বারো আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে আছে পীর আউলিয়ার মাজার। এসব মাজারে বার্ষিক ওরস হয়। ওরসে আগত ভক্তদের তবররুক হিসেবে পরিবেশন করা হয় আখনি বিরিয়ানি, যা মানুষের মুখে ওরস বিরিয়ানি নামে পরিচিত। এছাড়া ঈদে মিলাদুন্নবীর (সা.) মাহফিলেও অনেক সময় এই আখনি বিরিয়ানি পরিবেশন করা হয়। এই বিরিয়ানির স্বাদ অন্য যে–কোনো খাবারের চেয়ে আলাদা। তাই দূরদূরান্ত থেকে এসব অনুষ্ঠানে হাজির হন ভক্তরা।
গত বছর থেকে এই ওরস বিরিয়ানি একপ্রকার বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। ওরসের আদলে টাঙানো হয়েছে শামিয়ানা। বসানো হয়েছে সারি সারি চেয়ার। কাছেই ডেকে লাকড়ি দিয়ে রান্না হচ্ছে বিরিয়ানি। বিরিয়ানি ছাড়াও ওরসের চিরচেনা চনার ডাল, নলা ও আলাদাভাবে গরুর মাংসও রান্না করছেন বাবুর্চিরা। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে চেয়ার বসে ওরসে বিরিয়ানি খাচ্ছে বিভিন্ন মানুষ। জানা গেছে, নগরী ছাড়াও কর্ণফুলী নদীর অপর পাশে মইজ্জ্যারটেক এলাকায় গড়ে উঠেছে ওরস বিরিয়ানির দোকান। প্রথমে ওসমানিয়া ওরস বিরিয়ানি নামে একটি প্রতিষ্ঠান বিরিয়ানির ব্যবসা শুরু করে। পরে আকাশ বিরিয়ানি, কর্ণফুলী ওরস বিরিয়ানি, খাজা আজমির ওরস বিরিয়ানির নাম ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া বাকলিয়া কল্পলোক এলাকার চট্টলা ওরস বিরিয়ানি ভোজনরসিকদের পছন্দের তালিকায় উঠে আসে।
ওখানকার ব্যবসার জৌলুস দেখে নগরীর বিভিন্ন মোড়ে উদ্যোক্তারা শামিয়ানা টাঙিয়ে চালু করেন ওরস বিরিয়ানি। এর মধ্যে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যারা কেবল রমজানকে কেন্দ্র করে ব্যবসা করছে। এদের একটি নগরীর সিআরবি মোড়ের অদূরে গোয়ালপাড়া–সংলগ্ন ‘ওরস হাইলি আইয়ুন’।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক অংশীদার আবদুল্লাহ আল মামুন গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, গত বছর আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ওরস বিরিয়ানির ব্যবসা চালু করেছি। অনেক হোটেলে এখন ওরস বিক্রি চালু করেছে। তবে আমরা ওরসের আদলে ওরস বিরিয়ানি রান্না করছি। এছাড়া খোলা আকাশে শামিয়ানা টাঙিয়ে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। আমাদের কাস্টমররা যেন পরিবেশ ও খাবারে প্রকৃত ওরস বিরিয়ানির স্বাদ পায় সেজন্য এই ব্যবস্থা। এছাড়া মানের দিক থেকেও আমরা আপস করি না। তাই আমাদের কাছে কাস্টমররা বারবার আসেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের বেচাবিক্রি কিছুটা কম। অনেকে এখন তারাবিহ পড়ছেন। এছাড়া মার্চ মাস মাত্র শুরু হয়েছে। অনেকের বেতন হয়নি। তাই সব মিলিয়ে বেচাবিক্রি কিছুটা মন্দা। আশা করি ১৫ রমজানের পর বেচাবিক্রি পুরোদমে শুরু হবে।
নগরীর বাকলিয়ার কল্পলোক ১ নং রোডের চট্টলা ওরস বিরিয়ানির ব্যবসায়িক অংশীদার মো. আকসার উদ্দিন বলেন, গত বছর থেকে ওরস বিরিয়ানির ব্যবসা করছি। আমরা যখন ব্যবসা শুরু করি তখন চট্টগ্রামে ওরস বিরিয়ানির প্রতিষ্ঠান ছিল হাতেগোনা। এখন বিভিন্ন হোটেল–রেস্টুরেন্টও ওরস বিরিয়ানি চালু করেছে। তাদের সাথে আমাদের বিরিয়ানির পার্থক্য অনেক। তাই আমাদের এখানে একবার যে খেতে আসে সে বারবার আসে। আমরা মৌসুমি ব্যবসা করি না। যার ফলে সারা বছর কাস্টমারদের কথা চিন্তা করে খাবারের গুণগত মান ধরে রাখতে হয়।
চট্টলা ওরস বিরিয়ানিতে আসা আবু মুসা বলেন, ওরস বিরিয়ানির স্বাদের সাথে অন্য কোনো খাবারের তুলনা হয় না। মাত্র ১২০ টাকায় ওরস বিরিয়ানি খাওয়ার সাধ মিটছে। সেজন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিরিয়ানি খেতে এসেছি।
কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জ্যারটেক এলাকার আকাশ বিরিয়ানির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আকাশ বলেন, গত বছর আমরা যখন ওরস বিরিয়ানি চালু করি, তখন চট্টগ্রামে ওরস বিরিয়ানির প্রতিষ্ঠান ছিল দুই– একটা। আমাদের দেখাদেখি অনেকে ওরস বিরিয়ানির ব্যবসায় আসেন। ফলে এখন ওরস বিরিয়ানির দোকানও যত্রতত্র হয়ে গেছে। এর প্রভাবে এখানে ব্যবসা কমে গেছে। গত বছর এমন দিনে প্রতিদিন অন্তত ৬ হাজার লোককে বিরিয়ানি পরিবেশন করতাম। এখন সেটি নেমে এসেছে এক হাজারে।
বিরিয়ানি শব্দটি ফারসি ‘বিরিঞ্জ’ শব্দ থেকে এসেছে। এটি ভাতের ফারসি প্রতিশব্দ। মূলত মোগলদের হাত ধরে ভারতবর্ষে আসা রাজকীয় খাবার বিরিয়ানি ছড়িয়ে গেছে অঞ্চলে–অঞ্চলে। মাইজভান্ডার দরবারের বার্ষিক ওরসে সুগন্ধি চাল ও মাংসের মিশ্রণে তৈরি করা হতো সুস্বাদু ওরস বিরিয়ানি। কালের পরিক্রমায় তা চট্টগ্রামের বিভিন্ন মাজারে ছড়িয়ে পড়ে।












