কবিতার পরিমাপ তার রহস্যে, তার লাবণ্যে এবং তার জাদুতে

রাশেদ রউফ | মঙ্গলবার , ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ

কবিতা’ হিসেবে যে সব লেখা দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীসহ বিভিন্ন দিকে মুদ্রিত হচ্ছে, তার অধিকাংশই কবিতা নয়এ ধরনের একটা অভিযোগ চালু আছে। এরকম অভিযোগও শোনা গেছে যে, ‘গত চার দশকে যে সব কবিতা লেখা হয়েছে, তার মাত্র কিছু আধুনিক, কিছু আংশিক আধুনিক এবং অধিকাংশই অনাধুনিক ও কবিতা নয়, নতুনও নয়।’ এই যে কোন্‌টা কবিতা এবং কোন্‌টা কবিতা নয়, তা নির্ণয় করা হয় কীভাবে? কবিতা যাচাইয়ের মানদণ্ডই বা কী? কবিতার জন্যে সর্বসম্মত মানদণ্ড কখনো হয় নি, হবেও না। যেখানে কবিতার অভিন্ন সংজ্ঞা নেই, যেখানে কবিতা বিভিন্ন জনের কাছে বিশ্লেষিত হয়েছে বিভিন্নভাবে, সেখানে কবিতা যাচাইয়ের মানদণ্ড কি অভিন্ন থাকতে পারে!

যেহেতু কবিতা মনের উৎসারণ, কবি মানসের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া এবং যেহেতু কবিতা অনুভবউপলব্ধির জিনিস, সেহেতু পাঠকের হৃদয়ঙ্গমের মধ্যেই কবিতার সার্থকতা। কোন্‌ কবিতা কাকে স্পর্শ করতে পারে, তা আগে থেকেই অনুমান করা কঠিন। কেননা, যে পঙ্‌ক্তি আমাকে আলোড়িত করেছে, অভিভূত ও মুগ্ধ করেছে, সেই পঙ্‌ক্তিটি একইভাবে অন্যজনের মনকেও নাড়া দেবে, তার গ্যারান্টি কোথায়? প্রতিটি মানুষের মনোজগত স্বতন্ত্র ও ভিন্ন। কারো মনের সাথে কারো মতের মিল থাকতে পারে, তবে অনিবার্য নয়। তাই একটি কবিতা একজনের কাছে চমৎকার, অন্যজনের কাছে তুচ্ছ। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, ‘জ্ঞানের ক্ষেত্রে, বস্তুর ক্ষেত্রে যে মতবদল হয়, কোনো একটা তথ্যে তার ভিত্তি থাকে বলে তার তবু একটা দিক পাওয়া যায়, কিন্তু রসের জগতে কখন যে কোনদিক থেকে হাওয়া দেয় তার কিছুই বলা যায় নাভাবখানা এই রকম যেন সমস্তটাই একটা বিশুদ্ধ খামখেয়াল। আসলে রসের ক্ষেত্রে কোনো কিছুই পরিমাপ করা যায় না প্রমাণও করা যায় না। এক জনের মনের সাথে অন্যজনের মনের যে অমিল থাকতে পারে, তা তো স্বাভাবিক। কিন্তু নিজের মনও কি সব সময় নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে? যে জিনিসকে সুন্দর ভোরে অপূর্ব মনে হয়েছে, বিকেলের ম্ল্লান ও বিষণ্ন বেলায় তাকে মনে হতে পারে বাতিল পণ্য। গাড়ি চড়ে অফিসে যাওয়ার পথে যে গানের সুর মনকে জাগিয়ে তুলেছে, এক বৃষ্টি ঝরা দিনে তা হয়তো মনের কাছে বেসুরো ঠেকছে।’ তাই বলতে চাই, মনকে তুষ্ট করার ব্যাপারটা আপেক্ষিক। যে সব কবিতাকে আমরা ‘কবিতা নয়’ বলে বাতিল করে দিচ্ছি হয়তো অনেকেরই অজান্তে সেই সব কবিতা বহু মনকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

কবিদের মধ্যে সকলের শক্তি সমান নয়, সকলের সামর্থ্য এক নয়। তেমনি পাঠকের মধ্যেও আছে এই বিভক্তি, আছে অপূর্ণতা। বোধ আর পাঠশক্তির ওপর নির্ভর করে কবিতার আনন্দগ্রহণ। তাই কবিতার রসগ্রহণ সবাই একই বিচারে করতে পারে না। ফলে কবিকে তাঁর পাঠকের দিকটাও খেয়াল রেখে অনেক সময় কবিতা নির্মাণ করতে হয়। এজন্য হুইটম্যান বলেছিলেন, ‘যে দেশের পাঠক যত বেশি অগ্রগামী, সে দেশের কবিতা তত বেশি সমৃদ্ধ’। কোন কবিতাটি গভীর এবং কোন কবিতাটি অগভীর, সেটা নির্ণয় করা যতটুকু সহজ, কোনটি কবিতা, কোনটি কবিতা নয়তা’ নির্ণয় করা ততটুকু কঠিন, যদি সেই লেখাটির ভেতরে পাঠককে তুষ্ট করার ক্ষমতা থাকে, সুর থাকে, ভাব থাকে। সকল কবিই চান, তাঁর নির্মিতব্য কবিতাটি হোক গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক, যদিও গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক করার পেছনে প্রয়োজন কবির মেধা ও শক্তি। যিনি যত বেশি ক্ষমতাবান ও মেধাবী, তাঁর কবিতাও তত সুন্দর ও সমৃদ্ধ। তবে শব্দের আধুনিকতা, বাক্যের আধুনিকতা, ছন্দের আধুনিকতা, তথা উপস্থাপনার আধুনিকতা থাকলেই সেই রচনাটি হচ্ছে আধুনিক।

কবিতার সাথে তারুণ্যের সম্পর্ক অটুটবলেছিলেন আব্দুল মান্নান সৈয়দ। সে জন্য কবিতা তরুণদের হাতেই তার দিক পরিবর্তন করে, বাঁক নেয় নতুনের দিকে। আবেগ, উচ্ছ্বাস, কৌতূহল সব মিলিয়ে কবিতা হয়ে ওঠে তারুণ্যময়।

মোট কথা, কবিতা একজন কবির আবেগাশ্রিত শব্দের নিটোল সমাহার, ভাবরসে টইটম্বুর এক উজ্জ্বল সরোবর, ছন্দের অপূর্ব ঝংকার। এটা সৃজনশীল একটা শিল্প। কবিতা অন্তরের বিষয়, অনুভবউপলব্ধির বিষয়। ফলে কবিতার পরিমাপ তার রহস্যে, তার লাবণ্যে এবং তার জাদুতে।

.

একটা আনন্দ সংবাদ। কবি ময়ুখ চৌধুরী পেলেন কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পুরস্কার ২০২৫। ধানমণ্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে গত ১৪ জানুয়ারি আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষাবিদ ও রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন। পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় সম্মাননা সনদ, ক্রেস্ট ও সম্মানী চেক। ময়ুখ চৌধুরীর নামে শংসাবচন পাঠ করেন কবি আব্দুর রব। সম্মাননা সনদ তুলে দেন রফিক আজাদপত্নী কবি দিলারা হাফিজ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদের সভাপতি কবি ফারুক মাহমুদ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন কবি জরিনা আখতার। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন রফিক আজাদপুত্র অব্যয় আজাদ। কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদের উপদেষ্টা কবি দিলারা হাফিজ স্মৃতি পর্ষদের ২০১৭ সালে যাত্রা পর্ব থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কার্যক্রম ব্যাখ্যা করেন এবং কোন্‌ কোন্‌ ক্ষেত্রে কারা পুরস্কৃত হয়েছেন তাদের নাম উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমিও হয়তো থাকবো না, তবে এ কার্যক্রম চলবে। তিনি তাঁর দুই পুত্র অভিন্ন ও অব্যয় আজাদের কথা মনে করে বলেন, এরাই আগামী দিনে এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের জন্য এ পুরস্কার লাভ করেন কবি ওবায়েদ আকাশ।

ময়ুখ চৌধুরী বাংলাদেশের সাহিত্যে এক অনিবার্য ও দুর্দমনীয় নাম। তাঁর পরিচিতি একাধিক কারণে পরিব্যাপ্ত। সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে তাঁর কৃতিত্ব ও প্রয়াস তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শিল্পসচেতন কবি হিসেবে, বিরল প্রসাদগুণসম্পন্ন প্রাবন্ধিক ও পরিশ্রমী গবেষক হিসেবে তাঁর অধিষ্ঠান তর্কাতীত। বোধে, অনুভবে ও পারঙ্গমতায় তিনি মনে প্রাণে সৎ, সাহসী ও শুদ্ধ। তাঁর কবিতার সৌন্দর্য এতোটাই স্পর্শকাতর ও অপূর্ব যে, পাঠক কবিতাটি পাঠ করা মাত্রই পৌঁছে যান এক স্বপ্নিল ও রহস্যময় জগতে, যেখানে এক ঐতিহ্যমণ্ডিত শিল্পের প্রতিচ্ছবি কবি দৃশ্যময় করে তোলেন। ভাষার বলিষ্ঠতা ও সুরের গতিময়তা তাঁর দুর্বোধ্য ও জটিল ভাবনাকেও সুখপাঠ্য করে দেয়। কি শব্দ প্রয়োগে, কি বক্তব্যে, কি বিন্যাসে, কি আঙ্গিকে, কি উপমায়, কি ছন্দে তিনি এক মেধাবী কবি। পদক পুরস্কারের ধার ধারেন নি কখনো। তাঁকে এ পুরস্কার প্রদান করে কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদই সম্মানিত হয়েছে। আমরা তাঁকে অভিনন্দন জানাই এবং তাঁর সুস্থতা ও দীর্ঘ জীবন প্রত্যাশা করছি।

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী; ফেলো, বাংলা একাডেমি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআসন্ন নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার প্রত্যাশা
পরবর্তী নিবন্ধসংখ্যালঘুদের ঘিরে গত বছরের অধিকাংশ ঘটনা সাধারণ অপরাধের আওতাভুক্ত