কন্টেনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ

কেঁপে উঠল সীতাকুন্ডসহ ৪ উপজেলার বিস্তৃত এলাকা ।। নিহত ৪, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস কর্মীসহ আহত তিন শতাধিক ।। চোখের সামনে উড়ে গেল কন্টেনার, মানুষ

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ৫ জুন, ২০২২ at ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ

সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ির কাশেম জুট মিলস সংলগ্ন বিএম কন্টেনার ডিপোতে গতকাল রাতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়েছে। বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন ৪ জন। আহত হয়েছেন তিন শতাধিক। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের ২০ জন কর্মীও আহত হয়েছেন। এক পুলিশ সদস্যের পা উড়ে গেছে। ঘটনাস্থলে মারা গেছেন ২ জন। হাসপাতালে ভর্তি করার পর মারা গেছেন ২ জন। নিহতদের একজনের নাম মোমিন (২৫)। তিনি বাঁশখালীর ছনুয়া গ্রামের মাস্টার ফয়েজ আহমদের ছেলে। নিহত অন্যদের পরিচয় জানা যায়নি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত হতে না পারলেও বিস্ফোরণের আগে ও পরের অগ্নিকাণ্ডে পণ্যভর্তি অনেক কন্টেনার উড়ে এবং পুড়ে গেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের ১৪টি ইউনিট রাত আড়াইটায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিল। এদিকে চমেক বার্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সংকটাপন্ন তিনজনকে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। গুরুতর আহত পুলিশের ৬ সদস্যকে ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন মানুষের মধ্যে ৩২ জনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন জমিরুল ইসলাম (৩০), সোহেল রানা (২২), ফয়সল সিকদার (৩০), মো. চান মিা (৩০), নূর মোহাম্মদ (২০), রাজু (৩৮), রতন কারণ (৫৪), মো. শরিফ (২১), রাকিব (২২), ইফাদ (১৬), মো. মফিজ (৩০), মো. জাকির হোসেন (৫২), সালাউদ্দিন (৩৫), রাজিব মণ্ডল (৪২), নজরুল (৩৮), সালাউদ্দিন (৩৫), মামুন মিয়া (২৭), মোরশেদ (৩৫), আরিফ আল মামুন (২৮), মো. রুবেল (৩১), আবদুল হাশিম (৩৮), মো. বাবলু (৩০), আলী আহমেদ (৩১), মো. জাহাঙ্গীর (৩৬), মো. মহিউদ্দিন (৩৬), মো. নাসির (৩০), ইমরুল কায়সার (২২), রাকিব ইসলাম (১৮), নোমান (২৮) ও রাশেদ (২২)।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, সীতাকুণ্ডের কাশেম জুট মিলস সংলগ্ন বিএম কন্টেনার ডিপো চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ স্মার্ট গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। সাত হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার এই কন্টেনার ডিপোতে গতকাল সাড়ে ৪ হাজারের মতো কন্টেনার ছিল। এর মধ্যে ১৬টি কন্টেনার ছিল হাইড্রোজেন পার অঙাইড। নিজেদের অপর একটি কারখানায় উৎপাদিত অত্যন্ত দাহ্য এই কেমিক্যাল ভর্তি কন্টেনারগুলো ডিপোর এক পাশে ছিল। এই কন্টেনারগুলোর একটিতে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় গতকাল রাত ৯টায়।

কোত্থেকে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে তা জানা না গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, হাইড্রোজেন পার অঙাইড এত বেশি দাহ্য পদার্থ যে, সামান্য উৎস থেকেই এগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। ডিপোতে রক্ষিত ১৬টি কন্টেনারের একটিতে গতকাল রাতে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হলে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেয়া হয়। খবর জানানো হয় শিল্প পুলিশকে। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিভানোর জন্য কাজ শুরু করে। পুলিশও অবস্থান নেয় ঘটনাস্থলে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিল ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ হঠাৎ বিপুল শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে সীতাকুণ্ডের বিস্তৃত এলাকার পাশাপাশি হাটহাজারী, রাউজান ও মীরসরাইয়ের অনেক এলাকা কেঁপে ওঠে। অনেক উপরে উঠে যায় কন্টেনারসহ নানা পণ্য। আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। বিশাল কন্টেনার ডিপোর পাশাপাশি সন্নিকটস্থ দুটি বাড়িতেও আগুনের বিস্তার ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

সীতাকুণ্ডের কাশেম জুটসহ সন্নিহিত কয়েক কিলোমিটার এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ এত তীব্র হয় যে তাতে বাড়িঘর এবং মসজিদের জানালার কাচ ভেঙে পড়ে। ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র আতংক দেখা দেয়। অনেকেই বাড়িঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটতে থাকেন।

পুলিশ জানিয়েছে, সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের কনস্টেবল তুহিনের পা বিচ্ছিন্নসহ আরও অন্তত ৫ কনস্টেবল, ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মোতাহার হোসেন ও শিল্প পুলিশের একাধিক সদস্য আহত হয়েছেন।

ঘটনার পর ডিপোর ভিতরে রক্তাক্ত মানুষের আহাজারি শুরু হয়। ফায়ার সার্ভিসের ১০ জনের মতো কর্মী আহত হন। এক পুলিশ সদস্যের পা উড়ে যায়। গুরুতর আহত হন ৫ জন কনস্টেবলসহ ৯ পুলিশ সদস্য। ডিপোর অনেক শ্রমিক-কর্মচারী এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে যাওয়া স্বেচ্ছাসেবকদের অনেকেই আহত হন। আগুনের লেলিহান শিখা এত ব্যাপক আকার ধারণ করে যে, ফায়ার সার্ভিসের পক্ষেও কাজ করা কঠিন হয়ে উঠছিল। সাধারণ মানুষ দূর থেকে আহাজারি করলেও আগুন নিভানো কিংবা হতাহতদের উদ্ধারে কাছে যেতে পারছিলেন না।

এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন বিএম ডিপো থেকে দলে দলে আহতদের এনে রাস্তায় বিভিন্ন গাড়িতে তুলে দেয়া হচ্ছিল। অনেক অ্যাম্বুলেন্স রোগীদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসে। সীতাকুণ্ডের সরকারি-বেসরকারি সব অ্যাম্বুলেন্স ও চট্টগ্রাম শহর থেকে অ্যাম্বুলেন্স গিয়ে অগ্নিদগ্ধদের হাসপাতালে নিয়ে আসে। ভাটিয়ারীতে শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের হাসপাতাল এবং ভাটিয়ারী মুক্তিযোদ্ধা হাসপাতালেও বেশ কিছু অগ্নিদগ্ধকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

মহাসড়কের কাশেম জুট মিলস এলাকায় ছোপ ছোপ রক্ত। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা বিভিন্ন যানবাহনের গতিরোধ করে আহতদের হাসপাতালে পাঠান। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিন শতাধিক অগ্নিদগ্ধকে চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. রাজিব পালিত আজাদীকে বলেন, নিহত ৪ জনের মধ্যে ২ জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। বাকি ২ জন ২৪ নং ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি জানান, হাসপাতালে এই পর্যন্ত ভর্তি ৯৫ জন রোগী কাউন্ট করতে পেরেছি। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী একজন পুলিশ সদস্য আজাদীকে জানান, চোখের সামনে কন্টেনার এবং মানুষকে উড়ে যেতে দেখেছি। আমার মনে হয় ১৫/১৬ জন মানুষ কয়লা হয়ে উড়ে গেছে। তবে ঠিক কতজন মারা গেছে সেটি নিশ্চিত হতে সময় লাগবে।

বিষয়টি নিয়ে বিএম কন্টেনার ডিপোর একাধিক কর্মকর্তার সাথে গত রাতে যোগাযোগ করা হয়। তারা সবাই নিজেদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, হাইড্রোজেন পার অঙাইড থেকে আগুনের সূত্রপাত। তারা বলেন, প্রচুর কন্টেনার রয়েছে ডিপোতে। এর মধ্যে কোথায় আগুন লেগেছে, কত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা বলা মুশকিল।

ডিপোর ভিতরে প্রচুর লোক কাজ করে উল্লেখ করে কর্মকর্তারা বলেন, ডিপোর বিশাল কর্মীবাহিনীর পাশাপাশি শত শত ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানের চালক-সহকারীও ভিতরে থাকেন। ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হলে এদের অনেকেই আগুন দেখতে বা নিভাতে ওখানে ভিড় করেন। বিস্ফোরণের পর এদের অনেকেই হতাহত হয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত রাতে শেষ খবরে জানা গেছে, চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফায়ার সার্ভিস অগ্নিকাণ্ডের কারণ কেমিক্যাল কন্টেনার বলে উল্লেখ করলেও ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে কিছু জানাতে পারেনি।

গত রাত ২টায় জানা গেছে, আগ্রাবাদ, কুমিরা, বায়েজিদ, সীতাকুণ্ড, মীরসরাই ও বন্দরসহ ৯টি স্টেশন থেকে ১৩ ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। এছাড়া আগ্রাবাদ, ফেনী ও হাটহাজারী স্টেশন থেকে চারটি অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে পৌঁছে হতাহতদের উদ্ধার করে।

এদিকে গত রাতে সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী, বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিন, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার প্রমুখ চমেক হাসপাতালে আহতদের দেখতে যান।

এত বিকট বিস্ফোরণ আগে ঘটেনি : সীতাকুণ্ডের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে বিস্ফোরণের ঘটনা অনেকটা গা সওয়া। উপকূলীয় এলাকায় গড়ে ওঠা শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে নিয়মিত বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ঘটে হতাহতের ঘটনাও। তবে কিন্তু গত রাতের বিস্ফোরণ ছিল অন্যরকম। স্থানীয়রা বলছেন, এ রকম বিস্ফোরণ এর আগে ঘটেনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঠাঁই নেই চমেক বার্ন ইউনিটে
পরবর্তী নিবন্ধবাঁচাই পৃথিবী, বাঁচাই পরিবেশ