পর্যটন শহর কক্সবাজারে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। শুষ্ক মৌসুমের শুরু থেকে পানির এই সংকট দেখা দিলেও প্রকৃতিতে তাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় পানির সংকট আরও বেড়েছে। এতে নিরুপায় হয়ে পানি কিনে পান করতে হচ্ছে শহরের বহু মানুষকে। পর্যটন জোন কলাতলীতেও এর প্রভাব পড়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, সুপেয় পানি কোথাও লবণাক্ত হয়ে গেছে, কোথাও আবার আয়রনের সমস্যা। ময়লার সমস্যাও রয়েছে। পৌরসভা থেকে সরবরাহকৃত পানিতেও একই সমস্যা। এতে বাসা–বাড়িতে পানি কিনে খেতে হচ্ছে।
কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, কক্সবাজার পৌর এলাকায় ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে ৬ থেকে ১৪ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এখন ৯০ থেকে ১১০ ফুট গভীরে স্বাদু পানি পাওয়া যাচ্ছে–যা এক দশক আগেও ছিল অনেক কম গভীরতায়। এরও আগে সুপেয় পানির কোনো সংকট ছিল না। অনিয়ন্ত্রিত পানি উত্তোলন, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সুপেয় পানির এ সংকট তৈরি হচ্ছে। এছাড়া শহরের কিছু এলাকায় ৪০০ ফুটের অধিক গভীরে গিয়েও সুপেয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
সুপেয় পানির সংকট তৈরি হওয়ায় শহরের অধিকাংশ এলাকার মানুষ বেকায়দায় পড়েছেন। বিশেষ করে শহরের প্রধান সড়কের উত্তর পাশের ঝাউতলা থেকে আলিরজাঁহাল পর্যন্ত প্রায় সব এলাকায় পানির সংকট সৃষ্টি হয়েছে। টেকপাড়ার বাসিন্দা আবদুল হাকিম বলেন, তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে মোটরে পানি উঠার পরিমাণ কমে গেছে। যা উঠে তাতেও নানা সমস্যা রয়েছে। আয়রন, ময়লা এবং লবণাক্ততা রয়েছে। এতে বাধ্য হয়ে প্রায় সময় বোতলজাত বা বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকৃত পানি কিনে খেতে হচ্ছে।
একই কথা জানিয়ে, ঝাউতলা এলাকার শহীদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ১০ বছরের বেশি সময় ধরে পানির সমস্যায় ভুগছি। শুষ্ক মৌসুম আসলে এই সমস্যা তীব্র হয়। মোটর দিয়ে গভীর থেকে তোলা পানিতে লবণ ও আয়রন ছেয়ে যায়। পান করবো তো দূরের কথা অনেক সময় গোসলও করা যায় না। গাড়ির মাঠ এলাকার মোস্তফা কামাল বলেন, খাওয়ার পানি কিনে খেতে হয়। এছাড়া বাসায় ব্যবহারের পানি দিয়ে গোসল করলে শরীরে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। গত দুই বছরে ৩ বার বাসা পরিবর্তন করেছি। এটি বড় সসম্যা। এই সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়া দরকার।
পানি সমস্যা নিয়ে বেকায়দায় রয়েছেন ভাড়া বাসায় বসবাসকারীরা। তারা বর্ষা মৌসুমে যে ভাড়া বাসায় উঠেন, শুষ্কমৌসুম শুরু হলে পানির সমস্যার কারণে সে বাসায় আর থাকতে পারে না। বাধ্য হয়ে বারবার বাসা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এ বিষয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাইফুল ইসলাম বলেন, গত সেপ্টেম্বরে টেকপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় উঠি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি আসলে দেখা দেয় পানির সমস্যা। পানিতে তীব্র আয়রন ও লবণাক্ততা। ফলে বাধ্য হয়ে বাসা পরিবর্তন করে অন্য জায়গায় উঠেছি।
বোতলজাত পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীর এন্টারপ্রাইজের মালিক জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, প্রতিদিন হোটেল–মোটেল জোনের একটি অংশে প্রায় ৮০–৯০ হাজার টাকার পানি সরবরাহ করতে হয়। পর্যটন মৌসুমে সেই চাহিদা বাড়ে আরো ৪/৫ গুণ।
কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুবেল বড়ুয়া বলেন, ১৪/১৫ বছর আগে যখন পৌরসভায় নয়টি পাম্প হাউস স্থাপন করা হয়। তখন ১৫০ থেকে ২০০ ফুট গভীরেই পানি পাওয়া যেত। এখন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ফুট গভীরেও সুপেয় পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। পাওয়া গেলেও তা মানসম্মত নয়। মূলত রোহিঙ্গা আসার পর থেকেই পানির চাহিদা আরো বেড়ে গেছে। কক্সবাজার শহর থেকেও প্রথম দিকে পানি সরবরাহ করা হয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।
অন্যদিকে শহরবাসীর পানির চাহিদা মেটাতে শহরতলীর চান্দের পাড়ায় একটি পানি শোধনাগার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। বাঁকখালী নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহ করা হবে এই প্ল্যান্ট থেকে। কিন্তু সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় থাকলেও এখনো এই প্ল্যান্টটি চালু করা যায়নি। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী প্রকৌশলী আবুল মনসুর বলেন, প্ল্যান্টটির কমিশনিং কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরের শেষ অথবা জানুয়ারির শুরুতে এটি পুরোপুরি চালু হবে। এই প্ল্যান্টটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০ লাখ লিটার পানি শোধন করতে পারবে। চালু হলে এটি পৌরসভার প্রায় ৫৫ শতাংশ পানির চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে।














