বাংলা সাহিত্যের আকাশে যখন কবিতার নক্ষত্ররা একে একে জ্বলে ওঠে, তখন কিছু আলো এমন হয় যা সময়ের সীমা ছাড়িয়ে চিরকালীন হয়ে যায়। কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী ঠিক সেই ধরনের এক ধ্রুবতারা–যিনি শুধু কবিতা লিখেই থেমে থাকেননি, বরং বাংলাভাষা, সাহিত্য, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস, গান, অনুবাদ ও মানবতার চর্চায় এক অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন।
১৯৭১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার কালাপানিয়ায় জন্মগ্রহণকারী এই মানুষটি ছিলেন একাধারে কবি, গবেষক, ভাষাতত্ত্ববিদ, গীতিকার, সুরকার, আবৃত্তিশিল্পী, সাংবাদিক এবং জাতীয় কবিতা মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৬০–এরও বেশি। এক হাজারের অধিক গান ও আবৃত্তি তাঁর কণ্ঠে ও সৃষ্টিতে ধরা পড়েছে। শেখ সাদী, ফরিদ উদ্দিন আত্তার, ইমরুল কায়েসের মতো বিশ্বসাহিত্যের কবিদের কবিতার বাংলা অনুবাদে তিনি প্রথম পথিকৃৎদের একজন হয়ে উঠেছেন। আরবি, ফার্সি, উর্দু, ইংরেজি এমন বহু ভাষার জ্ঞান তাঁকে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর পরবর্তী সময়ে এক অনন্য জ্ঞানসাধকের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
তাঁর কবিতায় মানবতা ছিল সবচেয়ে বড় সুর।
“আমি দলদাস ধর্মদাস হতে চাই না,
আমি মানুষ হতে চাই”
এই লাইনগুলো যেন তাঁর সমগ্র জীবনদর্শনের সারাংশ। দলীয় আনুগত্য, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামপ্রদায়িকতার বেড়াজাল ছিন্ন করে তিনি সর্বদা মানুষের সমতা, অসামপ্রদায়িকতা ও সার্বজনীন প্রেমের কথা বলে গেছেন। তাঁর কবিতা ও গানে সমসাময়িক সমস্যা, মানবাধিকার, সহনশীলতা ও একতার বার্তা এত সহজে হৃদয়ে প্রবেশ করে যে পাঠক–শ্রোতা নিজেকে খুঁজে পান সেই শব্দগুলোর মাঝে।
তিনি শুধু লিখতেন না, লড়াই করতেনও। “দিল্লি না ঢাকা” কবিতার জন্য জেল খাটতে হয়েছিল ছয় মাস। কিন্তু সেই কারাগারও তাঁর কলমকে থামাতে পারেনি। বানান সংস্কার, ভাষার নতুন ধারা সৃষ্টি, জাতীয় কবিতা মঞ্চের মাধ্যমে কবিতার প্রসার সবকিছুতেই তাঁর অবদান অসামান্য।
২০২৬ সালের মার্চ মাসে রংপুরে বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁর বিদায়ে বাংলা সাহিত্য একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হারাল। কিন্তু ধ্রুবতারা তো হারায় না। তার আলো–পথ দেখায়, যুগ যুগ ধরে।
আজ যখন আমরা তাঁর কবিতা পড়ি, গান শুনি, তখন বুঝতে পারি। তিনি শুধু একজন কবি ছিলেন না, ছিলেন একটি আন্দোলন, একটি চেতনা, একটি মানবিক স্বপ্ন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মাহমুদুল হাসান নিজামী চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এক অমর ধ্রুবতারা হিসেবে, যার আলোয় পথ খুঁজবে আগামী প্রজন্ম।












