ঐ নূতনের কেতন ওড়ে

রেজাউল করিম | বুধবার , ৮ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ

প্রকৃতির রীতি অনুযায়ী আরো একটি বছর বিদায় নিতে যাচ্ছে, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে স্বাগত জানাতে প্রায় সকলে উন্মুখ। চলছে শেষ সময়ের ব্যস্ততা। বাংলা সনের মূল প্রবক্তা মোগল সম্রাট আকবর। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে আদিল শাহ শূরের সেনাপতি হিমুকে পরাজিত করে দিল্লীর সিংহাসনে বসেছিলেন। সম্রাট আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য তাঁর সভাসদ জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীর সহযোগিতায় ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে ‘তারিখএলাহি’ নামে নতুন এক বছর গণনা পদ্ধতি চালু করেন।

সে সময়ের কৃষকদের কাছে এটি ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত হয়, যা পরে ‘বাংলা সন’ বা ‘বঙ্গাব্দ’ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেই সময়ে প্রচলিত রাজকীয় সন ছিল ‘হিজরি সন’, যা চন্দ্রসন হওয়ার প্রতি বছর একই মাসে খাজনা আদায় সম্ভব হতো না। এ কারণে সম্রাট আকবর একটি সৌরভিত্তিক সন প্রচলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, যা কৃষকদের ফসল উৎপাদনের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। নতুন এই সাল আকবরের রাজত্বের ২৯তম বর্ষে চালু হলেও তা গণনা আরম্ভ হয় ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকেই, কারণ ওই দিনেই দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে তিনি হিমুকে পরাজিত করেছিলেন।

তারিখএলাহি’র আগে বাঙালিরা শকাব্দ অনুযায়ী চৈত্র মাসকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে ব্যবহার করত। পরে যখন ৯৬৩ হিজরির প্রথম মাস মহররমকে ‘তারিখএলাহি’র প্রথম মাস ধরে গণনা করা শুরু হয় তখন তা বৈশাখ মাসের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় বৈশাখকেই ধরা হয় ‘তারিখএলাহি’র প্রথম মাস। বাংলাসনের প্রথম বছর ছিল ৯৬৩ হিজরি। এর আগে কোনো বাংলাসন নেই।

শুরুর দিকে বাংলা সন এই অতিরিক্ত সময়কে গণনায় নেয়নি। পরে এই ঘাটতি দূর করার জন্য বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে এবং ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহের পরিচালনায় একটা কমিটি গঠন করা হয় ১৯৬৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। ১৯৮৮ সালের ১৯ জুন থেকে বাংলা একাডেমির সুপারিশ করা পঞ্জিকা গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালন করা হয়।

১৬০৮ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীররে নির্দেশে সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতি ঢাকাকে যখন রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন, তখন থেকেই রাজস্ব আদায় ও ব্যবসা বাণিজ্যের হিসাবনিকাশ শুরু করার জন্য বাংলা বছররে পহেলা বৈশাখকে উৎসবের দিন হিসেবে পালন শুরু করেন। সম্রাট আকবরের অনুকরণে বৈশাখের প্রথম দিন সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতি তাঁর বাসভবনরে সামনে সব প্রজার শুভ কামনা করে মিষ্টি বিতরণ এবং উৎসব পালন করতেন। সেখানে সমাজের সকল স্তরের মানুষ উপস্থিত থাকত। প্রজাদের খাজনা আদায় ও হিসাবনিকাশের পাশাপাশি চলত গানবাজনা, বলীখেলা, গরুমহিষের লড়াই, কাবাডি খেলা ও হালখাতা অনুষ্ঠান। প্রজারা নতুন জামাকাপড় পরে জমিদারবাড়ি খাজনা দিতে আসত। জমিদাররা আঙিনায় নেমে এসে প্রজাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেন। সবশেষে ভোজপর্ব দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হত।

বিশেষভাবে বলা যেতে পারে হালখাতার কথা। নববর্ষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে হালখাতার নাম। যদিও ডিজিটাল এই যুগে হালখাতা প্রথার প্রচলন কমে গেছে অনেকটাই, বিশেষ করে শহরে। আগে হালখাতা উপলক্ষে রীতিমতো নিমন্ত্রণপত্র ছাপিয়ে উৎসবের আয়োজন করতেন দোকানিরা। এখন বিভিন্ন অ্যাপ ও অনলাইন শপিংয়ের কারণে হালখাতার সেই জৌলুস কমে এসেছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় ব্যবসার হিসেবনিকেশ বেশিরভাগ ব্যবসায়ীরা রাখেন কম্পিউটারে। তাই খাতার ব্যবহারও কমে গেছে অনেকটা। তবে গ্রামেগঞ্জে এখনও ঐতিহ্য মেনে অনেক ব্যবসায়ীই হালখাতার আয়োজন করেন বছরের প্রথম দিন। পুরানো বছরের সব হিসাব মিটিয়ে নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় নতুন খাতায় হিসাবনিকেশ করা। এই খাতা তৈরি করা হয় লম্বা সাদা কাগজ বাঁধাই করে আর লাল সালু কাপড়ের মলাটে মুড়িয়ে। লালখাতাকে টালিখাতা নামেও ডাকা হয়।

বর্ষবরণ বাঙালির ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। যদিও নাগরিক জীবনে পান্তাইলিশের সংস্কৃতি চালু হয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতিতে এর কোনো প্রভাব নেই। মিষ্টিমুখ, নতুন কাপড় পরিধানের কথা উল্লেখ আছে। বিশ্বায়নের প্রভাব সংস্কৃতিতে পড়বে স্বাভাবিক, কিন্তু আদি ও মৌলিকত্ব বজায় রাখতে হবে। বৈশাখের আবাহন চির নতুন -‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ/ তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক/ যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি/ অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক/ মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ কিংবা ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’ বাঙালির ঐতিহ্যকে ধারণ করে নতুন বছরকে স্বাগত জানাই।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনতুন বছরে
পরবর্তী নিবন্ধআনোয়ারায় কিশোরীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার