ভারত–বাংলাদেশের শত সহস্র পাহাড় পর্বতের মধ্যে ‘জালালাবাদ’ পরম শ্রদ্ধায় উচ্চারিত চট্টলার এক অনুচ্চ পাহাড়। জালালাবাদ একটি ইতিহাস–কালের পাতায় ছড়ানো, বহু কারণেই এর গুরুত্ব। এই পাহাড়ের সন্নিকটে সাধক হযরত বায়জিদ বোস্তামীর মাজার। অনেকের ধারণা সাধক শাহ্ জালাল [রহঃ] হয়তো কোন এক সময় এখানে পদার্পণ করে ধ্যানেমগ্ন ছিলেন তাই এই পাহাড়ের নামকরণ হয় জালালাবাদ। কিন্তু পরবতী কালে যে জন্য ‘জালালাবাদ’ ইতিহাস খ্যাত হয়েছে তার প্রতিটি ঘটনা সাক্ষী প্রমাণ সহ লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাসে সে এক যুগান্তকারী ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের পশু শক্তির বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে চট্টলার বিপ্লবীরা এক নতুন ইতিহাস রচনা করে–ছিলেন। ২১শে এপ্রিল রাতে ফতেয়াবাদ থেকে সরাসরি শহরে গিয়ে আঘাত হানার কথা ছিল। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে বায়জিদ বোস্তামীর কাছে পোঁছতেই ভোর হয়ে যায়। শহর তখন তিন মাইল পথ। তাই নিকটবর্তী জালালাবাদ পাহাড়ে আশ্রয় গ্রহণ। ওই দিকে ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল সূর্যসেনের নেতৃত্বে অস্ত্রগার দখলের পর চট্টগ্রামে আরো সামরিক বাহিনী আনা হয়। শত্রুদের পেছনে চর লাগিয়ে দেওয়া হয়, এক এক জনকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। দুপুরে মাস্টরদা কয়েকজন কর্মীকে নিয়ে আলোচনায় বসছিলেন তখন অর্ধেন্দু এসে খবর দিলেন যে দু’জন ছেলে পাহাড়ে এসেছিল। ছেলে দুইটি তার কাছে বিপদ সংকেত মনে হয়েছে এবং মাষ্টারদার ধারণা ওরা যে ইনফর্মার ছিল এটা সত্য প্রমাণিত হতে বেশি সময় লাগলো না। পাহাড়ের পূর্ব দিকে কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন এসে থামল এবং ট্রেন থেকে অসংখ্য সৈন্য নেমে সোজা জালালাবাদ পাহাড়ের দিকে মার্চ করতে শুরু করলো। অনিবার্য সংঘর্ষের সম্ভবনায় মাষ্টারদা বিপ্লবী বাহিনীর যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন লোকনাথ বলকে। এই যুদ্ধে বিনোদ বিহারী চৌধুরী স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন ‘সেই দিনের জেনারেল লোকনাথকে পাহাড়ের চারিদিকে গুরুত্ব–পূর্ণ জায়গায় আমাদের স্থান নির্দেশ করে দিলেন। রাইফেলে গুলিভর্তি করে পাহাড়ের গায়ে বুক পেতে আক্রমণ সংকেতের অপেক্ষায় রইলাম। শত্রুসৈন্য লক্ষ্য সীমার মধ্য না এলে আক্রমণ করা হবে না বলে জানিয়ে দেন। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই যূগপৎ পঞ্চাশটি রাইফেলের গুলী চালিয়ে ইনকিলাব জিন্দাবাদ [বিপ্লব জিন্দাবাদ] ধ্বনি তুলে শত্রুপক্ষকে স্তব্ধ করে দিতে হবে। …. জেনারেল লোকনাথ বল অবশেষে আদেশ দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে জালালাবাদ পাহাড় প্রকম্পিত করে বিপ্লবী বাহিনীর সবকটি রাইফেল গর্জন করে উঠলো। উভয় পক্ষে তুমুল লড়াই শুরু হয়ে গেলো। …
আমাদের জেনারেলের নির্দেশে আমরাও সাময়িকভাবে গুলীবর্ষণ স্থগিত রাখলাম। রণস্থল নিথর নিস্তব্ধ। শত্রুর নীরব নিস্তব্ধতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ পাহাড়ের দু’দিকে অন্য দুই পাহাড়ের শীর্ষ থেকে আমাদের উপর শত্রুর মেশিনগান ও লু্্ইসগানের গুলিবর্ষণ শুরু হলো। জেনারেলের আদেশ পেয়ে আমরাও প্রচণ্ড প্রত্যুত্তর দিচ্ছিলাম কিন্তু আমাদের গুলি সেই পাহাড়ে পৌছাচ্ছিল না। অল্পক্ষণের মধ্যে শত্রুপক্ষ সুবিধা করে নিলো। সর্ব প্রথম হরি গোপাল বল, আমাদের জেনারেলের ছোট ভাই আহত হয়ে চিৎকার করে উঠলো ‘সোনা ভাই, আমি চললাম–তোমরা প্রতিশোধ লও।” কিছুক্ষণ পরে ত্রিপুরা সেন, নরেশ রায়, বিধু ভট্টাচার্য, নির্মল লালা, প্রভাস বল, পুলিন ঘোষ, শশাঙ্ক দত্ত, জিতেন ঘোষ, মধু দত্ত প্রাণ হারিয়ে শহীদের অমরত্ব বরণ করেন। এক পর্যায়ে গলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আমি বিনোদ বিহারী ও গুরুতর আহত হই। অধেন্দু আমার রাইফেল ও কার্তুজ অন্যকে হস্তান্তার করতে গিয়ে পেটে গুলি খেলো। বৃষ্টির ধারার মতো ছিল সেই মেশিনগানের গুলি। বিপ্লবীদের রাইফেলও সমানতালে গর্জন করছে। তাদের মধ্যে ‘কার আগে প্রাণ কে করিবে দান পড়ে গেছে কাড়াকাড়ি।’ আস্তে আস্তে আমার শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়লো। আমি অচেতন হয়ে পড়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর আমার জ্ঞান ফিরে এলো রজত সেন ও অন্যান্য বন্ধুদের চাপা শব্দে।গোলাগুলির শব্দ নেই। শেষ পর্যন্ত শত্রু সৈন্যরা সদল বলে পালিয়েছে,রাত্রির অন্ধকারে। শহীদদের রক্তস্নাত পূত–পবিত্র এই জালালাবাদ পাহাড়ের স্মৃতি এখনো আমাদের মনকে আন্দোলিত করে’।














