ওরা এখন আর ঝরে পড়ে না

খাগড়াছড়ির ৩ উপজেলায় আবাসিক বিদ্যালয় সবকিছুই বিনামূল্যে, বাংলার পাশাপাশি মাতৃভাষায়ও পাঠদান

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি | মঙ্গলবার , ২৮ জুন, ২০২২ at ৬:১২ পূর্বাহ্ণ

রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়নের নয়মাইল এলাকার স্কুল শিক্ষার্থী ভরতি ত্রিপুরা। নিজ এলাকায় কোনো বিদ্যালয় না থাকায় তাকে ভর্তি করানো হয় দীঘিনালার কাঁঠালতলী আবাসিক বিদ্যালয়ে। সেখানে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া ভরতি ত্রিপুরা এখন পড়ছে পঞ্চম শ্রেণীতে। এ বিদ্যালয়ে ভরতি ত্রিপুরার পড়াশোনার পাশাপাশি তার পোশাক, খাবার, শিক্ষা উপকরণসহ অন্যান্য সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এভাবে ভরতি ত্রিপুরার মতো প্রায় তিনশ শিক্ষার্থী পড়ছে খাগড়াছড়ির তিনটি আবাসিক বিদ্যালয়ে।

মূলত পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের প্রাথমিকে ঝরে পড়া রোধে কার্যকরী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যেসব এলাকায় স্কুল নেই তাদের পাঠদান করানো হচ্ছে তিনটি আবাসিক বিদ্যালয়ে। সেখানে পড়াশোনার নানা সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি থাকা, খাওয়া, পোশাক, শিক্ষা উপকরণসহ দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় প্রায় সবই।
জানা যায়, খাগড়াছড়ির অনেক দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে এখনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। সেখান থেকে নানা কারণে দূরে গিয়ে অনেক শিশু বিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। মূলত তারা যেন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করতে পারে সেজন্য পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি, দীঘিনালা ও গুইমারা উপজেলায় তিনি আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপন করে পাঠা দান করানো হচ্ছে।

মহালছড়ি আবাসিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুইনু মারমা ও সাম্পারি ত্রিপুরা বলেন, আমাদের গ্রামে কোনো স্কুল নেই। তাই আমরা আবাসিকে ভর্তি হয়েছি। এখানে আমাদের সব ধরনের সুবিধা দেয়া হয়। দিনে তিনবেলা খাবার, বিদ্যালয়ের পোশাক, জুতা, শিক্ষা উপকরণসহ যাবতীয় শিক্ষা সামগ্রী ও ব্যবহার্য জিনিস দেয়া হয়।
শিক্ষকরা বলেন, সরকারের এমন উদ্যোগের কারণে দুর্গম এলাকার জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। তাদের শিক্ষাজীবন নিশ্চিত হয়েছে। আবাসিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষার পাশাপাশি মাতৃভাষাতেও পাঠদান করানো হয়। মহালছড়ি আবাসিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ঊর্মি দাশ ও ক্রাশসং খিয়াং বলেন, আমাদের স্কুলের সাথে রয়েছে আবাসিক ছাত্রাবাস। এখানে একশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পেয়ে থাকে। এতে করে দুর্গম এলাকা যেমন সাজেক, মাচালং, কাচালংসহ বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীদের সাথে আমাদের যোগাযোগ করার সুযোগ হয়েছে। যদি আবাসিক বিদ্যালয় না থাকত তাহলে তারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেত না। সরকারের এমন একটি উদ্যোগের কারণে তারা ঝরে পরছে না। শিক্ষার্থীরা সুন্দর একটা শৈশব পেয়েছে। শিক্ষার্থীদের ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা ভাষাতেও পাঠদান করানো হয়।

মহালছড়ি আবাসিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক ধনমনি চাকমা বলেন, ১৯৮৬ সাল থেকে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষা সংকট দূর করতে সরকার মহালছড়িতে আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছে। এখানে সরকার শিক্ষার্থীদের সকল ধরনের সুবিধা বিনামূল্যে দিয়ে থাকে। এখানে পড়াশোনা করে অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত।

তবে পাহাড়ে দুর্গম ভৌগলিক অবস্থানে কারণে আবাসিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর দাবিজানিয়েছেন জাবারাংয়ের নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা। তিনি বলেন, বর্তমানে মাত্র তিনটি উপজেলায় আবাসিক বিদ্যালয় রয়েছে। জেলায় ৯ উপজেলার প্রতিটিতে আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপন করতে পারলে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করার সুযোগ পাবে।

দুর্গম পাহাড়ে স্কুলবিহীন গ্রামের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনতে বন্ধ আবাসিক ছাত্রাবাস চালুর উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা টিটন খীসা। তিনি বলেন, জেলার মানিকছড়ি, পানছড়ি ও লক্ষীছড়িতে আবাসিক ছাত্রাবাসের অবকাঠামো রয়েছে। জনবল নিয়োগ করে ছাত্রাবাসগুলো চালু করার জন্য সরকারকে অনুরোধ করব।

পূর্ববর্তী নিবন্ধলাইটারেজ জাহাজে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ইঞ্জিন মিস্ত্রির মৃত্যু
পরবর্তী নিবন্ধযুক্তরাজ্যকে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসনের প্রস্তাব মোমেনের