কক্সবাজারে বিস্ফোরিত গ্যাস পাম্পটির ছিল না পরিবেশ বা ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দুর্যোগ সচিব, তদন্ত কমিটি গঠন

কক্সবাজার প্রতিনিধি | শুক্রবার , ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজার শহরের বাইপাস সড়কে গ্যাস পাম্প বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রাণহানি না ঘটলেও আহতদের সবার অবস্থা আশঙ্ক্ষাজনক। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও ব্যাপক। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইদুর রহমান খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গ্যাস পাম্পটি গত মঙ্গলবার উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনের পরদিনই বুধবার রাতে পাইপ লাইন ফুটো হয়ে সেখানে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই গ্যাস পাম্পটি চালু করা হয়েছিল। তবে এই গ্যাস পাম্পটির মালিক রামুর বাসিন্দা এন আলম দাবি করেছেন, পাম্পের ছাড়পত্র আছে। সব কাগজপত্র তার রয়েছে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, আগুনে যারা দগ্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের তিনি সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।

জানা যায়, গত মঙ্গলবার ‘কক্সবাজার এলপিজি স্টেশনটি’ উদ্বোধন করা হয়। মালিকপক্ষ দাবি করছেন, আনুষ্ঠানিক নয় পরীক্ষামূলকভাবে পাম্পটি চালু করা হয়। এর মধ্যে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পাম্পের ট্যাংক থেকে ফুটো দিয়ে গ্যাস নির্গত হয়ে আগুন ধরে যায়। পাম্পের কর্মচারীরা বালু ও পানি ছিটিয়ে তা নেভান। পরে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আবার আগুন ধরে যায়। সেই আগুন চারদিকে ছড়াতে থাকে। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের ঘরবাড়িসহ নানা প্রতিষ্ঠানে। আগুনে ৩০টির মতো গাড়ি, চারটি বাড়িসহ নানা অবকাঠামো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুনে দগ্ধ হন অন্তত ১৬ জন। এরমধ্যে গুরুতর দগ্ধ হন ৯ জন। তাদের মধ্যে ৬ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট এবং ৩ জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক। সেনাবিমানবাহিনী, ফায়ার সার্ভিসের পৃথক ৯টি ইউনিট টানা পাঁচ ঘণ্টা চেষ্টার পর গতকাল দিবাগত রাত ২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। সেনা ও বিমানবাহিনী, ফায়ার সার্ভিসের পৃথক ৯টি ইউনিট টানা পাঁচ ঘণ্টা চেষ্টার পর ওইদিন দিবাগত রাত ২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।

কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও কলাতলীর বাসিন্দা জিসান উদ্দিন বলেন, এমন জনবহুল এলাকায় গ্যাস পাম্প নির্মাণ ঝুঁকিপূর্ণ। যেহেতু আগুনে দগ্ধ লোকজনের চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই কক্সবাজারে, দগ্ধ লোকজনকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকার বার্ন ইউনিটে পাঠাতে হয়। তাতে পথেই অনেকের মৃত্যুও ঘটে।

কক্সবাজারের গ্যাস পাম্প বিস্ফোরণের ঘটনা সরজমিন পরিদর্শন করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইদুর রহমান খান। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ৩টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জেলা প্রশাসন আগুন নিয়ন্ত্রণে যথাযথ উদ্যোগ না নিলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। ঘটনার আসল রহস্য উদ্ঘাটনে তিন সদস্যের তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কক্সবাজার(সদর, রামু ও ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। এরমধ্যে বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাংসদ লুৎফুর রহমান কাজলকে ফোন করে এই ঘটনা সম্পর্কে খবর নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে কল দিয়ে এই ঘটনার সম্পর্কে জানতে চান এবং যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখতে নির্দেশ দেন। একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত সবাই যাতে যথাযথ বিচার ও ক্ষতিপূরণ পায় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দেন।

পাম্পের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন : গ্যাস পাম্পটি যেখানে রয়েছে সেটি একেবারে জনবহুল এলাকা। পাশের আদর্শগ্রাম, চন্দ্রিমা হাউজিং ও পুলিশ লাইনস এলাকায় অন্তত ২০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। এমন জনবহুল এলাকায় গ্যাস পাম্প স্থাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশকর্মীসহ সচেতন লোকজন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, গ্যাস পাম্পটি নির্মাণের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, গ্যাসের ফুটো থেকে বিস্ফোরণ ও আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি গ্যাস ফুটো বন্ধে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিটকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, গ্যাস পাম্প নির্মাণের বিপরীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল কি না এই মুহূর্তে তার মনে পড়ছে না। তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। তবে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন না থাকলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও থাকার কথা নয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. . মান্নান বলেন, গ্যাস পাম্প নির্মাণ, আগুনের সূত্রপাত এবং ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেলে বলা যাবে গ্যাস পাম্পটি কীভাবে তৈরি হল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত, চমেক হাসপাতালে ভর্তি ৬ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক
পরবর্তী নিবন্ধ৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি ব্যান্ড দলকে একুশে পদক তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী