কক্সবাজার শহরের কেন্দ্রস্থল কাচারী পাহাড়ে অবস্থিত জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সরকারি কার্য দিবসে থাকে সেবাপ্রার্থী লোকজনের ভিড়, কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ। কিন্তু দোতালা ও তিনতলা বিশিষ্ট এ অফিসের ছাদ যেন এক স্বর্গোদ্বান! যান্ত্রিক পরিবেশ ছাপিয়ে এখন রাজত্ব করে প্রকৃতি। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের মাত্র ১০ হাজার বর্গফুট আয়তনের ছোট্ট ছাদে বেড়ে ওঠছে বনজ, ফলদ ও ওষুধি প্রজাতির প্রায় চার হাজার চারা গাছ। এরমধ্যে কয়েক ডজন গাছে সারা বছর ফল পাওয়া যায়। একই ছাদে চারা গাছের সাথে কবুতর, হাঁস ও মুরগীও লালন পালন করা হচ্ছে। এ যেন ছাদের উপর এক স্বর্গোদ্বান। এই ছোট্ট স্বর্গোদ্বানটি একদিকে যেমন খাদ্য নিরাপত্তার নতুন পথ দেখাচ্ছে, অন্যদিকে শহুরে বাস্তুতন্ত্রের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় দেখাচ্ছে নতুন পথ।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ছাদগুলো একসময় পরিত্যক্তই ছিল। সেখানে বর্ষাকালে শেওলা পড়ত এবং শীতকালে তা পচে শুকিয়ে মাটির স্তর পড়ত। আবার গ্রীস্মকালে গরমের জ্বালায় ছাদের নীচে বসা দুষ্কর হয়ে পড়ত। কিন্তু প্রায় ৫ বছর আগে প্রধান ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার ছাদে বাগান তৈরির পর সেই পরিবেশ এখন বদলে গেছে। ছাদের নীচের পরিবেশে যেমন স্বস্তি এনেছে, তেমনি উপরের স্বর্গোদ্বানটি খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার নতুন পথ দেখাচ্ছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উপ–প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুল মনজুর এই ছাদ বাগানটির উদ্যোক্তা। বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই ছাদ বাগানে তার উদ্যোগে গড়ে ওঠছে নানা জাতের বৃক্ষ ও গৃহপালিত পাখির এক সমন্বিত খামার। এই ছাদ বাগানে রয়েছে কালো জাম, সাদা জাম, লিচু, কমলা, মালদা, ব্ল্যাকবেরি, মালবেরি, সফেদা, লেবু, আপেল, ম্যাজিক ফ্রুট, আঙ্গুর, পেঁপে, জাম্বুরা, অ্যাভোকাডো লটকন, ওর বরই বরই, সজিনা, কলা, বেল, আখ, ডালিম, বিভিন্ন প্রজাতির পেয়ারা, আতা, শরিফা, আমলকি, পিকলু পিয়ার, আনারস, লাল কাঁঠাল, চ্যারি চেরি, ফ্যাশন ফ্রুট, তাল, খেজুর, বাউফল, গোলাপ জাম, জামরুল, রাম্বুটান, লংগান, করমচা, কামরাঙা, কতবেল ও নারিকেলসহ কয়েকশ প্রজাতির ফল গাছ এবং অশ্বগন্ধা, হরিতকি, নিম, শিমুল, বহেড়া, আদা, ঘৃতকুমারী, নিম, থানকুনি, তুলশী, লজ্জাবতী, বনজুঁই, পাথরকুচি, বাসক, জবা, জার্মানি লতাসহ শতাধিক প্রজাতির ওষুধি গাছ ছাড়াও কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, বাগান বিলাস, গোলাপ, শাপলা, জবা, হাসনা হেনা, অপরাজিতা, শিউলি, টগর অলকানন্দা, কলাবতী, কাঠগোলাপ, রঙ্গন, ক্যাক্টাস, ক্যামেলিয়া, ডেইজি, নীলকন্ঠ, নয়নতারা, ফক্স টেইল অর্কিড ও মাধবি লতাসহ কয়েকশ প্রজাতির ফুল ও শোভা বর্ধনকারী উদ্ভিদ। সেসাথে এই ছাদ বাগানে রয়েছে প্রায় ২শ কবুতর, ১৫টি হাঁস ও ১২টি মুরগীর একটি সমন্বিত খামার।
শুধু তাই নয়, এই ছাদ বাগানটি পাখিদের জন্যও একটি বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠেছে। নানা জাতের পাখি এই বাগানে ফল খেতে ও পানি পান করতে আসে বলে বলে পরিবেশবাদী সংগঠন কঙবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আনম হেলালউদ্দিন। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসনের ছাদ বাগানের মডেলটি একদিকে আবহাওয়া ও পরিবেশগত সুবিধা প্রদান করছে। অন্যদিকে খাদ্য নিরাপত্তারও নতুন পথ দেখাচ্ছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উপ–প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুল মনজুর জানান, এই ছাদ বাগানে অর্গানিক উপায়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করা হয়, কোনো ধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক এখানে ব্যবহার করা হয় না। মূলত একটি মডেল হিসাবেই তিনি এই বাগানটি তৈরি করেছেন বলে জানান। আর তার উদ্ভিদবিদ স্ত্রী হলেন তার প্রধান সহযোগী ও প্রেরণা।