশ উইমেন’স ফুটবল লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা আলপি আক্তার (২৯টি) ও সুরভী আক্তার আফরিন। দলে আছেন উমহেলা মারমা, নবীরন খাতুন, সুরভী আকন্দ্র প্রীতির মতো তরুণরাও। বাটলার এই নতুন ও তরুণদের দিকে তাকিয়ে আছেন আগ্রহভরে।
নারী এশিয়ান কাপের বাংলাদেশ দল: রুপনা চাকমা, মিলি আক্তার, স্বর্ণা রানী মন্ডল, আফঈদা খন্দকার (অধিনায়ক), কোহাতি কিসকু, নবীরন খাতুন, শিউলি আজিম, শামসুন্নাহার সিনিয়র, হালিমা খাতুন, সৌরভী আক্তার আফরিন, স্বপ্না রানী, মুনকি আক্তার, আইরিন খাতুন, শাহেদা আক্তার রিপা, উমহেলা মারমা, ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্দা, আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী, উন্নতি খাতুন, আলপি আক্তার, সুরভী আকন্দ প্রীতি, সুলতানা, তহুরা খাতুন, সাগরিকা ও শামসুন্নাহার জুনিয়র।












